অর্ধযুগ অতিবাহিত হলেও ইলিয়াস আলীর জন্য অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়নি

0
25

হাফিজুল ইসলাম লস্কর : অর্ধযুগ অতিবাহিত হয়ে গেছে, অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে, অপেক্ষার শেষ কোথায় কেউ জানেনা, আদৌকি শেষ হবে অপেক্ষা নাকি আরো দীর্ঘায়িত হবে, তা কেউ জানে না।

বলছি নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর কথা, যার জন্য অপেক্ষায় অপেক্ষামান পরিবার, আত্মীয়স্বজন, রাজনৈতিক সহকর্মী ও সমর্থকরা, প্রিয় মানুষটির জন্য অপেক্ষার নিদারুণ প্রহর যেন তবু ফুরোচ্ছে না।

তার সাথে নিখোঁজ রয়েছেন গাড়িচালক আনসার আলী। গাড়িচালক আনসার আলীসহ বিএনপির সাবেক এই কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ‘নিখোঁজ’ হওয়ার ছয় বছর পূর্ণ হয়েছে আজ।

তবুও কেউ জানেনা কি ঘটেছে ইলিয়াস আলীর ভাগ্যে, তা এখনও সিলেট তথা বিএনপির জন্য এক রহস্য। এই দীর্ঘ সময় পরও তাঁর জন্য রয়েছে পরিবারের এবং সিলেট বিএনপির অপেক্ষা।

ইলিয়াস আলীর বৃদ্ধ মা এখনো ঘুমের ঘরে স্বপ্নে দেখেন তাঁর ছেলে ফিরে এসেছে। আর ইলিয়াস আলীর সাথে নিখোঁজ তার গাড়ীর ড্রাইভার আনসার আলীর মা নুরজাহান বেগম স্বপ্ন দেখেন
ছেলে ফিরে এসে অভাবের সংসারের হাল ধরবেন, এমন আশায় ছেলের অপেক্ষার প্রহর গুনছেন বৃদ্ধ জননী।

২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল মধ্যরাতে ঢাকার বনানী থেকে গাড়িচালকসহ ‘নিখোঁজ’ হন ইলিয়াস আলী। ওই সময় তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি পদে ছিলেন। সিলেট-২ আসনের সাবেক এই সাংসদের সাথে একই পরিণতি বরণ করতে হয় তাঁর গাড়িচালক আনসার আলীকে।

ইলিয়াসের বাড়ি সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামধানা গ্রামে এবং আনসার আলীর বাড়ি একই উপজেলার গুমরাগাল গ্রামে। ইলিয়াস আলী ‘নিখোঁজ’ হওয়ার পর অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠেছিল সারাদেশ। বিশেষ করে তাঁর সন্ধান দাবিতে উত্তাল ছিল সিলেট। সেই আন্দোলনে বিশ্বনাথে তিনজনসহ সারাদেশে প্রাণ হারান আটজন।

প্রথম দিকে ইলিয়াসের সন্ধান দাবিতে উচ্চকন্ঠ ও বেগবান ছিল বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের আন্দোলন। সময়ের সাথে সাথে তাদের কণ্ঠস্বর মিয়মান হয়ে যায়, আন্দোলনের গতি কমে গেলেও এখনও ১৭ এপ্রিল দিনটিতে ইলিয়াসের জন্য রাজপথে কর্মসূচি পালন করা হয়। এছাড়া মিলাদ, দোয়া মাহফিলও করে থাকেন বিএনপি নেতাকর্মীরা।

দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও এখনো জানা যায়নি কি ঘটেছে ইলিয়াস আলীর ভাগ্যে বা কি ঘটেছিল সেদিন, ইলিয়াস আলী এখনো বেচে আছেন নাকি তা অন্যকিছু তা আজও এক অমিমাংসীত রহস্য হয়ে আছে।

ইলিয়াসের সন্ধানের জন্য তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদী লুনা সাক্ষাৎ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে। কিন্তু তবু খোঁজ মিলেনি বাংলাদেশের উজানে ভারতের টিপাইমুখ বাঁধবিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখা ইলিয়াসের। তাঁর জন্য আজও পথ চেয়ে থাকেন মা সূর্যবান বিবি ও স্ত্রী সন্তানরা।

সূর্যবান বিবি অশ্রুসজল চোখে বলেন, ‘প্রায় প্রতি রাতেই স্বপ্নে দেখি আমার ইলিয়াস ফিরে এসেছে। আমি এখনও তার অপেক্ষা আছি। আমার ছেলে কি অপরাধ করেছে, আমার জানা নাই। আমি আশায় আছি আল্লাহ আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দেবেন।’

ইলিয়াস আলীর মত আনসার আলীর জন্যও তার পরিবার অন্তহীন অপেক্ষায় আছে। আনসার আলীর মা নুরজাহান বেগম বলেন, ‘আমার অভাবের সংসার। আমি নানা রোগে আক্রান্ত। আনসার আলী সংসার চালাত, আমার চিকিৎসার খরচ চালাত। ছয় বছর ধরে আমার বাচ্চা গুম হয়ে আছে। সংসারে এখন অভাব, আমার চিকিৎসাও হয় না ঠিকমত। পুত্রবধু ও নাতনিকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি, ছেলের বউ ও নাতনিকে নিয়ে এই আশায় বেঁচে আছি। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, ইলিয়াস আলী আর আনসারকে ফিরিয়ে দেয়া হোক।’

আনসার আলীর শিশুকন্যা চাঁদনী কান্না জড়িত কন্ঠে বলে, ‘আব্বুর জন্য আমার কষ্ট হয়। আমি দাদুর কাছে জিজ্ঞেস করি আব্বু কোথায়, কবে আসবে। দাদু কিছু বলেনা শুধু কাদেঁ আর দোয়া করতে বলে।’

ইলিয়াসের নিখোঁজ প্রসঙ্গে সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ বলেন, ‘ইলিয়াস আলী বিএনপির নিউক্লিয়াস হিসেবে কাজ করতেন। সরকারের অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলতেন তিনি। তাকে স্তব্দ করে দিলে বিএনপিকে দমিয়ে রাখা যাবে, এই চিন্তাতেই সরকার ইলিয়াস আলীকে গুম করেছে। আমরা বিশ্বাস করি, খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে যদি জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে ইলিয়াস আলীকে আমরা ফিরে পাব।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here