১৮ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি রমনা হামলা মামলার

0
48

বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে রমনা বটমূলে বোমা হামলার ঘটনায় করা মামলা ১৮ বছরেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। বিচারিক আদালতে মামলার রায় হলেও হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণ) ও আসামিদের আপিলের শুনানি শুরু হয়নি। শুনানি কবে হবে তাও বলতে পারছেন না কেউ। অপরদিকে, সাক্ষীর অভাবে ঝুলে আছে একই ঘটনায় করা বিস্ফোরক আইনের মামলাটিও।

দফায় দফায় সমন পাঠানোর পর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হলেও সাক্ষীদের হাজির করতে পারছে না পুলিশ। ২০০১ সালে রমনার বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়। এ ঘটনায় ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত ও ২০ জন গুরুতর আহত হন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান ‘ইসলামবিরোধী’বলে প্রচার করে উগ্র মৌলবাদীরা ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালায়।

এ ঘটনায় নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র চন্দ ওই দিনই রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দু’টি মামলা করেন।

দু’টি মামলার মধ্যে হত্যা মামলার রায় হয় প্রায় ১৩ বছর পর ২০১৪ সালের ২৩ জুন । রায়ে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের শীর্ষ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ আটজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন আদালত।

ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- মুফতি আব্দুল হান্নান, মাওলানা আকবর হোসেন, আরিফ হাসান সুমন, মাওলানা তাজউদ্দিন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে মাওলানা হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মাওলানা আবদুল হাই ও মাওলানা শফিকুর রহমান।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- শাহাদাত উল্লাহ জুয়েল, মাওলানা সাব্বির, শেখ ফরিদ, মাওলানা আব্দুর রউফ, মাওলানা ইয়াহিয়া ও মাওলানা আবু তাহের। এরমধ্যে সিলেটের হযরত শাহজালালের মাঝার জিয়ারতের সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলা মামলায় মুফতি হান্নানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। আর বিস্ফোরক মামলাটি ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।

২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর দুই মামলায় ১৪ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

মামলা হওয়ার ৭ বছর পর ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে দু’টি মামলায়ই চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেয়া হয়। আর আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয় ২০০৯ সালের ১৬ এপ্রিল। অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ রহুল আমিনের আদালতে এই মামলার যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন শেষ হলে আদালত ওই বছরের ১৬ জুন মামলার রায় ঘোষণার তারিখ ঘোষণা করেন। 

মামলায় সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ চার আসামি এখনো পলাতক রয়েছে। পরে হত্যা মামলায় ২০১৭ সালের ১৭ জানুয়ারি বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শুরু হয়। পরে আর কোনো শুনানি হয়নি বা কার্যতালিকায় আসেনি।

হাইকোর্টে ডেথ রেফরেঞ্চ শুনানির বিষয়ে জানতে চাইলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফরহাদ আহমেদ বলেন, মামলাটি বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানি শুরু হয়। এক পর্যায়ে মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। পরে শুধু ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হয়। মামলাটি এখন শুনানির জন্য অপেক্ষমান।

অপরদিকে, ২০০৯ সালে চার্জ গঠনের পর বিস্ফোরক মামলায় প্রথম সাতজনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়। এরপর থেকে ধীরগতির চক্রে পড়েছে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম।

২০১৫ সালের ২২ মার্চ থেকে সাক্ষীদের প্রতি সমনের ও ওয়ারেন্ট জারি করে আসছেন আদালত। গত তিন বছরে দু’জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। গেল বছরের ৮ মার্চ এ মামলায় সর্বশেষ শংকর চন্দ্র হাওলাদার সাক্ষী দেন। ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটির বিচারকাজ চলছে। এ পর্যন্ত মামলায় ৮৪ জনের মধ্যে ২৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। 

বিস্ফোরক আইনের মামলা প্রসঙ্গে আদালতের সরকারি কৌঁসুলি আবু আবদুল্লাহ ভূঞা বলেন, মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ত্বরান্বিত করতে রাষ্ট্রপক্ষের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আদালত প্রতিনিয়তই সাক্ষীদের প্রতি সমন ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে চলেছেন। কিন্তু সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে পারছে না পুলিশ। তবে বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণ গতি পেয়েছে।

২০০১ সালের পহেলা বৈশাখের দিন ভোরে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানস্থলে দু’টি বোমা পুঁতে রাখা হয়। পরে দূর নিয়ন্ত্রিত রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পুতে রাখা বোমাগুলোর বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সকাল ৮টা ৫ মিনিটের দিকে একটি ও সাড়ে ১০টার দিকে আরেকটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে আসা সাত জন প্রাণ হারান। আহত হন ২০-২৫ জন। পরে আহত ব্যক্তিদের মধ্যে আরো তিনজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র চন্দ ওই দিনই রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দু’টি মামলা করেন। এতে ১৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

এদিকে, ২০১৫ সালের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে টিএসসি এলাকায় নারীদের যৌন হয়রানির আলোচিত ঘটনার তিন বছরে ওই ঘটনার বিচারও হয়নি। ২০১৬ সালের ১৯ জুন এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় একমাত্র আসামির বিরুদ্ধে চার্জ (অভিযোগ) গঠন করা হলেও এখনো মামলায় কোনো সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়নি। ঢাকার তিন নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলাটি বিচারাধীন।

জানতে চাইলে ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মাহমুদা আক্তার বলেন, মামলাটিতে এরইমধ্যে আদালত আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেছেন। আদালতে সাক্ষী না আসায় তাদের প্রতি সমন জারি করা হয়েছে। এ ছাড়া আগামীতে পিপি অফিসের মাধ্যমে সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা।

আদালত সূত্র জানায়, আলোচিত এ মামলায় মো. কামাল নামের এক যুবককে আসামি করে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে আদালতে চার্জশিট দেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পুরস্কার ঘোষিত আরো সাত আসামির ছবি পাওয়া গেলেও তাদের নাম-ঠিকানা বা অবস্থান শনাক্ত করতে না পারায় চার্জশিটে তাদের আসামি করা হয়নি।