দেশের ১ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাসে আক্রান্ত

0
85

বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি লোক হেপাটাইটিস বি অথবা সি ভাইরাসে আক্রান্ত। ফলে তারা বিদেশে যেতে পারছে না এবং দেশেও চাকরি থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশ হেপাটোলজি সোসাইটির এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গবেষণা পত্রটি উপস্থাপন করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) লিভার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম।

‘বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসের অতীত ও বর্তমান প্রাদুর্ভাব এবং নির্মূলের সুপারিশমালা’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে হেপাটোলজি সোসাইটি।

এসময় এসব ভাইরাস থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে রোগীর পরীক্ষা করানো এবং ভাইরাস দমনে আলাদা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে সহজে রোগ নির্মূলের ব্যবস্থা করতে বলা হয়।

সেমিনারে বলা হয়, বাংলাদেশে সর্বশেষ ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এবং দেশের বড় ৪টি বিভাগের ৪টি জেলা শহর ও ৪টি উপজেলায় এ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এতে নের্তৃত্ব দেন হেপাটোলজি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহিনুল আলম।

গবেষণায় মোট ২ হাজার ৭৮২ জন সুস্থ ও স্বাভাবিক কর্মক্ষম ব্যক্তির সাক্ষাতকার নেয়া হয়। যাদের মধ্যে ১ হাজার ৬৯৪ জন পুরুষ এবং ১ হাজার ৮৮ জন নারী। এদের মধ্যে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসের বর্তমান প্রাদুর্ভাব যথাক্রমে ৫ দশমিক ১ শতাংশ ও শূন্য দশমিক ২ শতাংশ পাওয়া গেছে।

দেশের প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত উল্লেখ করে ওই গবেষণা পত্রে বলা হয়, এদের মধ্যে পুরুষ প্রায় ৫৭ লাখ এবং নারী ২৮ লাখ। তবে বাংলাদেশে তরুণ ও যুবকরাই এই ভাইরাসে বেশি আক্রান্ত। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী প্রায় ২৫ লাখ যুবক-যুবতী এবং সন্তান দানে সক্ষম ১৮ লাখ নারী (১৮ থেকে ৪৫ বছর) এই ভাইরাসে আক্রান্ত।

গবেষণার তথ্যমতে, বাংলাদেশে হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্তের হার শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ৫শ জনে ১ জন হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত। আগের গবেষণা সমূহের সাথে সমন্বয় করলে এ হার শূন্য দশমিক ২ থেকে ১ শতাংশ দাঁড়ায়। এর আগে সংগঠনটির সভাপতি ডা. মবিন খানও এ ধরনের গবেষণা করেছিলেন।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীদের (২৩ দশমিক ৯ শতাংশ) তুলনায় পুরুষদের (৭৬ দশমিক ১ শতাংশ) আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি, ১৮ থেকে ২৯ বছরে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্তদের হার সবচেয়ে বেশি এবং কৃষকদের মধ্যে আক্রান্তের হার (৮ দশমিক ৯ শতাংশ) তুলনামূলক বেশি।

বাংলাদেশে একিউট হেপাটাইটিস (প্রচলিত জন্ডিসের) ৪৩ শতাংশ ক্ষেত্রে হেপাটাইটিসই ভাইরাস ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে বি ভাইরাস এবং ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে এ ভাইরাসের কারণে হয়। লিভার সিরোসিসের জন্য হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ৬০ শতাংশ, সি ভাইরাস ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী। লিভার ক্যান্সারের জন্য হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ৬৫ শতাংশ এবং সিভাইরাস ১৭ শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী।

কোন কারণে কোন ভাইরাসে আক্রমণ করে
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, হেপাটাইটিস ই এবং এ ভাইরাস পানিবাহিত রোগ। হেপাটাইটিস সি ভাইরাস রক্তবাহিত রোগ। বাংলাদেশে বি ভাইরাস সংক্রমনের অন্যতম কারণ হলো জন্মের সময় মায়ের কাছ থেকে শিশুর মধ্যে ছড়িয়ে থাকে। এজন্য ১৮ লাখ সন্তানদানে সক্ষম নারীর চিকিৎসা জরুরি। আর শিশুদের ক্ষেত্রে রোগটি ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ক্রনিক লিভার ডিজিজ তৈরি করে। তাই ১৫ লাখ শিশুর চিকিৎসা ও অত্যন্ত জরুরি।

যেসব সমস্যায় রয়েছে এসব ভাইরাসে আক্রান্তরা
রোগ ছাড়াও নানা সমস্যায় রয়েছে এসব ভাইরাসে আক্রান্তকারীরা। দেশের ২৫ লাখের বেশি যুবক-যুবতী দেশে-বিদেশে বিভিন্ন বৈষম্যের স্বীকার। এরা বিদেশে যেতে পারছে না, দেশেও চাকুরিতে অযোগ্য ঘোষণা করা হচ্ছে তাদের। তবে চাকুরিতে অযোগ্য ঘোষণা করাটা অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক। কারণ এরা সবাই রোগাক্রান্ত নয়।

তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি-এর প্রভাব নিম্নগামী। ২০০৪ সালে ইপিআই প্রোগ্রামে বি ভাইরাসের টিকা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর এটি ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। টেকশই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৩ নং লক্ষ্য অনুয়ায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সরকার হেপাটাইটিস বি ও সি নির্মূলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বাংলাদেশে হেপাটাইটিসের সব চিকিৎসা বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন খরচে করা সম্ভব বলে ওই গবেষণায় বলা হয়।

ডা. শাহিনুল আলম বলেন, এই পরীক্ষার খরচ হবে মাত্র ৩০ টাকা। সারাদেশের লোকের এই পরীক্ষা করাতে ৫শ কোটি টাকা খরচ হবে, এতে ৫ হাজার কোটি টাকা বাঁচানো সম্ভব হবে।

২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস বি ও সি নির্মূলে সুপারিশ
১. দেশের সব সরকারি হাসপাতালে এসব ভাইরাসের পরীক্ষা বিনামূল্যে করার ব্যবস্থা করতে হবে।

২. ভাইরাসে আক্রান্তকারীদের সরকারি বা বেসরকারি চাকুরিতে অযোগ্য ঘোষণা করা যাবে না।

৩. প্রজননক্ষম নারী ও শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া জরুরি।

৪. শিশু জন্মের পর মা ও নবজাতক শিশুকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া প্রয়োজন

৫. হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের চিকিৎসায় ভেলপাতাসভির, ভক্সিলাপ্রিভির ও পিব্রেন্টাসভিরকে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ঘোষণা করে এর কাঁচামালের উপর শুল্ক ও ভ্যাট কমিয়ে এবং এর দাম সরকারি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

৬. এই ভাইরাস নির্মূলে ওষুধ উৎপাদনের উদ্যোগ নিতে হবে।

অনুষ্ঠানে বিএসএমএমইউর সাবেক ভিসি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, এসব ভাইরাস দমনে উদ্যোগ নেয়া জরুরি। এজন্য আলাদা ইনস্টিটিউট স্থাপন করতে হবে। এসব বিষয়ে গবেষণা করার জন্য বাজেটে অর্থ বরাদ্দ রাখার পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন করতে হবে।

সেমিনারে জানানো হয়, গত ৪৭ বছরে অধ্যাপক মবিন খানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের লিভার বিশেষজ্ঞদের করা ভাইরাল হেপাটাইটিস সম্পর্কিত ১৫৪ টি গবেষণা পত্র প্রকাশিত হয়েছে। এসব গবেষণা পত্র বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অষ্ট্রেলিয়া, চীন, হাঙ্গেরী, তুরস্ক, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং ফিলিপাইন থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এসব গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের লিভার বিশেষজ্ঞরা এ পর্যন্ত ১৫টি আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছে।

আগামী ২৮ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস ডে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়- হেপাটাইটিস নির্মূল করা। আর প্রচারণা হচ্ছে- না জানা লক্ষ লক্ষ হেপাটাইটিস রোগী খুঁজে বের করা, এজন্য দ্রুত পরীক্ষা করা। কারণ সারা বিশ্বে বর্তমানে সাড়ে ৩২ কোটি লোক হেপাটাইটিসে আক্রান্ত। এদের ৯০ শতাংশই জানে না, তাদের হেপাটাইটিস রয়েছে।

সংগঠনটির সভাপতি অধ্যাপক মবিন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক এম এ ফয়েজ, বিএসএমএমইউর লিভার বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নুরুদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক আবু সাঈদ, ডা. মোতাহার হোসাইন, ডা. গোলাম আজম, ডা. গোলাম মোস্তফা, ডা. মোড়ল নজরুল ইসলাম প্রমুখ।

#বাংলাটপনিউজ/আরিফ