অন্তরে সৈয়দ কালুশাহ ফকির !

0
78

মহান সাধক সৈয়দ কালুশাহ ফকির পরম প্রেমে-প্রেমিক হয়ে আজীবন পরমাত্ব খুঁজে ফিরেছেন। তিনি উপ-মহাদেশের অন্যতম আধ্যাত্বিক সিদ্ধি পুরুষ। কালুশাহ ফকির ১৮০৯ কিংবা ১৮১০ইং সালে তৎকালীন পাবনা জেলার (বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার) উল্লা-পাড়া উপজেলার কালিগঞ্জ গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম নিতাই ব্যাপারী, এবং মাতার নাম নুরজাহান বেগম। জন্মের পর তার নাম রাখা হয়েছিল অছিমুদ্দিন। শিশু কালে মাতাকে আদর করে (গায়ের রং কালো থাকার কারণে) কালু বলে ডাকতেন। পরবর্তীকালে এই কালুই মহান সাধক ‘সৈয়দ কালুশাহ ফকির’ নামে খ্যাতি লাভ করেন।

জীবন যুদ্ধের ইতিহাস পরিক্রমা থেকে জানা যায়, পিতা নিতাই ব্যাপারী ছিলেন একজন ক্ষুদ্র-ব্যবসায়ী। ব্যবসা-বানিজ্যের কারণে প্রায়ই তাকে নিজ বাড়ী কালিগঞ্জ ছেড়ে দুর- দূরান্তে পড়ে থাকতে হত। ‘অছি মুদ্দিনের’ বয়স যখন ১০বছর সেই সময় নিতাই ব্যাপারী স-স্ত্রীক বেড়াতে আসেন শ্বশুরালয়-তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার সাটুরিয়ার কাউন্নারা গ্রামে। সঙ্গে ছিল তার ছেলে -অছিমদ্দিন এবং কন্যা -শাবানী। পরবর্তীতে তিনি স্ত্রী, পুত্র, কন্যাকে শ্বশুড়ালয়ে রেখে ব্যবসার কাজে বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেও তিনি ফিরে ছিলেন কিনা তার সঠিক তথ্য আজ ওজানা যায়নি।

সে সময় থেকেই বালক অছিমুদ্দিন তার মায়ের সঙ্গে কাউন্নারা গ্রামে তার মামার বাড়ীতে বড় হতে থাকে।নানা কোরবান আলী সরদার ছিলেন সে সময়ের প্রভাবশালী লাঠিয়াল দলের নেতা।মামা জামাল সরদার এবং কামাল সরদারের ইচ্ছা ছিল তাদের ভাগ্নে তাদের মতোই লাঠিয়াল হবে।

কিন্তু মায়ের একান্ত ইচ্ছায় তাকে কাউন্নারারা হাফিজিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয়।বাল্য কাল থেকেই অছিমদ্দিন স্মরণশক্তি এবং মেধা চরম বিকাশ ঘটতে থাকে। ফলে অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি কোরআন শরিফ মুখস্থ করে ”হাফেজ” উপাধি লাভ করেন। পরবর্তিতে তিনি কাউন্নারা মসজিদে ”ইমামতী” দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অল্প দিনেই নিজ গ্রামসহ এলাকার জনসাধারনের নিকট অছিমুদ্দিন শ্রদ্ধার পাত্র হিসাবে গন্য হন। তার আধ্যাত্বিক- চিন্তা ও মননভাবনায় ফকিরি ভাব প্রকাশ পেতে থাকে।

তিনি গভীর রাত পর্যন্ত মহান আল্লাহতা‘লার সৃষ্টি রহস্য নিয়ে চিন্তা ও সাধনায় মশগুল থাকেন।সাধনার এক পর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন, আধ্যাত্বিক সাধনার জন্য এক জনপথ-প্রদর্শক প্রয়োজন।তৎপর তিনি হযরত সৈয়দশাহ আতাউর রহমান আলকাদেরী কাছে মুরিদ হয়ে ঢাকাতে চলে আসেন।

তৎপর গুরু-শিষ্য উভয়েই ঢাকার- ধামরাইতে হাজী-গাজী-পীরনামক স্থানে আস্তানা স্থাপন করেন।এখান থেকেই আছিমুদ্দিনের রুহানী শক্তি এবং বিশুদ্ধ চিন্তা প্রকাশিত হতে থাকে এবং তিনি ‘কালুশাহ ফকির’ নামে (সিদ্ধ পুরুষ) হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি দিনের বেলায় স্বল্প ঘুমে থেকে সারারাত আল্লাহর ধ্যান- সাধনা মশগুল থাকতেন।লোকমুখ থেকে জানাযায় তিনি গভীর পানির নিচে দীর্ঘসময় ‘ধ্যান-সাধনায়’ রাত কাটাতেন।

এমনকি তিনি ৪১দিন মাটির নিচে কবরের মধ্যে থেকেও সাধনা করেছেন বলেও শুনা যায়।পীরের নির্দেশে একাধিক বার গভীর জঙ্গলে অ-নাহারে ঈশ্বর সাধনায় মশগুল থাকতেন। পরতর্বীতে সাধনার পথেই তিনি দিব্য দৃষ্টিলাভ করেন। তার আধ্যাত্বিক গুন ছিল তিনি কয়েক মাইল দুরে কোথায় কি ঘটছে, অবিকল তা বলে দিতে পারতেন।মাঝে মাঝে তিনি তার মামার বাড়ী সাটুরিয়া বাজার সংলগ্ন নদী পারের আস্ততানায় সময় কাটাতেন।

দূর-দূরান্ত থেকে অগনিত ভক্ত এসে তাকে ঘিরে থাকতো। তিনি সবাইকে ইহ-লৌকিক ও পর-লৌকিকমুক্তি এবং শান্তির পথ নির্দেশ করতেন। অধিকাংশ সময়ে তিনি গানের মাধ্যমে ভক্তদের প্রয়োজনীয় উপদেশ ও পরামর্শ দিতেন। এই গানগুলিই আজও হাজার হাজার ভক্ত, ফকির,বাউলের মুখে মুখে ফিরছে।বাউল গবেষণায়-দেখা গেছে, এ পযন্ত নিরিকদর্শন, মারিফতি, দেহতত্ব এবং ঈশ্বর প্রেমবিষয়ক দু ‘হাজারের ও বেশী গান সাড়া দেশে ছড়িয়ে আছে তার অগনিত ভক্তদের মাঝে।

সৈয়দ কালুশাহ ফকিরের গানের মর্ম কথায়-আধ্যাত্বিক বক্তব্যের স্বাক্ষর বহন করে।তিনি সত্যিকার অর্থেই একজন বড় মাপের সাধক-কামেল ছিলেন। ১৯০৫ইং সালে (বাংলা ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৩১২ সাল ) মামার বাড়ী সাটুরিয়ার কাউন্নারা গ্রামে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ।

বাড়ী সংলগ্ন স্থানেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়।বর্তমানে তার উত্তসূরি সৈদয় বাদশা আলম কালুশাহ্স্ব রনে ‘সাটুরিয়া সদরে ‘সৈয়দ কালুশাহ ডিগ্রী’ কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন । কালুশাহর যোগ্য উত্তরাধীকারি হিসাবে তিনিই মাজারের পরি-পাটিতে- অকাতরে অর্থ ব্যয় করে থাকেন । প্রতি বছর তার মৃত্যুবাষিকীতে এখানে সাত দিনব্যাপি বাউল-মেলা বসে।মেলাতে অগনিত মানুষের সমাগ্র মহয়।

উল্লেখ্য যে সৈয়দ কালুশাহ ফকিরের লিখিত গানগুলো নিয়ে বর্তমানে আন্তর্জাতিক গবেষণা চলছে।এই মহান বাউল সাধক আজীবন মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে বেচেঁ থাকবেন আমাদের মানিকগঞ্জ-সাটুরিয়া তথা সমগ্র বাংলাদেশে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here