চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনে নির্বাচন লড়াই হবে ত্রিমুখী

0
23

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ॥ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সংসদীয় আসন ৩টি। এর মধ্যে জেলার গুরুত্বপূর্ণ এলাকা জেলা সদরসহ ১৪টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই আসন। আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সদর আসনে লড়াই হবে ত্রি-মুখী।

টানা ২ মেয়াদে আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে ১০ বছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নানা উন্নয়ন করে এবং উন্নয়নের ধারা অব্যহত রাখতে এই আসনটি ধরে রাখতে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন ২ বারের সফল এমপি মাটি-মানুষের জনপ্রিয় নেতা জেলা আওয়ামীলীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল ওদুদ। ইতিপূর্বে এই আসনটি জামায়াতের দখলে থাকলেও বিএনপির দখলে চলে যাওয়া আসনটি উদ্ধার করতে চায় জামায়াত।

এদিকে, বিএনপির মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী ৩ বারের এমপি বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব হারুনুর রশীদও তার হারিয়ে যাওয়া আসন উদ্ধারে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন। সব মিলিয়ে ত্রি-মুখী লড়াইয়ে কে জয়ের মালা পরবে সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে এই সদর আসনের মানুষদের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

সাধারণ ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামীলীগের নৌকার মাঝি আব্দুল ওদুদ টানা ১০ বছরে উপজেলার উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের আশা পুরণ করতে দিনরাত পরিশ্রম করে রেললাইন সংস্কার, নতুন রেলস্টেশন নির্মাণ, আধুনিক হাসপাতাল ভবন নির্মাণ, আদালত ভবন নির্মাণ, উপজেলার রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন, চরাঞ্চলের মানুষের দূর্ভোগ থেকে মুক্ত করতে ‘শেখ হাসিনা সেতু’ নির্মাণ, চরাঞ্চলের ৬টি ইউনিয়নের পাকা রাস্তা নির্মাণ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নসহ নানা উন্নয়ন করেছেন। তাই আগামীতে আবারও আব্দুল ওদুদকে নৌকায় ভোট দিয়ে তাদের পাশে সেবার জন্য রাখতে চান চরাঞ্চলসহ এই আসনের ভোটাররা।

আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীদের মাঝে নানা ক্ষোভ, আশা-প্রত্যাশা থাকলেও নির্বাচনের মাঠে প্রচারণা ও নৌকার বিজয় ছিনিয়ে আনতে দিনরাত ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, যুব মহিলালীগ, ছাত্রলীগসহ অন্যান্য অংগ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তবে নৌকার বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে আগামীতে দলের সকল ত্যাগী নেতা-কর্মীদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন এবং একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই আসনসহ জেলার উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখবেন তাদের নৌকার মাঝি আব্দুল ওদুদ এমনটায় আশাবাদ সাধারণ কর্মীদের।

ভোটের প্রচারণায় ব্যস্ত আওয়ামীলীগের মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আব্দুল ওদুদ বলছেন, এলাকার মানুষের জন্য দিনরাত কাজ করে এবং সাধারণ মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থেকে সদর উপজেলার সকল স্তরে উন্নয়ন করেছি এবং চেষ্টা করে যাচ্ছি। ১০ বছরে ক্ষমতায় থাকাকালে উপজেলায় যে সকল উন্নয়ন করেছি, সেগুলো প্রায়ই দৃশ্যমান।

এই নির্বাচনেও সাধারণ মানুষের দোয়া ও ভোট নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবো ইনশাল্লাহ। আবারও নির্বাচিত হয়ে এই এলাকার অবশিষ্ট উন্নয়ন কাজগুলো শেষ করে সাধারণ মানুষের সেবা করবো এবং আওয়ামীলীগের ত্যাগী ও অভিজ্ঞ নেতা-কর্মীদের সাথে নিয়ে সদর উপজেলাসহ জেলার উন্নয়নে কাজ করে যাবো এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন এমপি আব্দুল ওদুদ।

এদিকে, ১০ বছর ধরে নেতা-কর্মীদের সাথে তেমনভাবে যোগাযোগ না করলেও ২০ দলীয় জোটের ধানের শীষের প্রার্থী ৩ বারের সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ জোরেসোরে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন আসন উদ্ধার করে নিজ ঘরে নিয়ে আসতে। প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন বিএনপির তুখোড় নেত্রী জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. সৈয়দা আশিফা আশরাফী পাপিয়া। বিএনপি প্রার্থী সাধারণ ভোটার বা বিএনপি নেতা-কর্মীদের সুখে-দুঃখে পাশে না থাকতে পারলেও অফুরন্ত আশাবাদ তাঁর।

তিনি বলছেন, আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে নেতা-কর্মীদের নামে মামলা, হামলা, নির্যাতন করার কারণে দলের নেতা-কর্মীদের সাথে তেমনভাবে সময় দেয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু গত ১০ বছরে আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে এই আসনের সাধারণ মানুষ, বিএনপি ও অন্যান্য দলের নেতা-কর্মীরা যেভাবে নির্যাতনের ও হামলা-মামলার শিকার হয়েছে, তাতে সাধারণ ভোটার ও অন্যান্য দলের নেতা-কর্মীরাও বিএনপির ধানের শীষে ভোট দিবে এবং বিপুল ভোটের ব্যবধানে ৩০ ডিসেম্বর ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত হবে ইনশাল্লাহ।

এই আসনে বিএনপি প্রার্থী হারুনুর রশীদ ক্ষমতায় থাকাকালে উপজেলার চাঁপাইনবাবগঞ্জ পলিটেকনিক, নতুন স্টেডিয়াম, টিটিসি, রাস্তা-ঘাটসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ করেছিলেন। যদিও বিএনপি প্রার্থী সাবেক এমপি হারুনুর রশীদের বিরুদ্ধে গত ১০ বছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে রাজনৈতিকভাবে তেমন কোন শক্ত মামলা হয়নি বললেই চলে। এমনটি পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে হয়রানির শিকারও হননি তিনি বলেও একটি সুত্রে জানা গেছে।

এছাড়া দলের নেতা-কর্মীরা হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার হলেও ওইসব নেতা-কর্মীদের পাশে আর্থিক বা দলীয় শক্তি নিয়ে দাঁড়াননি দলের এই নেতা। পাশাপাশি বিএনপির তুখোড় নেত্রী এ্যাড. সৈয়দা আশিফা আশরাফি পাপিয়া বলছেন, এই আসনের সাধারণ ভোটার ও বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীরা যেভাবে অত্যাচারিত হয়েছে, তাতে আওয়ামীলীগকে বা আওয়ামীলীগের প্রার্থীকে ভোট দিবে না মানুষ।

আর স্বতন্ত্র প্রার্থী নুরুল ইসলাম বুলবুল ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী নয়। এজন্য জোটের শরিক দলের নেতা-কর্মীরাও ধানের শীষে ভোট দেবেন। সব মিলিয়ে আগামী ৩০ ডিসেম্বর ধানের শীষের বিজয় হবে বিপুল ভোট বিল্পবের মাধ্যমে। এখন দেখার বিষয় এই আসনের সাধারণ ভোটাররা ‘চান উন্নয়ন, নাকি পরিবর্তন’? আর এটির ফলাফল দেখার অপেক্ষা করতে হবে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত।

এছাড়া জামায়াতের ঘাটি হিসেবে পরিচিত এই আসনটি পূর্বে দখলে ছিল জামায়াতের। পরবর্তীতে বিএনপির ঘরে চলে যায়। বর্তমানে জামায়াতের উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌরসভা মেয়র তাদের দলের নির্বাচিত হওয়ায় সংসদীয় আসনটিও দখলে নিতে চাই জামায়াত প্রার্থী নতুন মুখ নূরুল ইসলাম বুলবুল ও সমর্থকরা।

নির্বাচনে বিজয়ী হলে এলাকার মানুষদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিনিধিদের নিয়ে এই আসনের উন্নয়ন করা, দূর্ণীতি, ঘুষ, নিয়োগ বানিজ্য বন্ধ করা, বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, সর্বপরি সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনে কাজ করা, প্রত্যন্ত ও অবহেলিত এলাকার নারীদের স্বাবলম্বী করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী।

এলাকার মানুষ আওয়ামীলীগ প্রার্থী আব্দুল ওদুদ ও ধানের শীষের প্রার্থী হারুনুর রশীদ টানা ১০ বছর করে ক্ষমতায় থাকাকালে তাদের কার্যক্রম দেখেছে। নতুন মুখ হিসেবে এবার বিপুল ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন আপেল প্রতীককে এমনটায় আশাবাদ ব্যক্ত করেন আপেল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী নুরুল ইসলাম বুলবুল।

নির্বাচনে প্রচারণা চালাচ্ছেন টেলিভিশন প্রতিক নিয়ে বিএনএফ’র কামরুজ্জামান খান, হাত পাখা প্রতিক নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর আব্দুল কাদের ও গোলাপ ফুল প্রতিক নিয়ে জাকের পার্টি’র বাবলু হোসেন। তারাও বিজয়ী হয়ে সাধারণ মানুষের সেবা করার আশ্বাস দিচ্ছেন।

মূলতঃ সদর আসনটি দখলে ছিলো জামায়াত ও বিএনপির। ২০০৮ সালে এই আসনটি দখলে নেয় আওয়ামীলীগ। ২০১৪ সালে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবারও আওয়ামীলীগের এমপি নির্বাচিত হন মো. আব্দুল ওদুদ। এই আসনে ভোটের লাড়াই হবে আওয়ামীলীগ ও বিএনপি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর মাঝে। ত্রিমুখি লড়াইয়ে মাঠে প্রচারণায় জোরেসরে কাজ করছেন প্রার্থী ও সমর্থকরা।

সৎ, যোগ্য ও সাধারণ মানুষের পাশে থাকবে, সন্ত্রাস, মাদক নির্মুলে কাজ করবে, এলাকার উন্নয়নে কাজ করবে এমন প্রার্থীকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন এমনটায় ভাবছেন ভোটাররা। জয়ের ব্যাপারে আওয়ামীলীগ-বিএনপি ও জামায়াতের স্বতন্ত্র প্রার্থী সকলেই আশাবাদী হলেও এই ফলাফল দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় নির্বাচনের ভোটের দিন ফল ঘোষণা পর্যন্ত

উল্লেখ্য, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার প্রায় ৪’শ ৫১ বর্গকিলোমিটার (১’শ ৭৪ বর্গমাইল) এলাকায় ১৪টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত ৪৫ চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় মোট ভোটার ১১ লক্ষ ৬৬ হাজার ৫’শ ৬৫ জন।

এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনে ভোটার ৩ লক্ষ ৮২ হাজার ৫’শ ৪৮জন। পুরুষ ভোটার ১ লক্ষ ৯১ হাজার ৪০ জন এবং মহিলা ভোটার ১ লক্ষ ৯১ হাজার ৫’শ ৮জন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনে মোট ৬ জন প্রার্থী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।