৩ ঘণ্টার মাধ্যে সিটি মেয়র বরখাস্ত, মিশ্র প্রতিক্রিয়া নগরী জুড়ে

0
110

হাফিজুল ইসলাম লস্কর, সিলেট প্রতিনিধি : সিলেট নগরীকে নিয়ে আরিফুল হক চৌধুরীর অনেক স্বপ্ন ছিল। মেয়র নির্বাচিত হবার পর পরই তিনি সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে জোর প্রচেষ্টা শুরু করেন। নগর উন্নয়নে তার পরিকল্পনা এবং কর্মতৎপরতায় সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী সিলেটের কৃতি সন্তান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতও সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেন। প্রায় নয় মাস তিনি দুরন্ত গতিতে কাজ করেন।

২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জে বোমা হামলায় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ্ এএমএস কিবরিয়া হত্যার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক মামলার সম্পূরক অভিযোগপত্রে যুক্ত হয় আরিফের নাম। এরপর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয় তার বিরুদ্ধে। ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আদালতে আত্মসমর্পণ করলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।

উচ্চ আদালত থেকে কিবরিয়া হত্যা মামলা এবং হত্যার ঘটনায় বিস্ফোরক মামলায় জামিন নিয়ে গত বছরের জুলাইয়ে মুক্ত হওয়ার প্রহর গুণছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী। কিন্তু ২০ জুলাই সুনামগঞ্জে সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের জনসভায় বোমা হামলার ঘটনায় হত্যা এবং বিস্ফোরক মামলায় আরিফের নাম যুক্ত করে সম্পূরক চার্জশিট দেয় সিআইডি।

২০০৪ সালের ২১ জুনের ওই ঘটনার মামলায় রুদ্ধ হয়ে যায় আরিফের মুক্তির পথ। তবে আইনী লড়াই চালিয়ে যান আরিফ। সেই ধারাবাহিকতায় সবকটি মামলায় জামিন পেয়ে গত ৪ জানুয়ারি কারামুক্ত হন তিনি। কারামুক্ত হয়ে গত ১২ মার্চ হাইকোর্টে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বরখাস্তের আদেশের বিরুদ্ধে রিট করেন আরিফ। পরদিন আদালত মন্ত্রণালয়ের আদেশ ছয় মাসের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। আদেশের বিরুদ্ধ আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। কিন্তু ২৩ মার্চ পূর্বোক্ত আদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।

ওই আদেশের প্রেক্ষিতে রবিবার শোডাউন করে নগর ভবনে যান আরিফ। সেখানে কাউন্সিলর, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাকে অভ্যর্থনা জানান। দায়িত্বভার গ্রহণ করে মেয়রের চেয়ারে বসেন আরিফুল হক চৌধুরী। তারপর দাপ্তরিক কিছু কাজও করেন, স্বাক্ষর কয়েকটি ফাইলে ।

দায়িত্ব নেওয়ার ৩ ঘণ্টার মাথায় ফের বরখাস্ত হলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে পদ ফিরে পেয়ে রবিবার সকালে মেয়রের চেয়ারে বসেছিলেন আরিফুল হক। দুপুরে তাকে আবার বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

সিসিক সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোরেশন অ্যাক্ট উপ-সচিব মো. মাহমুদুল আলম সিলেট সিটি করপোরেশনে দুপুরে একটি ফ্যাক্স বার্তা পাঠান। ওই বার্তায় বলা হয়েছে, ‘আরিফুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা-৪/২০০৯ এর সম্পূরক অভিযোগপত্র গত ২২ মার্চ আদালতে গৃহীত হয়েছে। সেহেতু সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে স্থানীয় সরকার বিভাগ আইন ২০০৯ এর ১২ উপধারা প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।

আবারো সিটি মেয়র বরখাস্ত হবার খবরে নগরবাসী মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেছে। তার সমর্থকদের অনেকে এ সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
তারা এটিকে মেনে নিতে পারছেননা। তারা বলছেন, ‘সরকার রাজনৈতিক কারনে তড়িগড়ি করে এমন কাজ করেছে। কেউ কেউ বলছেন, এই ঘটনায় আরিফুল হক চৌধুরী আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠবেন। কারন সিলেটের মানুষ তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবে।

আওয়ামীলীগের একজন স্থানীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আইন সকলের জন্য সমান। আরিফুল হক চৌধুরী আইনের উর্ধে নন। তবে প্রক্রিয়াটি একটু দ্রুত হয়ে গেছে। স্বাভাবিক গতিতে হলে কোন প্রশ্ন উঠার অবকাশ থাকতো না।

এ প্রসঙ্গে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন ‘এই বরখাস্ত শুধু আমাকেই নয়, এটি সিলেটনগরীর সকল উন্নয়ন কর্মসুচিকে আটকে দেবার হীন প্রয়াস। । আমি সিলেটের মানুষের মেয়র ছিলাম, আছি, থাকবো।

আরিফ বলেন, মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমি আইনি লড়াই চালিয়ে যাবো। একইসঙ্গে জনগণের কাছেও আমি বিচার দিলাম। জনগণ ভোটের মাধ্যমে এই অবিচারের জবাব দেবে বলেও মন্তব্য করেন আরিফ।
বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানার পর রবিবার নিজ বাসায় এই বিএনপি নেতা বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে যদি এভাবে কথায় কথায় মামলার আসামী করা হয়, বরখাস্ত করা হয়, জনগণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়- তবে সেটা মোটেই মঙ্গলজনক নয়।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধিদের কাজ করার সুযোগ না দিলে তা রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা কোনো মামলার আসামী হলে তাদের বরখাস্ত করা হয় না। কিন্তু স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিরা মামলায় জামিনে থাকলেও বরখাস্ত করা হয়। একই দেশে দুই আইন কেনো- এমন প্রশ্ন তোলেন তিনি। আরিফুল হক চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুল হালিম মোহাম্মদ কাফি বলেন, যে আইনে আরিফুল হক চৌধুরীকে বরখাস্ত করা হয়েছে, সে আইনের বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ আদালতে একটি রিট করেছি। সেটি এখনো নিষ্পন্ন হয়নি।

এ অবস্থায় তাকে কিভাবে আবার বরখাস্ত করা হলো তা বুঝতে পারছি না। আমরা এ ব্যাপারে আবার আদালতের শরণাপন্ন হবো।