অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

0
22

যেখানে সকাল হয় শাটলের ঝকঝক কিংবা হুইসেল ধ্বনিতে। পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয় সবুজ প্রকৃতি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে ওঠে কাটাপাহাড়ের রাস্তা। ভীড় জমতে থাকে ঝুপড়িগুলোয়। ক্লাস-পরীক্ষার ব্যস্ততাকে পেছনে ফেলে সতেজ থাকতে কখনও কখনও টেবিল চাপড়িয়ে অভিনব পন্থায় ঝুপড়িগুলোতে জমে দারুণ গানের আসর। আবার কেউ কেউ প্রেয়সীর হাত ধরে ঘুরে বেড়ায় বোটানিক্যাল গার্ডেন পুকুর পাড় কিংবা ফরেস্ট্রির সবুজাভ প্রান্তরে। হ্যাঁ, বলছিলাম দেশের সর্ববৃহৎ ক্যাম্পাস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। কী নেই এই ২১শ একরের ক্যাম্পাসে! বোটানিক্যাল গার্ডেন, ঝুলন্ত ব্রিজ, ফরেস্ট্রি, চালন্দা গিরিপথ, সুইচ গেট এবং ঝর্ণাসহ পুরো ক্যাম্পাস পাঠ্যসূচির সহচর বিনোদন কেন্দ্র।

শহর থেকে ক্যাম্পাসের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটারের। তাই শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য ১৯৮০ সালে চালু হয় শাটল ট্রেন। পৃথিবীর সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্র্যটা এখানেই। যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিবহনের জন্য ছিল নিজস্ব ট্রেন। কিন্তু বর্তমানে তা বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ই পৃথিবীর একমাত্র শাটল ট্রেনের বিশ্ববিদ্যালয়। কবি শামসুর রাহমান ছড়ায় খুঁজেছিলেন ট্রেনের ঠিকানা-

‘ঝক ঝক ঝক ট্রেন চলেছে
রাত দুপুরে অই
ট্রেন চলেছে ট্রেন চলেছে
ট্রেনের বাড়ি কই?’

চবির ট্রেনের ঠিকানা কিংবা গন্তব্য বটতলি থেকে ক্যাম্পাসের জিরো পয়েন্ট। দুটো শাটলের পাশাপাশি আছে ১টি ডেমুও। প্রতিদিন প্রায় দশ থেকে বার হাজার শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয় যাতায়াতের মাধ্যম এই শাটল ও ডেমু ট্রেন। শাটল দেখতে শুধু যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসেন তা কিন্তু নয়। বিদেশ থেকেও শাটল দেখতে চবিতে আসার অনেক নজির আছে। শাটলই হলো চবির প্রাণ।

অনেকে এই শাটলকে ‘ভ্রাম্যমাণ বিশ্ববিদ্যালয়’ও বলেন। আড্ডা, গল্প, গান, পড়ালেখা কী নেই এই শাটলে! বিভিন্ন বগিতে সবাই একসঙ্গে গান গেয়ে মাতিয়ে রাখেন পুরো ট্রেন। এবার চবির সৌন্দর্য আর ঐতিহ্যে যোগ হলো নতুন মাত্রা। দেরিতে হলেও দেশের স্বাধিকার আন্দোলনের স্মৃতিকে নির্দেশ করে স্বগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে ‘জয় বাংলা’ ভাস্কর্য। পাশাপাশি ক্যাম্পাস আঙিনায় হাইটেক পার্ক নির্মানের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে ইতোমধ্যে।

১নং গেট
১নং গেট (তুলির আঁকা, দীপ্র বণিক)

 

‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আজকের অবস্থানে আসতে অনেক বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছে। ক্যাম্পাস ছিল অরক্ষিত আর যত্রতত্র ঘরবাড়িতে ভরপুর। আমরা সীমানা প্রাচীর নির্মাণ আর পরিকল্পনার মাধ্যমে সে ব্ল্যাকহোল দূর করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন শিক্ষাজট নেই বললেই চলে। এছাড়াও একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আমরা ক্যাম্পাস আঙিনায় হাই-টেক পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। আগামীতে শিক্ষা আর অবকাঠামোতে এটি হবে আরো অনন্য’ ৫৩তম জন্মদিনে এসে এমন অভিজ্ঞতা আর পরিকল্পনার কথা জানালেন বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন।

১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর প্রতিষ্ঠা লাভের পর উপাচার্য ড. আজিজুর রহমান মল্লিকের হাত ধরে শুরু হয়ে হাটিহাটি পা পা করে ৫২ বছরে এক নব যৌবনে এসে পা দিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। এর ভেতরে এতে অভিভাবকত্ব করেছেন ১৭ জন খ্যাতিমান ব্যাক্তি।

২০১৮সালে প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনলিপি অনুযায়ী বর্তমানে ২৭ হাজার ৮৩৯ জন শিক্ষার্থী নিয়োজিত এ জ্ঞান আঙিনায়। ৪টি বিভাগ নিয়ে শুরু করা চবিতে বর্তমান বিভাগ দাঁড়িয়েছে ৪৬টি। আটটি অনুষদ আর সাতটি ইনস্টিটিউটে চলছে বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধার জন্য রয়েছে ১০টি হল। নির্মাণাধীন রয়েছে আরো চারটি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও ছিলো জ্ঞানদায়িনী মাতৃকার অংশগ্রহণ। স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন একজন শিক্ষক, ১১জন শিক্ষার্থীসহ ১৫জন ব্যক্তিবর্গ।

ঝুলন্ত ব্রিজ
ঝুলন্ত ব্রিজ (তুলির আঁকা, দীপ্র বণিক)

 

প্রিয় ক্যাম্পাসের জন্মদিনে নৃবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মাসুম আহমদ ইকবাল বলেন, মনের কোনে জমা হওয়া স্বপ্ন নিয়ে একদিন এসেছিলাম পাহাড়ঘেরা সবুজাভ শাটলের ক্যাম্পাসে। অনেক কিছু দিয়েছে এই প্রাণের ক্যাম্পাস। প্রিয় ক্যাম্পাসের জন্মদিনে অনেক শুভেচ্ছা। যখন মনে হয় ক্যাম্পাস জীবনের ইতি টানার কথা, তখন মনটা নিমিষেই খারাপ হয়ে যায়।

হিউম্যান রিসোর্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী আরশি ইরতিজা বলেন, ‘শহরেই থাকি। তাই অনেক কষ্টের যাত্রা করে প্রতিদিন ক্যাম্পাসে আসি। তাও ভালো লাগা কাজ করে ক্যাম্পাসের প্রতি, হয়তো ক্যাম্পাসে যে তারুণ্য উচ্ছ্বলতা পাই তার জন্য। ক্লাস শেষে সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যায় শাটলের গান শুনে। প্রাণের চবি, হাজারো বছর ধরে তুমি জ্ঞানরূপিনী হয়ে আগলে রেখো তোমার জ্ঞানপিপাসুদের।’

‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গৌরবের সাথে ৫২ বছর পার করছে এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক। দীর্ঘ পথচলায় বিশ্ববিদ্যালয় অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছে। শিক্ষা-গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকুক প্রিয় ক্যাম্পাসের। শুভ জন্মদিন প্রিয় শাটলের ক্যাম্পাস।’ এভাবেই বাংলা বিভাগের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী নবাব আব্দুর রহিমের কণ্ঠে সুর মিলিয়ে বলছি
শুভ জন্মদিন প্রাণের ক্যাম্পাস, শুভ জন্মদিন।