বিশ্বজয়ীর সম্মান ক্রোয়েশিয়ার !

0
56

ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ২-৪ গোলে হারতে হয়েছে৷ প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেও হাতছাড়া হয়েছে বিশ্বজয়ের স্মারক৷ তবু এতটুকু খেদ নেই ক্রোটদের৷ বিশ্বকাপের মঞ্চে দেশকে নতুন উচ্চতায় তুলে ধরা ফুটবলারদের বীরের সম্মানে বরণ করে নিল ক্রোয়েশিয়া৷

বিমান অবতরণ থেকে শুরু করে হুড খোলা বাসে রাজপথে মদ্রিচদের অভিবাদন গ্রহণ, লক্ষাধিক ক্রোয়েশিয়ান উন্মত্ত চিৎকারে উৎসবমুখর করে তোলে রাজধানী জাগ্রেবের আকাশ-বাতাস৷ ফুটবলাররাও সমর্থকদের কৃতজ্ঞতা জানাতে পিছপা হননি৷ সমর্থকদরে সঙ্গে হাসি-কান্না, নাচে-গানে একাত্ম হয়ে যান মান্দজুকিচ-রাকিটিচরা৷

রবিবার রাতে মস্কোর লুজিনিক স্টেডিয়ামে রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই স্বপ্নভঙ্গ হয়ে ৪৫ লক্ষ ক্রোটবাসির৷ কিন্তু স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনার মধ্যেও ছিল অফুরন্ত আনন্দ৷ তাই ম্যাচ শেষ হতেই ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেবে ক্রোটদের চোখ জলে ভরে গেলেও তা ছিল আনন্দাশ্রু৷ জেলাসিচ স্কোয়ারে পটকা-বাজি জালিয়ে উৎসবে মাতেন তারা৷ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন না-হলেও দ্বিতীয় হওয়ার আনন্দে রাস্তায় নেমে সেলিব্রেশন করেন ক্রোটরা৷ দেশের জার্সি গায়ে বছর বাইশের ক্রিস্টিজান স্টানিচ বলেন, ‘আমাদের ছেলেরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে৷ তাদের শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছে৷ দুর্দান্ত একটা ম্যাচ উপহার দিয়েছে আমাদের খেলোয়াড়রা৷ ওদের জন্য আমরা গর্বিত৷ ওরা সিংহের মতো লড়াই করেছে৷’

ম্যাচ শেষ হতেই শহরের ভিন্ন জায়গায় পার্টি শুরু হয়৷ জাতীয় দলের পারফরম্যান্সে গর্বিত এক সমর্থক অরোরা ক্রিনিচ চোখে জল নিয়ে বলেন, ‘আমরা দ্বিতীয় হয়েছি, এটাও দারুণ৷ আমাদের খেলোয়াড়দের জন্য কষ্ট হচ্ছে৷ ওরা আমাদের গর্বিত করেছে৷ ওরা আমাদের চোখে হিরো৷’

নক-আউটে টানা তিনবার পিছিয়ে থেকে কামব্যাক! ফাইনালেও পিছিয়ে থেকে সমতা ফিরিয়েছিল দালিচের ছেলেরা৷ প্রথমার্ধে ২৮ মিনিটে পিছিয়ে থেকে পেরিসিচের দুরন্ত গোলে ম্যাচ ফিরেছিল ক্রোয়েশিয়া৷ দ্বিতীয়ার্ধেও ১-৪ পিছিয়ে থেকে ৬৯ মিনিটে ফ্রান্স গোলরক্ষক লরিসের ভুলের সুযোগ নিয়ে ব্যবধান কমিয়ে ২-৪ করেন মান্দজুকিচ৷ এরপর শেষ রক্ষা হয়নি৷ ক্রোয়েশিয়ার স্বপ্নের দৌড় শেষ হয় ফাইনালে৷ রানার্স হয়েই মাঠ ছাড়ে মদ্রিচ অ্যান্ড কোং৷ বৃষ্টিতে ঢাকা পড়ল রাকিটিচদের কান্না! ভাগ্যের কাছে হার মানতে হয় ক্রোটদের৷ আত্মঘাতী গোল ও হ্যান্ডবলের খেসারত দিতে হল প্রথমবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা ক্রোয়েশিয়াকে৷

৬ গোলের থ্রিলার জিতে দ্বিতীয় বারের জন্য বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স৷ শেষবার ১৯৯৮ সালে দেশের মাটিতে দেশঁ’র নেতৃত্বে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ফ্রান্স৷ বিশ সাল বাদ এবার কোচের হটসিটে বসে ফ্রান্সকে চ্যাম্পিয়ন করলেন দেশঁ৷ ২০১৬-র ইউরো হারের জ্বালা জুড়ায় সুপার কোচের৷ দ্বিতীয়ার্ধে ৬ মিনিটের একটি সার্জিক্যাল স্ট্রাইকেই ভিদা-সুভাসিচের ক্রোয়েশিয়াকে ঝাঁঝরা করে দেয় ফ্রান্স৷ ৫৯ মিনিটে গোল পোগবার৷ এরপর ৬৫ মিনিটে গোল তরুণ স্ট্রাইকার এমবাপের৷

ক্রোয়েশিয়ার আত্মঘাতী গোল, পেরিসিচের দুরন্ত কামব্যাক আর গ্রিজমানের পেনাল্টি! লুজিনিকি’র প্রধমার্ধে নাটকের অভাব ছিল না৷ অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ বাড়িয়ে দিল এক একটা মুহূর্ত৷ বাদ পড়ল না ভারও৷ ৩৮ মিনিটে ফ্রান্সের দ্বিতীয় গোলটিতে ভারের হাত! সহকারী ভিডিও রেফারির সাহায্যে নিয়ে ফ্রান্সকে পেনাল্টি দেন আর্জেন্তাইন রেফারি৷

দ্বিতীয়ার্ধে এরপর রোলার কোস্টার রাইড! প্রথমার্ধের চেয়ে উত্তেজনার পারদ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল দুই ফাইনালিস্ট৷ পোগবা-এমবাপের গোল যেমন আছে৷ ঠিক তেমনই সুপার কিপার লরিসের ভুলও ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে থাকবে৷ বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ক্রোয়েশিয়ার মানজুকিচকে দিয়ে গোল করিয়ে দেন লরিস৷ হেড টু হেড লড়াই হল ফ্রান্স-ক্রোয়েশিয়ার৷

বল পজিশনে ক্রোয়েশিয়ার চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত ৪-২ গোলে ফাইনাল জিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হল ফ্রান্স৷ ৯০ মিনিট ধরে দুরন্ত লড়াই করেও ট্র্যাজিক নায়ক হয়ে থেকে গেল ক্রোটরা৷ ফাইনালে খলনায়ক বনে গেলেন সেমিফাইনালের নায়ক মানজুকিচ৷ তাঁর আত্মঘাতী গোল নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়াল৷ ফাইনাল শেষে রাশিয়ার মাটিতে লুজনিকিতে উড়ল ফ্রান্সের পতাকা৷ চোখের কোণে জল নিয়ে বাকরুদ্ধ মদ্রিচ-মান্দজুকিচরা৷

এমন উত্তেজক ফাইনাল শেষবার দেখা গিয়েছিল ১৯৮৬ সালে৷ সেবার ফাইনালে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়েছিল আর্জেন্তিনা৷ এরপর একাধিক ফাইনাল কখনও হয়েছে একপেশে কখনওবা শ্যুট আউটে ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ হয়েছে৷ শেষবার ১৯৬৬ ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে ৬ গোলের থ্রিলার জিতেছিল ইংল্যান্ড৷ পাঁচ দশক পর ফের এমন এক ৬ গোলের উত্তেজক ফাইনাল দেখল ফুটবলদুনিয়া৷

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here