প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন ইমরান খান

0
22

২২ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর অবশেষে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত ও কলঙ্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান। তবে তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের সম্ভাবনা না থাকায় ঝুলন্ত পার্লামেন্ট পেতে যাচ্ছে পাকিস্তান।

তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছে। পাকিস্তান পিপলস পার্টিসহ (পিপিপি) অন্য প্রধান দলগুলোও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনেছে। এর প্রতিবাদে তারা শিগগিরই সর্বদলীয় বৈঠকের চিন্তা করছে। সব মিলিয়ে ইমরানের ‘নয়া পাকিস্তানের’ স্বপ্নকে পার্লামেন্টের ভেতরে-বাইরে লড়াই করতে হবে।

গত বুধবার দেশটির ১১তম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ২৪ ঘণ্টা পরও ফল প্রকাশ করতে পারেনি বিতর্কের মুখে থাকা পাকিস্তান নির্বাচন কমিশন (ইসিপি)।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে দেশটির গণমাধ্যম ডন জানায়, সর্বশেষ ৪৯ শতাংশ ভোটকেন্দ্রের গণনা শেষে পাকিস্তান পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ—জাতীয় পরিষদের ২৭২টি আসনের মধ্যে ১৯৪টি আসনের বেসরকারি ফল ঘোষণা করা হয়। এতে ‘সেনা আনুকূল্য পাওয়া’ ইমরান খানের পিটিআই ৯৮টি আসনে জয়লাভ এবং ২২টি আসনে এগিয়ে ছিল। জয়লাভসহ মোট ১২০টি আসনে অগ্রগামী ছিল পিটিআই। পিএমএল-এন ৪৯টি আসনে জয়লাভসহ মোট ৬১টি আসনে অগ্রগামী ছিল।

পিএমএল-এন ও অন্যদের অভিযোগ :

এ নির্বাচনে অস্বাভাবিক ফল বিলম্বের ঘটনা ঘটেছে। গত বুধবার রাত ২টার পর আর কোনো ভোটগণনা হয়নি। ফের গতকাল বিকেলে ভোটগণনা শুরু করে ইসিপি।

ভোটগণনা বিলম্ব দেখে গত বুধবার মধ্যরাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেন নওয়াজ শরিফের পরিবর্তে দলের দায়িত্বে থাকা তাঁর ভাই পিএমএল-এনের সভাপতি শাহবাজ শরিফ। তিনি সরাসরি এ নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ফল প্রকাশে বিলম্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ সময় তিনি জানান, ভোটগণনার সময় তাঁর দলের পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়। তাঁদের কাউকে ফরম-৪৫ (রেজাল্ট শিট) দেওয়া হয়নি। একই অভিযোগ করে পিপিপি, এমএমএ, এএনপি, এমকিউএম, পিএসপি, টিএলপিসহ ছয়টি রাজনৈতিক দল।

শাহবাজ শরিফ নির্বাচনে সংগঠিত কারচুপির অভিযোগ এনে বলেন, সুষুম ও স্বচ্ছ নির্বাচন হলে তিনি এ ফল মেনে নিতেন। তিনি এই ফলকে জনগণের ম্যান্ডেটের অপমান বলে অভিহিত করেন। পরে তাঁর দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এ নিয়ে তারা অন্যান্য দলের সঙ্গে বৈঠক করবে।

পিপিপি নেতা বিলাওয়াল ভুট্টোর মুখপাত্র মুস্তফা নওয়াজ কোখার একই অভিযোগ তুলে বলেন, এ জন্য দেশকে ভয়ংকর পরিণতি ভোগ করতে হবে। এমএমএ সভাপতি মাওলানা ফজলুর রহমান জানান, তাঁরা কারচুপির অভিযোগ নিয়ে সর্বদলীয় সভা আহ্বান করবেন।

ঝুলন্ত পার্লামেন্ট :

বিবিসি জানায়, প্রাথমিক ফলাফলে ইমরান খানের দল এগিয়ে থাকলেও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে তাঁকে সরকার গঠনের জন্য জোট বাঁধতে হতে পারে। সরকার গঠন করতে হলে যেকোনো দলকে ১৩৭টি আসনে জিততে হবে। কোনো দল সেই আসন না পেলে ঝুলন্ত পার্লামেন্টের দিকে যেতে পারে পাকিস্তান। জাতীয় পরিষদে সরাসরি নির্বাচনের মোট আসনসংখ্যা ২৭২। দুটি আসনে ভোট স্থগিত রয়েছে। নারী ও সংখ্যালঘুদের সংরক্ষিত ৭০টি আসন বিজয়ী দলগুলোর মধ্যে সংখ্যানুপাতে বণ্টন হবে।

প্রাদেশিক নির্বাচন :

একই দিন জাতীয় পরিষদের পাশাপাশি পাকিস্তানের চারটি প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। এতে পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদে জয়লাভ করেছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন। দলটি ১৩২টি আসনে জয়লাভ করেছে। সেখানে ১২৩টি আসন পেয়ে পিএমএল-এনের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে ইমরানের পিটিআই।

খাইবার পাখতুনের প্রাদেশিক পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে পিটিআই। তারা ৬৪টি আসন পেয়েছে। এ ছাড়া স্বতন্ত্র আটটি, এমএমএ পাঁচটি, এমএমএল-এন তিনটি পেয়েছে। সিন্ধুর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে অনুমিতভাবেই জয়লাভ করেছে বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পিপিপি। তারা ৭০টি আসনে জয়লাভ করেছে। সেখানে পিটিআই ২২টি, এমকিউএম ২০টি, গণতান্ত্রিক মহাজোট (জিডিএ) ১২টি ও পিএমএল তিনটি আসন পেয়েছে।

বিজয় ঘোষণা ইমরানের :

অন্যদিকে বেসরকারিভাবে চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগেই নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেছেন ইমরান খান। এ সময় তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন এবং অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দলগুলোকে সুযোগ দেওয়া হবে বলে জানান।

গতকাল বিকেল ৪টায় রাজধানী ইসলামাবাদের কাছে নিজ বাড়ি থেকে ভাষণ দেন ইমরান খান। ৬৫ বছর বয়সী এই নেতা বলেন, ‘২২ বছর আগে আমি যে চিন্তাধারা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম, তা বাস্তবায়ন করতে আল্লাহ আমাকে ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। ’ তিনি বলেন, পাকিস্তানে এ সরকারই হবে প্রথম, যারা কোনো রকম রাজনৈতিক দমন-পীড়ন চালাবে না।

তবে ইমরান খান ফের ভোট কারচুপির অভিযোগ নাকচ করে বলেছেন, ‘বুধবারের এ নির্বাচন পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে সুষ্ঠু হয়েছে। ’ তিনি অভিযোগকারী দলগুলোর নেতাদের বলেন, ‘আপনারা নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে মনে করে থাকলে বা আপনাদের কোনো সন্দেহ থেকে থাকলে আমরা এর তদন্তে সহযোগিতা করব। আমরা আপনাদের পাশে থাকব। ’ এ সময় তিনি নতুন পাকিস্তান গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

ম্যান অব দ্য ম্যাচ :

পাকিস্তানের গণমাধ্যম দি ট্রিবিউন এক্সপ্রেস গতকাল বিকেলে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে জানায়, বেসরকারি ফল অনুযায়ী ২২ বছরের লড়াই শেষে ইমরান খানের স্বপ্ন বাস্তব হতে চলেছে। তাঁর দল সুস্পষ্টভাবে এগিয়ে আছে। এর আগে বুধবারই পিটিআইয়ের সমর্থকরা বিজয় মিছিল করে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে ইমরানের পিটিআই ছাড়া সব দলই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তবে এই নির্বাচন পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে কলিঙ্কত নির্বাচন হলেও নির্বাচনের ভালো দিক হলো, নিরাপত্তার শঙ্কা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক পাকিস্তানি ভোট দিতে যায়।

সূত্র : বিবিসি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, ডন।

#বাংলাটপনিউজ/আরিফ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here