দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ৬৮ কোটি টাকা লুট

0
53

দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে চালু করা উচ্চ মাধ্যমিক উপবৃত্তি প্রকল্পের ৬৮ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। এ প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি ও রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে সরকারি অডিট কর্মকর্তারা। আত্মসাৎ করা এ অর্থ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আদায় করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়ার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

এ নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রকল্পে তুমুল সমালোচনার ঝড় উঠেছে। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাজেট বরাদ্দ, ডিপিপি, ক্যাশবই, বিল-ভাউচারসহ সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে ১১ দফায় ৬৮ কোটি ১৩ লাখ ৭৮ হাজার ১৪৮ টাকার অনিয়ম পেয়েছে অডিট কর্মকর্তারা।

এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি দোষাদোষি চলছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৪৪ কোটি ৮১ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। আর্থিক বিবরণীতে শত ভাগ অর্থ খরচ দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ কোটি ৯২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা দ্বাদশ শ্রেণি এবং ৪৬ কোটি ২৪ লাখ ৮১ হাজার ৯০০ টাকা একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি বিতরণ বাবদ অগ্রণী ব্যাংকে জমা দেয়া হয়। অবশিষ্ট ৬৩ কোটি ৬৪ লাখ ৪৯ হাজার ৩০০ টাকা কোন খাতে কীভাবে খরচ করা হয়েছে তার প্রমাণ নেই। তবে বিলের সঙ্গে সংযোজিত এক বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে ৫৩ কোটি ৮১ লাখ ৫২ হাজার ৩০০ টাকার উপবৃত্তি হিসেবে দেয়া হয়েছে।

এ টাকা কোথায় কতজন শিক্ষার্থীর মধ্যে বিতরণ হয়েছে তার কোনো বিল-ভাউচার নেই। সরকারি বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ভাউচার সংরক্ষণ করার দায়িত্ব নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার হলেও তিনি তা দেখাতে পারেননি। আর বাকি টাকার কোনো বিল-ভাউচারই নেই। লোপাট হওয়া বেশিরভাগ টাকায় সম্প্রতি অবসরে যাওয়া প্রকল্প পরিচালক (পিডি) শ্যামা প্রসাদ বেপারীর বিরুদ্ধে।

পিডি প্রকল্পের টাকায় কেনা একটি পাজেরো জিপ নিয়মিত ব্যবহার করেন। প্রকল্প থেকে গাড়ি ও গাড়ি মেরামত, সংরক্ষণ সুবিধা হিসেবে প্রতি মাসে ৪৫ হাজার টাকা করে তুলে নেন। ২০১৫ সালের জুলাই থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০ মাসে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সার্বক্ষণিক গাড়ি সচল রাখতে মেরামত, জ্বালানি, ড্রাইভারের বেতনসহ অন্যান্য খরচ বাবদ অফিস থেকে ৩৫ শতাংশ অর্থ নিতে পারবেন।

এ হিসেবে তিনি অতিরিক্ত ৮ লাখ ৭৭ হাজার ৫০০ টাকা বাড়তি নিয়েছেন। যা পিডির কাছ থেকে আদায় করে সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রকল্পের সাবেক পিডি বর্তমানে এলপিআর-এ থাকা শ্যামা প্রসাদ বেপারী বলেন, পিডি হিসেবে প্রকল্পের গাড়ি সবাই ব্যবহার করে, আমিও করেছি। সেটা তো অন্যায় কিছু না। হিসাব-নিকাশ যদি গরমিল থাকে তা অবশ্যই জমা দিয়ে দেবো।

পিডির দায়িত্বে থাকাকালীন অডিট আপত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্পে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। সেগুলো ধরতেই আমি অডিট করিয়েছি। যারা দুর্নীতি করেছে তারা বর্তমানে কর্মরত আছে। তাদের জিজ্ঞেস করলেই সব জানতে পারবেন।

অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের যানবাহন মেরামত করতে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। মেরামতের বরাদ্দের টাকা খরচ করার পরে গাড়ি কেনার খাত থেকে বাড়তি ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ টাকা খরচ করা হয়েছে। আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ ২০০৫ (উন্নয়ন)-এর ২-এ ২ ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পের ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাজেট বরাদ্দ, ডিপিপি ক্যাশবই, বিল-ভাউচারসহ সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে ১১ দফায় ৬৮ কোটি ১৩ লাখ ৭৮ হাজার ১৪৮ টাকার অনিয়ম পেয়েছে অডিট কর্মকর্তারা।

সূত্র জানিয়েছে, অডিট আপত্তির পর প্রকল্পের কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভুয়া বিল-ভাউচার বানিয়ে পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছেন। আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ধারা ৫২ এ অনুযায়ী ২৫ লাখ টাকার বেশি মোবাইল ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের পরিশোধিত বিলের উপর ১২ শতাংশ উৎসে আয়কর কর্তনের বিধান রয়েছে।

অগ্রণী ব্যাংকের সঙ্গেউচ্চমাধ্যমিক উপবৃত্তি প্রকল্প থেকে ১ শতাংশ হারে চুক্তি অনুযায়ী ১ কোটি ৪৭ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬৮ টাকা প্রাপ্য। ১২ শতাংশ উৎসে আয়কর ১৭ লাখ ৭৪ হাজার ৬৪ টাকা হলেও কর্তন করা হয়েছে ১৪ লাখ ৭৮ হাজার ৩৮৭ টাকা। অর্থাৎ ২ লাখ ৯৫ হাজার ৬৭৭ টাকা কম কর্তন করা হয়েছে। যা সরকারের রাজস্ব ক্ষতি।

অডিট আপত্তির ব্যাপারে বর্তমান প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, আমার সময়ে কোনো অডিট আপত্তি নেই। আমি এসব বিষয়ে কথা বলবো না।

এসময় তার রুমে উপস্থিত প্রকল্পের উপ-পরিচালক শ. ম. সাইফুল আলমের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, অডিট করার সময়ে নানা বিষয়ে আপত্তি তুলে। পরে আবার যথাযথ জবাব দিলে নিষ্পত্তি হয়ে যায়। অডিট আপত্তি মানেই দুর্নীতি না। উপবৃত্তি বিতরণ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় অডিট আপত্তি নিয়ে কাজ করতে পারিনি। শিগগিরই আমরা জবাব দেবো। বিল-ভাউচার অফিসে সংরক্ষণ নেই কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো আছে, খুঁজে বের করতে হবে।