লালমনিরহাটে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার চেষ্টা ‘চিরকুট’: “আমার মৃত্যুর জন্য হেড স্যার দায়ী”

0
68

শাহিনুর ইসলাম প্রান্ত,লালমনিরহাট প্রতিনিধি: জেএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহনের সুযোগ না দেয়ায় সিলিং ফ্যানে ঝুলে আত্মহত্যার চেষ্টা করে তুষভান্ডার আর.এম. এম.পি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহফুজ হাসান। আত্মহত্যার চেষ্টার পর মাহফুজ হাসানের পরিবারের লোকজন দেহ তল্লাশি করে একটি ‘চিরকুট’ উদ্ধার করেন। ওই চিরকুটে লেখা রয়েছে। “আমার মৃত্যুর জন্য হেড স্যার দায়ী। ” এ ঘটনার পর থেকে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার আর.এম.এম.পি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের উপর ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের অভিবকরা বদলির চেয়েছেন । ঘটনাটি ঘটে গত ৬আগষ্ট সোমবার সন্ধায়।

স্থানীয় এলাকাবাসী ও মাহফুজ হাসানের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়,আসন্ন ২০১৮ সালের জেএসসি পরীক্ষায় কোন রকম টেস্ট পরীক্ষা না নিয়েই প্রথম সাময়িক পরীক্ষার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে ৫৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে এবারের জেএসসি পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ থেকে বাদ দিয়েছে। লালমনিরহাট জেলায় ক্রিকেটে অল রাউন্ডার খেলোয়ার হিসাবে কৃতিত্ব অর্জন করায় তাকে বিকেএসপি’তে প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ পায়। যে কারণে প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় যথারীতি অংশ গ্রহণ করলেও তার ফলাফল সন্তোসজনক না থাকায় তাকে জেএসসি পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ থেকে বাদ দেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

মাহফুজ গত ২ আগষ্ট’১৮ তারিখে প্রধান শিক্ষক বরাবরে এক লিখিত আবেদনে উল্লেখ করে যে, ক্রিকেট খেলোয়ার হিসেবে জেলা পর্যায়ে অনুশীলন করার কারণে পড়াশোনায় মনযোগী হতে পারেনি। যে কারণে তার প্রথম সাময়িক পরীক্ষা কিছুটা খারাপ হয়। সে আবেদনের সাথে একটি অঙ্গীকারনামা দিয়েছিল এবং সেখানে লিখেছে তাকে জেএসসি পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দিলে সে নিশ্চিত জিপিএ-৫ অর্জন করবে। যে আবেদন পত্রটিতে মানবিক কারণে স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান মাহবুবুজ্জামান আহমেদ একজন খেলোয়ার হিসেবে মাহফুজকে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগদানের জন্য প্রধান শিক্ষক বরাবরে লিখিত আবেদনে সুপারিশ করেছিলেন।

সবকিছু প্রচেষ্টায় যখন ব্যর্থ, ৬ আগস্ট সন্ধায় তুষভান্ডারস্থ ভাড়া বাসায় সেলিং ফ্যানের সাথে ফাঁস টেনে আত্মহত্যা করার পথ বেচে নেয়। কিন্তু বেঁচে যায় তার বড় বোনের কারণে । দরজায় লাথি দিয়ে ছিটকিনি ভেঙ্গে রোমে ঢুকে মাহফুজকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন। পরিবারের লোকজন মাহফুজের দেহ তল্লাশি করে একটি ‘চিরকুট’ উদ্ধার করেন। সেই ‘চিরকুটে’ মাহফুজ লিখেছে “আমার মৃত্যুর জন্য তুষভান্ডার আর.এম.এম.পি. সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের হেড স্যার দায়ী। ইতি: মাহফুজ হাসান, ০৬/০৮/২০১৮ইং ” আরেক অংশে লিখেছে “ উপজেলা চেয়ারম্যান স্যার আমার জন্য সুপারিশ করিয়াছিলেন। দোয়া করি আল্লাহ যেন তাঁকে সুস্থ্য রাখেন। ইতি: মাহফুজ হাসান,০৬/০৮/২০১৮ ইং।”

ঘটনা জানাজানি হলে পরের দিন (৭আগষ্ট) অন্যান্য সংবাদকর্মীদের সাথে এ প্রতিনিধি মাহফুজদের বাসায় গিয়ে ঘটনার আদি-অন্ত জানা যায়। পরে, তুষভান্ডার আর এম এম পি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নলনী কান্ত রায়ের সাথে তাঁর কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে গেলে তিনি মাহফুজ সম্পর্কে প্রথমে কোন রকম তথ্য দিতে রাজি হননি। তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন দেশে এ ধারণের মৃত্যু অনেক ঘটছে। তাতে শিক্ষকের কিছু হয়নি। এমনকি সংবাদ কর্মীদের চরিত্র নিয়েও তিনি বিরূপ মন্তব্য করেন। এ সময় বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবু সাঈদ মন্ডল কক্ষে এসে প্রধান শিক্ষকের গুণ-কীর্ত্তনে অতি উৎসাহী হয়ে উঠেন। তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান কেন স্বয়ং মন্ত্রীর সুপারিশেও কোন কাজ হবেনা।

সহকারী শিক্ষক মন্ডল আরো বলেন, ‘আমাদের হেড স্যারের মত সৎ অফিসার উপজেলায় দ্বিতীয়টি নেই। উপজেলার সবাই ঘুষ ঘোর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, ‘স্যারদের কাছে প্রাইভেট না পড়লে বিদ্যালয়ের স্যাররা পরীক্ষায় নম্বর কম দিয়ে পরীক্ষায় ফেল দেখানো হয়। আবার টাকা দিলে কম নম্বর শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করার সুযোগ করে দেয়া হয়। এমনটা জানালেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একাধিক প্রধান শিক্ষক। ‘ কোন শিক্ষার্থী যদি ৫ বিষয়ে ফেল করে,তাকে সঙ্গত কারণে জেএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহনের সুযোগ দেয়াটা ঠিক হবেনা।’ এমনটা জানালেন সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ রবিউল হাসান ।

তবে, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আজিজুল ইসলাম জানান ‘জেএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে কাউকে বাদ দেয়ার এমন কোন বিধি বিধান আছে বলে আমার জানা নেই।’