অতিথি পাখি নিধন চলছে অবাধে

0
207


শাহিনুর ইসলাম প্রান্ত, লালমনিরহাট করেসপন্ডেন্ট:
প্রকৃতিতে শীতের আমেজ শুরু হতেই রঙ-বেরঙয়ের অতিথি পাখির কলতানে মুখরিত লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলার ছোট খাটো বিল গুলোতে। শীত মৌসুমজুড়েই দেখা যায় সাদা বক, বালিহাঁস, মাছরাঙ্গা, সারস, পানকৌরীসহ দেশি বিদেশি অসংখ্য পাখি। পানি নেমে যাওয়ায় এ জেলার খাল-বিল, জলাশয়গুলোতে দেখা মিলছে পুঁটি, খলসে, দারকেসহ ছোট ছোট সব মাছ। এসব মাছ খাওয়ার লোভেই নানা প্রজাতির অতিথি পাখি ঝাঁকে ঝঁকে আশ্রয় নেয় ছোটখাটো বিলে। দিগন্তজুড়ে উন্মুক্ত হাওয়ায় পাখা মেলে এক বিল থেকে আরেক বিলে উড়াউড়ি করে। অপরুপ রুপে সেজে ওঠে প্রকৃতি। মাছ আছে, দিগন্তজোড়া বিল আছে, আসছে অতিথি পাখিও। পাখির এমন অবাধ বিচরণে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে একশ্রেণির লোভী মানুষ। তারা বিষটোপ-বড়শিসহ নানা প্রকার ফাঁদ পেতে নির্বিচারে শিকার করছে। পাখি শিকার করা আইনত নিষিদ্ধ হলেও শিকারিরা তার তোয়াক্কা করছে না। বন বিভাগ সুত্র জানায়, ১৯৭৪ সালে বন্য প্রাণী রক্ষা আইন ও ২০১২ সালে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে দণ্ডের বিধান রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পাখি নিধনের সর্বোচ্চ শাস্তি এক বছর জেল, এক লাখ টাকা দণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে অপরাধীর দুই বছরের জেল, দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই জেলায় এ আইনের কোনো প্রয়োগ হচ্ছে না।

পাখিরা শুধু প্রকৃতির শোভা বর্ধন করে না, ভারসাম্যও রক্ষা করে। পোকামাকড় খেয়ে এরা কৃষকের উপকার করে। কিন্তু আইন থাকলেও পাখি

নিধন বন্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। এ কারণে দেশ থেকে নানা প্রজাতির পাখি বিলুপ্ত হচ্ছে। শীতের শুরুতেই এ জেলার জলাশয় ও ছোট ছোট বিলগুলোর পানি নেমে যায়। এ সময় অল্প পানিতে খাবার সংগ্রহের জন্য বিলে প্রচুর দেশি ও অতিথি পাখি আসে। চলতি বছর জলাশয় ও বিলগুলোতে আমন ধানের আবাদ ভালো হয়েছে। প্রচুর মাছও দেখা গেছে। ফলে বিলে ঝাঁকে ঝাঁকে বালিহাঁস, বাটুল, চখাচখি, শামখোল, পানকৌড়ি, বকসহ বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি বসতে শুরু করেছে। আর এ সুযোগে পাখিশিকারি বন্দুক, বিষটোপ, কারেন্ট জাল ও ফাঁদ পেতে প্রতিনিয়ত পাখি নিধন করছেন। প্রকাশ্যে এসব পাখি বিক্রি হচ্ছে লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নামুড়ী, পাঁচমাথা, কাজীরহাট, শিয়াল খোওয়া, কাকিনা, সুকানদিঘীসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায়।রবিবার সকালে উপজেলার সুকানদিঘী বাজারে এক পাখি বিক্রেতার সাথে কথা বলতে চাইলে সে দৌড়ে রাস্তার উল্টদিকে অপেক্ষারত একটি বাইসাইকেলে উঠে পালিয়ে যায়।


সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বর্ষার পানি নেমে যাওয়ায় নদী গুলোতে ছোট জলাশয় তৈরি হয়েছে। শত শত সাদা বক ও পানকৌড়ি এখানে আশ্রয় নিয়েছে। কিছু মানুষ লাঠি হাতে পাখিগুলোকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। আর তাড়া খেয়ে জালে ও ফাঁদে পড়লে পাখিগুলোকে খাঁচায় আটকানো হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে পাখি শিকার একটি খেলার মত যাতে বাহাদুরি প্রদর্শন আর একই সাথে অর্থ উপার্জনের বেআইনি পথ বের হয়ে এসেছে। কারেন্ট জাল ও ফাঁদ পেতে পাখি শিকারিরা জানান, শীত মৌসুমে অতিথি পাখির আগমন বেশি। তাই এই সময় পাখি শিকার করে থাকেন এবং ওইসব পাখি বাজারে বিক্রি করেন।

এ প্রসঙ্গে উত্তরবাংলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ এএসএম মনওয়ারুল ইসলাম বলেন, পাখিরা শুধু প্রকৃতির শোভা বর্ধনই করে না, ভারসাম্যও রক্ষা করে। পোকামাকড় খেয়ে এরা কৃষকের উপকার করে। কিন্তু আইন থাকলেও পাখি নিধন বন্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। এ কারণে দেশ থেকে নানা প্রজাতির পাখি বিলুপ্ত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এভাবে অতিথি পাখি নিধন হলে পরিবেশ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাক-পাখালির গুরুত্ব অপরিসীম। তাই এ সকল পাখি রক্ষায় প্রশাসনসহ স্থানীয় জনগনদেরও এগিয়ে আসা জরুরি।