সুইস ব্যাংক যে কারণে পছন্দের শীর্ষে?

0
143

গোপনীয়তার জলে ভরা সুইস ব্যাংকিং। এক্ষেত্রে সুইস ব্যাংকের নাম বেশি শোনা যায়। সারা দুনিয়ার বিত্তশালী এবং বিখ্যাত মানুষদের অঢেল অর্থ রাখার প্রথম পছন্দ সুইস ব্যাংক কিন্তু কেন! সুইস ব্যাংক এবং ব্যাংকিং খাত নিয়ে অধীর কৌতুহলের কারণ সম্পর্কে জেনে নিন- প্রথমেই বলে রাখা ভালো সুইস ব্যাংক বলে আসলে একক কোনো ব্যাংকই নেই। তাহলে খবরের শিরোনাম এর জনপ্রিয় বিষয় সুইস ব্যাংক আসলে কী? সুইজারল্যান্ড সরকারের আর্থিক সব কাজের নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত এমন সব প্রতিষ্ঠানের তদারকি করে সুইচস ফিনান্সিয়াল মার্কেট সুপারভাইজারি অথরিটি সংক্ষেপে এফআইএমএনএ ও সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাদের অধীনে যত ব্যাংক আছে তাদের সবগুলোকে একসঙ্গে সুইস ব্যাংক বলে৷ বর্তমানে সুইজারল্যান্ড তিনশো এর অধিক ব্যাংক রয়েছে।

কীভাবে গড়ে উঠলো সুইস ব্যাংকিং ব্যবস্থা-

সুইস ব্যাংকিং ইতিহাস অনেক পুরোনো৷ তের শতকের শুরুর দিকে ইউরোপের বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্থ ব্যাবসায়ীরা সুইজারল্যান্ডে এসে পৌঁছায়। অর্থ ব্যাবসায়ীদের বেশিরভাগ ছিলো ইহুদী। বিশপ এডহেমার ফাবরি ১৩৮৭ সালে জেনেভার ব্যাংকারদেরকে সুদ ব্যবসা করার অনুমতি দেন। ইতালি, ফ্রান্স এবং জার্মানির মতো পরাশক্তির দেশগুলো থেকে অপেক্ষাকৃত ছোট দেশ সুইজারল্যান্ডের মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যের রুট হয়ে দাঁড়ায়। বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল জেনেভা। ষোল শতকের দিকে জন কেলভিনের প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ ভিত্তিক ধর্ম সংস্কার ব্যাংকিং ব্যবসার গতিকে বৃদ্ধি করে এবং সুদ ব্যবসাকে পুরোপুরি বৈধতা দেয় একই সময়ে সুইজারল্যান্ড এর আশেপাশের অঞ্চলগুলোর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছিল এবং সেসব অঞ্চল থেকে অনেকেই তাদের সকল অর্থ সম্পদ নিয়ে সুইস অভিবাসী হতে শুরু করে। সতেরো শতকের শুরু থেকেই জেনেভাকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো আর্থিক লেনদেনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে।

১৭১৩ সালে গ্রেড কাউন্সিল অফ জেনেভা ব্যাংকিং এর গোপনীয়তার নীতিমালা প্রকাশ করা হয়। এই নীতিমালায় একজন গ্রাহককে চরম গোপনীয়তার নিশ্চয়তা দেয়। ব্যাংকার তার গ্রাহক ব্যতীত আর কারো সঙ্গে কোনো তথ্য বিনিময় করতে বাধ্য নয়। ১৭১৩ সালের এই নীতিমালায় কর ফাঁকিবাজদেরকে সুস্পষ্টভাবে ছাড় দেয়া হয়েছিলো বলে অনেকে মনে করেন৷ ১৭৪১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সুইজারল্যান্ডের প্রথম ব্যাংক ওয়েগেলিন এন্ড কোং প্রতিষ্ঠা হয়। ১৮৫৪ সালে ছয়টি ব্যাংক মিলে সুইস ব্যাংক কর্পোরেশন গঠন করে। উনিশ শতকে ইউরোপের কমবেশি প্রত্যেকটি দেশেই যখন যুদ্ধের দামামা বাঁধছে তখন বিত্তশালীরা তাদের অর্থ রাখতে সুইজারল্যান্ডকেই বেছে নেয়৷ ১৯৩৪ সালে ফ্রান্স সরকার ক্ষিপ্ত হয়ে প্যারিসের সুইস ব্যাংক শাখায় হানা দেয় এবং সব নথি জব্দ করে। বেশ কিছু কর ফাঁকিবাজকে তারা শনাক্ত করতে সমর্থ হয়৷

ভবিষ্যতে এরকম দূর্ঘটনা এড়াতে সুইসরা ১৭১৩ সালের আইনকে আরো কঠোর করে দেয়৷ আর সেসময় তৈরি হয় সুইস ফেডারেল ব্যাংকিং ল’ নামের নতুন আইন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে এবং যুদ্ধ চলাকালে কোনো দেশের ব্যাংকই জার্মান মুদ্রা গ্রহণ করতে রাজি হচ্ছিল না। জার্মানদের ভরসা হয়ে দাঁড়ায় সুইস ব্যাংকগুলো। একইসঙ্গে তারা নাৎসীদের লুট করা স্বর্ণ জমা রাখছিলো আবার ইহুদিদের সম্পদও গচ্ছিত রাখছিলো। ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সুইস ব্যাংক কর্পোরেশনের উত্তরাধিকারী ইউবিএস এবং ক্রেডিট সুইস ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার ইহুদি পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়। সাম্প্রতিক, সময়ে কিছু জার্মান রাজনৈতিক নেতা সন্দেহ করেছিলেন সুইস ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য জার্মানীর প্রাদেশিক অর্থবিভাগে গুপ্তচর নিয়োগ করেছে। তবে এর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সুইস ব্যাংক কেন পছন্দের শীর্ষে-

ব্যাংকিং এর ক্ষেত্রে একজন গ্রাহক সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি আশা করে তা হলো গোপনীয়তা। যদি অবৈধ টাকা বা কালোটাকা হয় তবে গোপনীয়তাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়৷ আর সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকিং এর সুনাম ঠিক এখানেই। ডাক্তারের সঙ্গে রোগীর বা উকিলের সঙ্গে মক্কেলের যে বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক ঠিক তেমনি সুইস ব্যাংক এর সঙ্গে তাদের গ্রাহকদের সম্পর্ক চরম বিশ্বাসের। সুইস ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের ব্যক্তিগত কোনো তথ্য কাউকেই দিতে বাধ্য নয়। অনেকের ধারণা, সঞ্চিত অর্থের উপর সুইস ব্যাংক প্রচুর মুনাফা দিয়ে থাকে সুইজারল্যান্ড এর স্বনামধন্য ব্যাংক ইউবিএস খুব বেশি হলে ১ দশমিক ৫০ শতাংশ মুনাফা দিয়ে থাকে তাও আবার ক্ষেত্রবিশেষে। গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্যের প্রকাশ ঘটলে সুইস আইন অনুযায়ী ব্যাংকের আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড ভোগ এবং ৪০০ সুইস ফ্রাঁ জরিমানা হতে পারে। এছাড়াও ক্ষতি বিবেচনা করে গ্রাহক ক্ষতিপূরণও পেতে পারেন।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে গ্রাহকের গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য সুইজারল্যান্ড আইন সবচেয়ে কঠোর। সাধারণত ব্যাংকে অর্থ জমা রাখতে গেলে অর্থের উৎস জমা দেয়া ছাড়াও কর জমা দেয়ার ছাড়পত্র, ব্যক্তিগত খুঁটিনাটি এবং বিদেশি হলে পূর্বের একাউন্ট বা লেনদেনের ইতিহাস জানতে চাওয়া হয় কিন্তু সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে অর্থ জমা রাখতে হলে গ্রাহকের অর্থের উৎস নিয়ে কোনো প্রশ্নই করা হয় না। ন্যূনতম ১৮ বছর এবং একটি বৈধ পাসপোর্ট, শুধুমাত্র এই দু’টি জিনিস থাকলেই সুইজারল্যান্ডের একটি ব্যাংকে অর্থ জমা রাখা যায়। এরকম কোনো বাধ্যবাধকতা নেই যে গ্রাহককে খুব উচ্চবিত্ত বা আভিজাত্যপূর্ণ হতে হবে। মাত্র ৫ হাজার সুইস ফ্রাঁ থাকলেই যে কেউ একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে। সুইস ব্যাংকিং ব্যবসায় আফ্রিকার স্বৈরশাসক বা ল্যাটিন মাদক সম্রাট সকলকেই চিহ্নিত করা হয় একটি অদ্বিতীয় নাম্বার দিয়ে।

নাম্বারটির বিপরীতে প্রকৃত ব্যক্তিটিকে সেটি ব্যাংকের হাতে গোনা কয়েকজন কর্মকর্তাই জেনে থাকেন। বছরের পর বছর ধরে সুইজারল্যান্ডের অর্থনৈতিক কাঠামো খুবই স্থিতিশীল। কোনো দেশের অর্থনীতি সে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর অনেকাংশেই নির্ভর করে। সুইজারল্যান্ড সর্বশেষ সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছিল ১৫০৫ সালে। ইউরোপের অন্য দেশগুলো যখন নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোযোগ দিয়েছে সেখানে সুইজারল্যান্ড নিজেদের অর্থনৈতিক কাঠামোকে করেছে অনেক শক্তিশালী। উনিশ শতকের প্রথম দিকে এই পৃথিবী দু’টি বিশ্বযুদ্ধের মুখোমুখি হয় যার কেন্দ্র ছিলো ইউরোপ। সেখানেও নিরপেক্ষ ছিলো এই দেশটি। বর্তমানেও সুইজারল্যান্ডকে অত্যন্ত নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এই দেশের অর্থনীতি টালমাটাল হওয়ার কোনই সম্ভাবনা নেই। উল্লেখ্য সুইস ব্যাংকগুলোর ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্ধেকই আসলে বিদেশিদের।

সুইস ব্যাংক এবং অর্থ পাচার-

সুইস ব্যাংকের দুনিয়াজুড়ে খ্যাতির তুলনায় কুখ্যাতি হয়ত বেশি। আইনের সুযোগ নিয়ে সুইস ব্যাংকগুলো হয়ে উঠেছে কর ফাঁকির স্বর্গ। যদিও বর্তমানে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সুইস ব্যাংকগুলো কিছুটা শিথিল হয়েছে। বর্তমানে সুইস ব্যাংক সুস্পষ্ট প্রমাণের সাপেক্ষে কোনো তথ্য দিয়ে থাকে এছাড়াও জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ শক্তির নিষেধাজ্ঞায় কোনো স্বৈরশাসকের অ্যাকাউন্টও জব্দ করা হয়। ২০০৫ সাল থেকে অব্যাহত চাপের মুখে ২০১৩ সালে এসে সুইস সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের জন্য একটি আইন করে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফরাসি পত্রিকা লা পারিয়েজে জানায় কর ফাঁকির তদন্ত হিসেবে ৪৫ হাজার ১৬১ জন গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়েছে ফরাসি কর কর্তৃপক্ষ। এটা নিয়ে অবশ্য বেশ দর কষাকষি করতে হয়েছিল ফরাসিদের। গত বছর অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো- অপারেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট বা সংক্ষেপে ওইসিডি সম্মেলনে সুইজারল্যান্ড একটি চুক্তি স্বাক্ষর করার পরে ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল। চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে ষাটটি রাষ্ট্র সুইস ব্যাংক থেকে তাদের নাগরিকদের তথ্য জানতে পারবে।

পাকিস্তানের কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের খবর অনুযায়ী, পাকিস্তান এবং আরো ২১টি রাষ্ট্র একই ধরনের চুক্তি করতে যাচ্ছে। চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে ৬০টি রাষ্ট্র সুইস ব্যাংক তাদের নাগরিকদের তথ্য জানতে পারবে। ২০১১ সালে সুইস ব্যাংক লিবিয়ার তৎকালীন শাসক গাদ্দাফি এবং তার ১৯ জন সহযোগীর সম্পদ রাতারাতি জব্দ করে এর আগে সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মিশরের ক্ষমতাচ্যূত প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের সম্পত্তিও জব্দ করেছিল। ধারণা করা হয় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও তার বিশাল সম্পত্তি সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত রেখেছেন। তিউনিশিয়ার ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক বেন আলীও বিশাল অঙ্কের অর্থ জমা রেখেছিলেন যা এখন ফেরত আনার প্রক্রিয়া চলছে। সুইস ব্যাংক নিয়ে একটি প্রচলিত মিথ হলো এখানে প্রচুর বেনামী অ্যাকাউন্ট আছে বাস্তবে কিন্তু এটি মোটেই সত্য নয়।

মুভি বা উপন্যাসের মতো এখানে বেনামী অ্যাকাউন্ট খোলা কখনোই সম্ভব নয়। আইনের কোনো মারপ্যাঁচ ছাড়াই একজন গ্রাহকের তথ্য সুইস ব্যাংক প্রকাশ করে যখন কোনো গ্রাহক মৃত্যুবরণ করেন। বিগত ৬০ বছর ধরে কোনো গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো প্রকার লেনদেন না করা হয় এবং অর্থের পরিমাণ পাঁচশত সুইস ফ্রার বেশি হয় তবে সেটা প্রকাশ করা হয়। যদি কোনো উত্তরাধিকারী সম্পত্তির দাবি না করে তবে এক বছর পর সুইস সরকার সেই সম্পদ নিজেদের কোষাগারে জমা করে নেয়। ১৯১৫ সালে সালে ইন্টার্নেশনাল কনসর্টিয়াম অফ ইনভেস্টিগেশন জার্নালিস্ট বা সংক্ষেপে আইসিআইজে তাদের ওয়েবসাইটে সুইসলিক শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। ১৩০ জন সাংবাদিকের গবেষণা এটা বেরিয়ে এসেছে যে এইচএসবিসি ব্যাংকের জেনেভা শাখা ১৮০ বিলিয়ন ইউরো কর ফাঁকি দিয়ে অনেক গ্রাহককেই লুকাতে সহায়তা করেছে।

এই রিপোর্ট প্রকাশ না করতে বিবিসির ওপর প্রচুর চাপ ছিল। অনেকেরই ধারণা সুইস আইন তৈরি করা হয়েছে কালো টাকার মালিকদের জন্য। এটি কিন্তু একদম ভুল তবে হ্যাঁ এটা সত্য লুকোচুরির এই আইনের ব্যবহার করে যাচ্ছে আমেরিকার ধনকুবের থেকে শুরু করে তামাম এশিয়ার কর ফাঁকিবাজরা। সুইসরা তাদের ব্যাংকিং ঐতিহ্য ধরে রাখতে যেমন তৎপর তেমনি অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোও চাপ দিয়ে সুইসদেরকে তাদের আইম সংস্কার করাতেও তৎপর। বিগত সেপ্টেম্বর থেকে সুইস ব্যাংক ইউরোপ এবং এর বাইরের কিছু দেশের সাথে পূর্ণ মাত্রায় তথ্য বিনিময় শুরু করেছে। তাহলে কি সুইস ব্যাংকের গোপনীয়তার অধ্যায় শেষ হতে চলেছে? সত্যি কথা বলতে সময়ই সেটা বলে দেবে।