তিনজনেই শারীরিক প্রতিবন্ধী, স্বপ্ন এইচএসসি জয়

0
55

তিনজনেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। কেউ জন্ম থেকে, কেউ অসুস্থতার জন্য আর কেউ দুর্ঘটনায় পড়ে প্রতিবন্ধী। এরপরও মনের ইচ্ছাশক্তি আর পড়াশোনার অদম্য বাসনা থেকে সকল বাঁধা পেরিয়ে ওই তিন মেধাবী এবার এইচএসসি জয়ের স্বপ্ন দেখছেন।

তাই জীবন যুদ্ধে হার না মেনে সকল প্রতিকুলতার সাথে লড়াই করে স্বপ্ন পূরণে এইচএসসি দিচ্ছে লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার জান্নাতুল ফেরদৌসী ও হাসিনা আক্তার এবং জেলার পাশ্ববর্তী কালীগঞ্জ উপজেলার রুবেল মিয়া।

জানা যায়, জন্ম থেকে হাতের আঙুল নেই জান্নাতুল ফেরদৌসীর। তারপরেও প্রাথমিকে ৫ম শ্রেণীতে বৃত্তি পেয়ে মাধ্যমিকে ভর্তি হয়। সে জেএসসিতে জিপিএ-৫ আর এসএসসিতে ৪.৮৯ পেয়ে স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে এগিয়ে চলে। এবার হাতীবান্ধা আলিমুদ্দিন ডিগ্রী কলেজের মানবিক শাখা থেকে হাতীবান্ধা মহিলা ডিগ্রী কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এইচএসসি জয়ের স্বপ্ন দেখছেন জান্নাতুল।

মঙ্গলবার ওই কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, আর দশজন পরীক্ষার্থীর মতই মনোযোগ দিয়ে অবলীলায় পরীক্ষার খাতায় লিখে যাচ্ছে জান্নাতুল। দেখে বোঝার উপায় নেই যে তার দুই হাতের আঙুল নেই। শুধু তালুর সাহায্য নিয়ে লিখছে সে। খাতায় দেখে বোঝার উপায় নেই যে আঙ্গুলবিহীন তালু দিয়ে লেখা। এমন লেখায় কক্ষ পরিদর্শকরাও খুশি। আর মেয়েটি যেভাবে উত্তরপত্র লিখছে তাতে করে তার ফলাফল খুবই ভালো হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।

পরীক্ষা শেষে কথা হলে জান্নাতুল ফেরদৌসী বলেন, অসাধ্যকে সাধন করতে শত বাঁধা পেরিয়ে আজ এইসএসসি পরিক্ষায় অংশ নিয়েছি। ভবিষ্যতে বিএসএস (শিক্ষা ক্যাডার) হয়ে শিক্ষকতা করার ইচ্ছে পোষণ করে সে।

এ বিষয়ে হাতীবান্ধা আলিমুদ্দিন ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ সরওয়ার হায়াত খান বলেন, দুই হাতে আঙুল না থাকলেও জান্নাতুল খুবই মেধাবী শিক্ষার্থী। তাকে প্রতিবন্ধী হিসেবে পরীক্ষার নিয়মানুযায়ী অতিরিক্ত সময় দেয়া হলে এইচএসসিতে সবথেকে ভালো ফলাফল করবে বলে বিশ্বাস করেন তিনি।

এদিকে হাতীবান্ধা উপজেলার দইখাওয়া গ্রামের দিনমজুর বাবা শাহেদ আলীর মেয়ে হাসিনা আক্তার। মাত্র তিন বছর বয়সে টাইফয়েট জ্বরের কারণে চোখের দৃষ্টি হারায় সে। তবে পড়ালেখার জন্য কথনো থেমে থাকেনি। অদম্য বাসনায় ভর্তি হয় লালমনিরহাট জেলা সদরের হাড়িভাঙা এলাকায় বেসরকারি সংস্থা আরডিআরএস পরিচালিত একটি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কেন্দ্রে। সেখান থেকে লালমনিরহাট চার্চ অব গড স্কুলে পরীক্ষা দিয়ে জেএসসি এসএসসি জয় করে হাসিনা। এবছর হাতীবান্ধা মহিলা কলেজের মানবিক শাখার শিক্ষার্থী হিসেবে স্থানীয় আলিমুদ্দিন কলেজ কেন্দ্রে শ্রুতি লেখকের সাহায্যে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে মেয়েটি।

পরীক্ষা শেষে কথা হলে হাসিনা আক্তার জানায়, পড়াশোনার পাশাপাশি ভালো গান গাইতে পারেন তিনি। পরিবারের অভাব অনটনের কারণে তার কলেজে পড়া প্রায় বন্ধ হতে চলেছিল। তাই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে টাকা উপার্যন করে পড়াশোনা চালিয়ে আসছেন হাসিনা আক্তার। চোখের দৃষ্টি শক্তি না থাকায় দশম শ্রেণী পড়ুয়া সুলতানা তার কাছে শুনে এইচএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র লিখছে। তাতে করে ফলাফল ভালো হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। তবে অভিষ্যতে পড়ালেখার খরচ চালাতে পারবে কিনা? এমন শংকা কাটছে না হাসিনা আক্তারের।

অপরদিকে সেই ছোট্ট বেলা আগুনে পুড়ে দু‘হাতের প্রায় সব আঙুল হারায় রুবেল। বাকি যে দু‘একটি আঙুল অবশিষ্ট রয়েছে, সেটিও আবার বাকা। তাই লিখতে কষ্ট হলেও পড়ালেখায় পিছিয়ে নেই এই অদম্য মেধাবী। এবছর লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা উত্তরবাংলা ডিগ্রী কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে এইচএসসি পাশের স্বপ্ন আকঁছেন তিনি।  বাড়ি স্থানীয় সুকানদিঘী এলাকায়।

কাকিনা মহিমা রঞ্জন স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের কেন্দ্র গিয়ে দেখা যায়, সেই ছোট বেলার আগুনে পুড়ে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্থ হাত দিয়ে আর দশজন শিক্ষার্থীও মতই এইচএসসির উত্তরপত্র লেখছেন রুবেল।
ওই কেন্দ্রের দায়িত্বরত কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা  (পিআইও) রাশেদুল ইসলাম বলেন,‘শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে আমি কিছুক্ষণ তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছি যে, রুবেলের হাতের লেখা অত্যন্ত চমৎকার। পরীক্ষাও বেশ ভালো দিচ্ছে।

পরীক্ষা শেষে রুবেল মিয়া জানায়, আমার দুই হাতের আঙুল পুড়ে যাওয়ায় লিখতে বেশ সমস্যা হয়। এরপরেও পুড়ে যাওয়া হাতে লিখে এই পর্যন্ত এসেছি। আশা করি এইচএসসিও পাশ করবো। এভাবে পড়ালেখা করে ভবিষ্যতে সরকারি চাকুরী করতে চায় রুবেল।

রুবেলের মা মরিয়ম বেগম জানান, তার স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে সুকানদিঘী বাজারে ছোট একটি দোকান দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি নিজের লেখাপড়ার খরচ জোগায় রুবেল।

উত্তরবাংলা ডিগ্রী কলেজের উপাধ্যক্ষ মাহফুজুল ইসলাম বলেন, শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হলেও অন্যদের চেয়ে বেশ মেধাবী রুবেল। ভবিষ্যতে সে আরও ভালো করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

#বাংলাটপনিউজ/আরিফ