ভার্চুয়াল অপরাধ রুখবে পুলিশ

0
72

প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় মানুষ বাস্তব জগতের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতে বিচরণ করছে বেশি। এ কারণে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা, চিন্তাজগত ও মনোবৃত্তি। সারাবিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে ঘটছে বহুমাত্রিক সাইবার অপরাধ। বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও সাইবার অপরাধীদের নিরন্তর ধাওয়া করছে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ইউনিট, যা অল্প সময়ের মধ্যে বেশ আলোচনায় এসেছে। 

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি বিশেষায়িত ইউনিট এই ‘সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ইউনিট’ বা সাইবার পুলিশ। 

সাইবার সংশ্লিষ্টরা জানান, অবশ্যই সাইবার অপরাধীরা মেধাবী। তাদের সঙ্গে লড়তে হলে অত্যন্ত মেধাবী হতে হবে। একজন উপ-মহাপরিদর্শকের (ডিআইজি) নেতৃত্বে ৩৪৩ জন সদস্য নিয়ে পূর্ণাঙ্গ সাইবার যুদ্ধে নেমেছে এই ইউনিট। বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট হ্যাক থেকে শুরু করে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড চালানো ঘৃণ্য জঙ্গিদের আটকে কাজ করছে এ ইউনিটের সদস্যরা।

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সাইবার ক্রাইমকে একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখে মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। সংস্থাটির প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম এক অনুষ্ঠানে নির্বাচনের সময় একটা চক্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিলেন। 

অপরদিকে র‌্যাব প্রধান বেনজীর আহমেদ সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। সে সময় রাষ্ট্রবিরোধী গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ইউটিউব চ্যানেল ‘এসকে টিভি’র অ্যাডমিনসহ দুজনকে আটকসহ বহু সাইবার অপরাধীকে আটক করে র‌্যাব। 

সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, দেশ তথ্যপ্রযুক্তিতে যতই এগিয়ে যাচ্ছে ততই বাড়ছে নতুন নতুন সাইবার অপরাধ। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে প্রায় ৩ কোটি মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা ও এর আশপাশে সোয়া দুই কোটি ব্যবহারকারী রয়েছে। এ হিসেবে ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় ফেসবুক ব্যবহারকারী শহর। 

দেশে বহুমাত্রিক সাইবার অপরাধ ঠেকাতে পুলিশ সদর দফতর এ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেয় ২০১৭ সালে। ওই বছর ৩০ মার্চ সিআইডির মাধ্যমে একটি ইউনিট গঠনের জন্য ৫৭৫ জন জনবল, ১০০ যানবাহন ও অন্যান্য বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায় পুলিশ সদর দফতর। ২১ নভেম্বর ৫০৫ জন জনবল ও ৮৫টি গাড়িসহ প্রস্তাবটি অনুমোদন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পরে যাচাই-বাছাই শেষে অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় ৩৪৩ জন জনবলসহ প্রস্তাবটি অনুমোদন দেয়। 

সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে সাইবার পুলিশ। বর্তমানে ডিআইজি মো. শাহ আলমের নেতৃত্বে সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে সাইবার অপরাধ রোধে পূর্ণাঙ্গ এ তদন্ত সংস্থা। 

সাইবার ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র তিনটি মামলা নিয়ে ট্রাইব্যুনালের কাজ শুরু হয়। পরের বছর ৩২টি, ২০১৫ সালে ১৫২টি, ২০১৬ সালে ১৯৬টি, ২০১৭ সালে ২৯৬টি ও ২০১৮ সালে মোট ৫৬৬টি মামলা হয়। ট্রাইব্যুনালের এক সরকারি কৌঁসুলি জানান, শেষ চার বছরে সাইবার অপরাধের মামলা বেড়েছে প্রায় দুইশ’ গুণ। তবে মাত্র ৩০ ভাগ ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন। এক জরিপে উঠে এসেছে, নারীদের মধ্যে ৭৭ শতাংশই ফেসবুককেন্দ্রিক সাইবার অপরাধের শিকার। 

সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গিদের মধ্যে অন্তত ৮২ ভাগ তরুণ অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অন্ধকার পথে গেছে। এটা সাইবার অপরাধের ভয়ঙ্কর একটা দিক। এসব কারণেই সাইবার পুলিশের বিকল্প নেই। 

অনলাইন অপরাধের সব ধরনের বিষয়ে কঠোরভাবে নজরদারি (মনিটরিং) করবে নতুন এই সাইবার পুলিশ। এছাড়া, ভার্চুয়াল জগতের অপরাধ ঠেকাতে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নজর দিচ্ছে সাইবার পুলিশ। এই ইউনিটের মাধ্যমেই তদন্ত হবে সাইবার অপরাধে হওয়া সারাদেশের  মামলাগুলো। 

প্রথমে বিভাগীয় পর্যায়ে ও পরে জেলা পর্যায়ে ইউনিটের অফিস হবে। ইউনিটের কর্মকর্তারা অপরাধের ধরন অনুযায়ী এক বা একাধিক দলে ভাগ হয়ে অপরাধ তদন্ত করছেন। ২২ ধরনের অপরাধ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে সাইবার পুলিশ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হ্যাকিং, সাইবার ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম, আইটি অ্যানাবল্ড ক্রাইম, সোশ্যাল মিডিয়া ও সাইবার টেররিজম ইনভেস্টিগেশন, ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম এবং স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম মিলে একটি শাখা। ডিজিটাল ফরেনসিক ও রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে রয়েছে আরো দুটি শাখা। 

এতদিন তথ্যপ্রযুক্তিতে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই দেশের থানা পুলিশ মামলাগুলোর তদন্ত করে আসছিল। সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ইউনিট গঠন করার পর থেকে এরই মধ্যে পর্যায়ক্রমে সারাদেশের প্রতিটি থানা থেকে ১ জন করে পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। পুরান ঢাকার মিলব্যারাকের সাইবার ট্রেনিং সেন্টারে এখন সারাদেশ থেকে এসআই পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের পর্যাক্রমে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে বলে জনান ইউনিট প্রধান ডিআইজি মো. শাহ আলম। 

বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, সাইবার অপরাধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ইলেক্ট্রনিক মানি লন্ডারিং, টেলিযোগাযোগের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র, সাইবার সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, সাইবার পর্নোগ্রাফি, হ্যাকিং, স্প্যাম, ব্লু হোয়েলের মতো জীবন ধ্বংসকারী গেম, সাইবার বুলিং, ইমেইল স্পাম ও ফিশিং, তথ্যচুরি, ই-কমার্স প্রতারণা, বিভিন্ন পর্নো সাইটে নারী ও শিশুদের অপব্যবহার। অন্যের ছবিতে ছবি জুড়ে দিয়ে (সুপার ইম্পোজ) পর্নোগ্রাফি ছড়িয়ে দেয়ার মতো ভয়াবহ অভিযোগও বাড়ছে। 

সরকারের সাইবার হেল্প ডেস্কের তথ্যানুযায়ী, শতকরা ৭০ ভাগ অভিযোগকারীই নারী। সাইবার হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতে পুলিশের পাশাপাশি আইসিটি বিভাগে একটি সাইবার হেল্প ডেস্ক রয়েছে। গত দুই বছরে ১৫ হাজারেরও বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে এই ডেস্কে। 

২০১২ সালে ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে কক্সবাজারে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, ফেসবুকে ইসলাম অবমাননার গুজব রটিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা সাইবার অপরাধের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইটি সোসাইটি থেকে মেয়েদের পাঁচটি হলের প্রায় ২ হাজার ১০০ ছাত্রীর মধ্যে চালানো এক জরিপে উঠে এসেছে- ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারীদের মধ্যে ৭৭ ভাগই ফেসবুককেন্দ্রিক সাইবার অপরাধের শিকার। 

এ বিষয়ে সাইবার পুলিশের প্রধান ডিআইজি মো. শাহ আলম বলেন, অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে প্রথম সিআইডি নিয়মিত জনবল ছাড়াই এডহক ভিত্তিতে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে সাইবার ফরেনসিক তদন্তসহ ছোট পরিসরে কাজ শুরু করে। দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মকর্তারা সে সময় উইং হিসেবে কাজ শুরু করেন। সম্প্রতি আমরা অনুমোদিত ৩৪৩ জন জনবল নিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ শুরু করেছি। মূলত সাইবার অপরাধসহ বিশেষ তদন্ত, বিশেষজ্ঞ মতামত ও পুলিশকে বিশেষ সহায়তা করি আমরা। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি ডলার ফেরত আনা হয়েছে। ফিলিপিন্সের রিজাল ব্যাংকসহ অন্য অপরাধীদেরকেও আইনের আওতায় এনেছি। সম্প্রতি আত্মসমর্পণ করা ১০২ জন মাদক ব্যবসায়ীর অর্থ উপার্জন ও পাচারের বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।