১২ টাকার ইনজেকশন ১২শ টাকা

0
91

নিজস্ব প্রতিবেদক: ইফিড্রিন হাইড্রোক্লোরাইড ইনজেকশন। অস্ত্রোপচারের সময় স্পাইনাল অ্যানেস্থেসিয়ায় ইনজেকশনটি ব্যবহার করা হয়। এটি রোগীর শ্বাসকষ্ট প্রশমনে সাহায্য করে। রক্তের চাপ কমে গেলে কিংবা হৃদস্পন্দনের চাপ বাড়াতে তাৎক্ষণিকভাবে ইনজেকশনটির বিকল্প নেই। বছরখানেক ধরে জীবন রক্ষাকারী এ ইনজেকশনটি বাজার থেকে ‘উধাও’।

তবে উৎপাদনকারীরা বলছেন, ইনজেকশন তৈরির কাঁচামাল আমদানির অনুমতি প্রদানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের দীর্ঘসূত্রতার কারণে ওষুধটির উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বাজারে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। 

জি-ইফিড্রিন নামের ইনজেকশনের প্রস্তুতকারক কোম্পানির প্যাকেটের (পাঁচটির) গায়ে লেখা দাম ৬০ টাকা। সেই হিসাবে প্রতিটির দাম পড়ে ১২ টাকা। 

সরবরাহ সংকটে ১২ টাকার ইফিড্রিন হাইড্রোক্লোরাইড ইনজেকশন বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকাও দাবি করছেন বিক্রেতারা। আর অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ইনজেকশন কিনতে বাধ্য হচ্ছেন রোগী ও তার স্বজনরা। আবার সময়মতো ইনজেকশনটি পাওয়া না যাওয়ায় অনেক রোগী মারাও গেছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

নোয়াখালী থেকে ঢাকায় আসেন স্ট্রোকের রোগী আবু তাহের। তার ছেলে সংবাদকর্মী মিজানুর রহমান মিজান জানান, স্ট্রোক করে মাটিতে পড়ে গিয়ে তার বাবার মাথার উপরের অংশে রক্ত জমাট হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিৎসক অপারেশন করতে বলেন। অপারেশনের সব প্রস্তুতি শেষে আবু তাহেরকে অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হয়। এর কয়েক মিনিট পরই ইফিড্রিন হাইড্রোক্লোরাইড ইনজেকশনটি আনতে বলা হয়। কিন্তু ইনজেকশনটি কোথাও না পেয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে জানান মিজান। ওই চিকিৎসক তাকে ঢামেকের নতুন ভবন সংলগ্ন শারমিন মেডিসিন কর্নারে যাওয়ার পরামর্শ দেন। চিকিৎসকের কথামতো ওই দোকানে গিয়ে ইনজেকশনটি চাইলে দোকানদার মিজানকে জানান, ১৫-২০ মিনিট সময় লাগবে। দাম পড়বে প্রতিটির ১২০০ টাকা। 

এর প্রায় ১৫ মিনিট পর ওষুধের দোকানে ওই ইনজেকশনটি নিয়ে আসেন সেই চিকিৎসক; যিনি মিজানকে শারমিন মেডিসিন কর্নারে পাঠিয়েছিলেন। পরে দুইটি ইনজেকশন কিনে অপারেশন থিয়েটারে জমা দেন মিজান।  

এদিকে, দোকানদারের কাছ থেকে ওষুধ কেনার রশিদ চাইলে মিজানের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন তিনি। একপর্যায়ে নিজেকে সংবাদকর্মীর পরিচয় দেন মিজান। এরই মধ্যে দোকান মালিকও চলে আসেন। মিজানের সঙ্গে একান্তে বসেন দোকান মালিক। পরে সমঝোতা করে ২৪০০ টাকা ফেরত, সঙ্গে দুইটি ইনজেকশনের জন্য ২৪ টাকার রশিদ দেয়া হয় মিজানকে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দোকানের দায়িত্বরত একজন বলেন, এসব ইনজেকশন হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারেই রাখা আছে। রোগীর স্বজনকে তারাই আমাদের কাছে পাঠায়, পরে আমরা তাদের কাছ থেকে ইনজেকশন এনে বেশি টাকায় বিক্রি করি। এর একটি অংশ আমরা পাই, তবে বেশিরভাগ টাকা তারাই নেয়। 

পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকার মেসার্স এমএস মেডিকেল হলের এক বিক্রেতা জানান, প্রতিটি ইফিড্রিন হাইড্রোক্লোরাইড ইনজেকশনের পাইকারি দাম ১০ টাকা। আর খুচরা ১২ টাকা। অথচ বাজারে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে ইনজেকশনটি। 

ঢামেক হাসপাতালের এসএলপিপি ডা. মশিউর রহমান বলেন, সিজারিয়ান ও কোমরের নিচের অংশে অস্ত্রোপচারের সময় ইফিড্রিন ইনজেকশন ব্যবহার হয়। বর্তমানে আমাদের হাসপাতালে এর সরবরাহ নেই। অথচ ইনজেকশনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি না থাকায় রোগীদের অনেক সমস্যা হয়। তবে কোনো কোনো রোগীর স্বজনরা নিজ উদ্যোগে এটি সংগ্রহ করেন। শুনেছি তারা এটি ১০০০ থেকে ১১০০ টাকা দিয়ে কেনেন। ওষুধটি একেবারে সহজলভ্য করা দরকার। 

ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর জানায়, ইফিড্রিন হাইড্রোক্লোরাইড ইনজেকশটি মূলত দেশের আটটি ওষুধ কোম্পানি উৎপাদন করে। এগুলো হলো- এসিআই ফার্মার ভ্যাসোড্রিন, কেমিস্ট ল্যাবরেটরিজের সি-ফিড্রিন, গণস্বাস্থ্যের জি-ইফিড্রিন, ইনসেপ্টার সরড্রিন, জেসন ফার্মার ফিড্রিন, পপুলার ফার্মার ইফিড্রিন, রেনাটার ইফিড্রন ও টেকনো ড্রাগসের ইক্লোইড।

এ প্রসঙ্গে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, ইফিড্রিন হাইডোক্লোরাইডের কাঁচামাল আমদানি করতে হলে মাদকদ্রব্য অধিদফতরের অনুমোদন নিতে হয়। তাই এ সংকট তৈরি হয়েছে। এটি কেটে যাবে। ইফিড্রিনের কাঁচামাল আমদানির অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। কয়েকদিন আগে এসিআই, গণস্বাস্থ্য ও ডেল্টা নামের তিনটি কোম্পানিকে ইফিড্রিন হাইডোক্লোরাইড আমদানির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তবে কোনো কোম্পানি একসঙ্গে ১০ কেজির বেশি আমদানি করতে পারবে না। 

গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের পরিচালক (অর্থ) মীর আবদুল নকীব জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তালিকাভুক্ত ইফিড্রিন হাইড্রোক্লোরাইড ইনজেকশন একটি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ। প্রতি ৫ মিলিলিটার ইনজেকশনের জন্য ২৫ মিলিগ্রাম ইফিড্রিন হাইড্রোক্লোরাইড ব্যবহার হয়ে থাকে। কোম্পানির চাহিদা অনুযায়ী গত ৭ আগস্ট ২০ কেজি কাঁচামাল আমদানির জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে আবেদন করা হয়। কিন্তু সিউড্রোইফিড্রিন ও ইফিড্রিন হাইড্রোক্লোরাইড ইয়াবা ট্যাবলেট তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এ অজুহাতে আমদানিতে অনুমোদন দিচ্ছে না তারা। বিষয়টি ঔষধ প্রশাসনকে জানানো হলে তারা কাঁচামাল আমদানির জন্য সুপারিশ করে। এখনো অনুমোদন না পাওয়ায় তারা ইনজেকশনটি উৎপাদন করতে পারছেন না। 

সূত্র জানায়, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ১৮-২০ গুণ বেশি দামে ইফিড্রিন হাইড্রোক্লোরাইড ইনজেকশন বিক্রি হলেও প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে। যদিও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করা হলে ২০০৯ সালের ভোক্তা অধিকার আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। আইনের ৪০ ধারায় বলা আছে, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক দামে পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাব করে তাহলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
 
ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, নির্ধারিত মূল্যের বাইরে তাদের বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। এটি খুচরা দোকানিরা করে থাকে। তবে খুচরা বিক্রেতারা জানান, বাজারে সংকট তৈরি হলে রোগীরা সেটি হন্যে হয়ে খোঁজেন এবং এক পর্যায়ে অতিরিক্ত দামে কিনতে বাধ্য হন।

সংকটের কারণ জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের সহকারী পরিচালক আশরাফ হোসেন জানান, ইফিড্রিন ইনজেকশনের কাঁচামাল আমদানিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের নিষেধাজ্ঞা ছিল। পরে ওষুধ প্রশাসন থেকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে কাঁচামাল আমদানির সুপারিশ করা হলে তারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। শিগগিরই ওষুধ উৎপাদনকারীরা কাঁচামাল আমদানি করতে পারবে। এতে দ্রুত সংকট কেটে যাবে।

এদিকে, ১২ টাকার ইফিড্রিন ইনজেকশন হাজার টাকায় বিক্রির দায়ে বরিশালে এক ফার্মেসি মালিককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ১৮ মার্চ বরিশাল নগরীর ইসলামিয়া হাসপাতালের সামনে মেডিসিন কর্নারের মালিক মনিরুল ইসলামকে এ দণ্ড দেন বরিশাল জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জয়দেব চক্রবর্তী। 

ইফিড্রিন ইনজেকশনের দামের বিষয়ে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে জেলা প্রশাসকের দফতরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন ঘটনার শিকার রোগীর স্বজন মো. রুবেল হাওলাদার। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়।

রোগীর স্বজন রুবেল হাওলাদার বলেন, চিকিৎসক জরুরি ভিত্তিতে ইফিড্রিন ইনজেকশনটি আনতে বলেন। আমি অনেক দোকান ঘুরে কোথাও না পেয়ে মেডিসিন কর্নার থেকে ১০০০ টাকায় কিনি। এতো দেরি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে চিকিৎসককে সব খুলে বলি। এ সময় চিকিৎসক জানান, এ ইনজেকশনের দাম মাত্র ১২ টাকা। তিনি বিষয়টি জেলা প্রশাসকের দফতরে লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন। 

রুবেল হাওলাদার জানান, মেডিসিন কর্নারে ইনজেশনটি পাওয়ার পর মালিক মনিরুল ইসলাম এক হাজার টাকা দাম চান। এতো দামের কারণ জানতে চাইলে তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, নিলে নেন, নইলে চলে যান।

বরিশাল জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জয়দেব চক্রবর্তী বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ওইদিন রুবেল হাওলাদার নামে এক ব্যক্তি তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি অভিযুক্ত মেডিসিন কর্নারে অভিযানে যান। ১২ টাকার ইনজেকশন ১০০০ টাকায় বিক্রি করার কথাও স্বীকার করেন বিক্রেতা। এছাড়া দোকানে কিছু স্যাম্পল ওষুধ এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধও পাওয়া যায়। এ কারণে মালিক মনিরুল ইসলামকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের ড্রাগস সুপার সৈকত কুমার কর বলেন, এর আগে মিরপুরে এমন ঘটনায় দুটি দোকানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছিল। আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। এ ধরনের অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।