সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের আদিবাসীদের উপর হামলার বিচার ও জমি ফেরতের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন

0
27

সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি ও নাগরিক সমাজের উদ্যোগে আজ সকাল ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের সাঁওতাল-বাঙ্গালিদের ভূমি অধিকারের সংগ্রাম ও বর্তমান পরিস্থিতি: তিন সাঁওতাল হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও মিথ্যা মামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান, নিজ বসত বাটিতে পুর্নবাসন এবং বিচারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার কমিটির সভাপতি ডা: ফিলিমন বাস্কে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য্য, বিশিষ্ট নাট্যজন মামুনুর রশীদ, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা কাজল দেবনাথ, আইইডির নির্বাহী পরিচালক নূমান আহম্মদ খান, কাপেং ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি হিরণ মিত্র চাকমা, আদিবাসী যুব পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি হরেন্দ্রনাথ সিং, সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাফরুল্লাহ প্রধান, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বিভূতী ভূষণ মাহাতো, সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির স্বপন, গনেশ মুর্মু প্রমূখ

লিখিত বক্তব্যে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার কমিটির সভাপতি ডা: ফিলিমন বাস্কে বলেন, ২০১৬ সালের ৬ ও ৭ নভেম্বর গাইবান্ধা জেলার সাহেবগঞ্জ ও বাগদাফার্ম এলাকায় পরিকল্পিতভাবে পুলিশ ও সন্ত্রাসী বাহিনী মিলিতভাবে আদিবাসী ও বাঙালী কৃষকদের উপর আক্রমণ চালায়। পুলিশের উপস্থিতিতে চিনিকল মালিকের সন্ত্রাসীরা আদিবাসীদের বাড়িঘরে আগুণ দেয়। পুলিশের গুলিতে তিনজন আদিবাসী সাঁওতাল নিহত হন। তারা হলেন শ্যামল হেম্ব্রম, মঙ্গল মার্ডি, রমেশ টুডু। সন্ত্রাসীদের আক্রমণে ও পুলিশের গুলিতে ৩২ জন আদিবাসী নারীপুরুষ মারাত্মকভাবে আহত হয়। আহতের মধ্যে বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়। পুলিশ ও সন্ত্রাসী বাহিনী মিলে আদিবাসীদের উপর গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, লুটপাট করেছে হাঁস-মুরগী, গরু ছাগলসহ বাড়িঘরে থাকা আসবাবপত্র ও সম্পদ লুন্ঠন করেছে।

ঘটনার পরপরই আদিবাসীদের এলাকা ঘেঁসে কাঁটা তারের বেড়া দেওয়া হয়েছে তা এখনো রয়েছে। কাঁটাতারের বেড়ার কারণে আশেপাশের আদিবাসীরা ফার্মের জমিতে যেতে পারেনা। পুলিশের গুলিতে আহত ব্যক্তিরা এখনো শরীরের ভিতরে গুলি বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করে জীবন যাপন করছে। থমাস হেমব্রম বাদী হয়ে সাংসদ আবুল কালাম আজাদ সহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে থানায় এজাহার রেকর্ড করা হচ্ছিল না এবং বর্তমানে এই মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। উল্টো পুলিশ আদিবাসী-বাঙ্গালিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে অনেককে গ্রেফতার ও জেলহাজতে প্রেরন করে। এখনও আদিবাসী ও বাঙ্গালিদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক ৮টি মামলায় ১০৫ জনকে আসামী করে মামলা চলমান রয়েছে। দ্রুত সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের বাপদাদার জমি ফেরতসহ ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান দাবি জানান তিনি।

ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচায্য বলেন, গাইবান্ধার সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের আদিবাসী ও বাঙ্গালিদের উপর নির্মম ঘটনার মদদদাতা স্থানীয় এমপি আবুল কালাম আজাদ ও সাপমারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যন শাকিল আকন্দ বুলবুল সহ জড়িতদের কোন বিচারের পদক্ষেপ রাষ্ট্র নিতে পারেনি। তিনি সেখানকার প্রকুত মালিদের নিকট জমি ফেরত ও বর্বরোচিত ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানান। এছাড়াও খুন, দুর্নীতি, সাঁওতাল ও বাঙ্গালিদের নির্যাতন এবং মাদকের অভিযোগে অভিযুক্ত আবলি কালাম আজাদকে আগামী নির্বাচনে প্রতিনিধি মনোনয়ন না দেবার জন্য শেখ হাসিনার কাছে আহ্বান জানান।

বিশিষ্ট নাট্যজন মামুনুর রশীদ বলেন, দীর্ঘ দুই বছর হতে চললেও ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান ও বিচার না হওয়া মেনে নেওয়া যায়না। এতোদিন পরে এসে আবারও ঘটনার বিচার চাইতে হবে এটা অপ্রত্যাশিত। সেখানকার আদিবাসী ও বাঙ্গালিদের প্রতি যে চরম মানবাধিকার লংঘন হয়েছে তার সুষ্ঠু বিচার দ্রুত করতে হবে। একই সাথে রিক্যুইজিশনের মাধ্যমে অধিগ্রহণকৃত বাগদাফার্মের জমি প্রকুত মালিদের ফেরত দেবার দাবি করে তিনি।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, বহুল আলোচিত ও মিডিয়ায় বহুল প্রচারিত একটি চরম মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা হওয়া সত্ত্বেও সুষ্ঠু বিচার না হওয়া সতিই অমানবিক ও হতাশার। তিনি আরও বলেন, যেকোন মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু এক্ষেত্রে রাষ্ট্র বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন দাবি করেন, ২০১৬ সালের ঘটনার পর সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করেছি। সরকারের পক্ষে সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সাথে দুইবার বৈঠকে দ্রুত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে কোন ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। আদিবাসী ও বাঙ্গালিদের বাপ-দাদার জমি ফেরতের দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন যে, আইনের প্রতি জনগণের বিশ্বাস আনতে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের বর্বরোচিত ঘটনার মূলহোতা ও জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা কাজল দেবনাথ বলেন, সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মদদে খুবই ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। তিনি সেখানকার আদিবাসী ও বাঙ্গালিদের জমি ফেরত দেওয়া এবং যে সকল জনপ্রতিনিধিরা ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন চালিয়েছে তাদের আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন না দেবার দাবি করেন।

মানবাধিকার কর্মী ও আইইডির নির্বাহী পরিচালক নূমান আহম্মদ খান বাগদাফার্মের ঘটনায় সাংবাদিকদের ভূমিকার প্রশংসা করে সেখানকার ভূমিহীন আদিবাসী ও বাঙ্গালিদের ভূমি অধিকারের আন্দোলনে পাশে থাকার আহ্বান জানান। তিনি সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান করার দাবি জানান সরকারের প্রতি। যারা রাষ্ট্রে আইনকে ব্যবহার করে জনগনকে নির্যাতন ও অত্যাচার করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবারও দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির দাবিসমূহ:

১.গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম-এর রিক্যুইজিশন ( Requisition) করা ১৮৪২.৩০ একর সম্পত্তি আদিবাসী ও বাঙ্গালিদের ফেরত দিতে হবে।

২.আদিবাসীদের সম্পত্তি কোন সরকার/কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রিক্যুইজিশন (Requisition) করা এখতিয়ার বহির্ভূত হওয়ায় এ ধরণের কার্য বাতিল ও পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করে আদিবাসীদের সম্পত্তি ফেরত দিতে হবে।

৩.আদিবাসী সাঁওতালপল্লীতে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং গুলি করে নিহত ও গুরুতর আহত করার সাথে জড়িত উস্কানীদাতা ও সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নিহত ও আহতদের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

৪.৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ আদিবাসী-বাঙালিদের বিরুদ্ধে মিথ্যামামলা প্রত্যাহার করতে হবে। আদিবাসী-বাঙালি নারী-পুরুষের উপর স্থানীয় সন্ত্রাসীদের জুলুম ও পুলিশী হয়রানি বন্ধ করতে হবে।

৫.১৯৪৮ সালের The East Bengal (Emergency) Requisition of Property Act 1948 (No. VIII of 1948) মোতাবেক যে কার্যের জন্য (ইক্ষুচাষ) গ্রহণ হয় তা না করা হলে খেসারতসহ পূর্বমালিক আদিবাসীদের ফেরতের বিধান বাস্তবায়ন করতে হবে।

৬.আদিবাসী সাঁওতালদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগকারী চিহ্নিত পুলিশ কর্মকর্তাসহ জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

৭.২০০৪ সালে সুগার মিল বন্ধের পর প্রভাবশালীদের মাঝে লিজের নামে যে অর্থআত্মসাৎ ও দুর্নীতি হয়েছে সেই দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৮.ফুলমনি মুরমু শিশু শিক্ষা ও সংস্কৃতিকেন্দ্র সরকারি খরচে নির্মাণ করতে হবে। আদিবাসী শিশুদের পুড়ে যাওয়া বই ও শিক্সা উপকরণ সরকারি খরচে বরাদ্দ করতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here