শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা শুক্র-শনিবার ডাক্তারের দেখা পায়না

0
1026

খোরশেদ আলম বাবুল, শরীয়তপুর ঃ ১০০ শয্যা বিশিষ্ট শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ডায়রিয়া, সার্জারী, শিশু, মেডিসিন ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে মুমূর্ষ রোগীদের ভর্তি করে চিকিৎসা প্রদান করা হয়। ভর্তি রোগীরা বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার পর থেকে রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ডাক্তার বিহীন অসহায় সময় অতিবাহিত করে।

এ দীর্ঘ সময় কোন ডাক্তার ভর্তি রোগীদের দেখেন না। ওই সময় নার্সই একজন রোগীর ভরসা। এমনটাই এ হাসপাতালের নিয়মে পরিনত হয়েছে। তাই সচেহন রোগীরা প্রাইভেট ক্লিনিকে বা বাসায় চলে যায়। বৃহস্পতিবার সকালে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি ছিল ২৮ জন। শুক্রবার সকাল ১১টায় সেখানে রোগী দেখা গেছে ৬ জন।

হাসপাতালের মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে সদর উপজেলার রুদ্রকর গ্রামের জাহাঙ্গীর মাদবরের মেয়ে শ্রাবনীকে অসুস্থ অবস্থায় বৃহস্পতিবার দুপুরে ভর্তি করেন মা ফিরোজা বেগম। ফিরোজা বেগম জানায়, ভর্তির সময় জরুরী বিভাগ থেকে যে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে সেই ভাবেই চলছে। নার্সেরা রাতে ও সকালে এসে দেখেছে। এ পর্যন্ত কোন ডাক্তার আসেনি। রোগীর অবস্থা খারাপ হচ্ছে কিন্তু চিকিৎসার পদ্ধতি পরিবর্তণ হচ্ছে না।

ভেদরগঞ্জ উপজেলার রামভদ্রপুর গ্রামের সিদ্দিক মোল্যার মেয়ে সোনিয়াকে খিচুনী রোগে আক্রান্ত অবস্থায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় হাসপাতালে ভর্তি করে। সে মহিলা ওয়ার্ডের ৩৩ নম্বর বেডে আছে। ভর্তির পর সোনিয়ার সাথেও কোন ডাক্তারের দেখা হয়নি।
এ সময় দায়িত্ব রত এক নার্সের সাথে কথা হয়। তিনি জানায় শুক্রবার ডাক্তারের কোন রাউন্ড থাকে না।

মহিলা সার্জারী ওয়ার্ডে নড়িয়া উপজেলার মশুরা গ্রামের অরুন মন্ডলের মেয়ে নিপা বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় ভর্তি হয়। ৪ নম্বর বেডে নিপা চিকিৎসাধীন রয়েছে। ভর্তির পর তার সাথে ডাক্তারের দেখা নাই।

একই ওয়ার্ডে ১২ দিন ধরে ভর্তি আছেন একই উপজেলার নশাসন গ্রামের আবুল কালাম মালতের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম। আনোয়ারা জানায় বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় ডাক্তার এসেছিল। আজ শুক্র ও শনিবার ডাক্তার আসবে না।

একই ওয়ার্ডের ১৩ নম্বর বেডে ৯দিন ধরে ভর্তি আছেন জাজিরা উপজেলার মনিরা। তিনিও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন শুক্র ও শনিবার ডাক্তার আসেনা।

পুরুষ সার্জারী ওয়ার্ডে ৪ সপ্তাহ ধরে ভর্তি আছেন পৌরসভার হুগলি গ্রামের আ. জলিল মোল্যা। তিনি জানায়, ডাক্তার ঠিকমতো আসে না। বৃহস্পতিবার সকালের পরে রবিবার দুপুরে ডাক্তার আসে। ডাক্তাররা বাহিরে রোগী দেখেই ক্লান্ত। ডাক্তাররা সরকারী বেতনে বাহিরে বেসরকারী চেম্বারে ভিজিট নিয়ে রোগী দেখে। তাদের সরকারী হাসপাতালে রোগী দেখার সময় কই। আজ কাল করে ভর্তির ১৫ দিন পরে আমাকে অপারেশন করেছে। এখন আর দেখছে না। এ পর্যন্ত ১ বার ক্ষত স্থান পরিস্কার করেছে।

একই ওয়ার্ডের ৩২ নম্বর বেডে বুধবার থেকে সদর উপজেলার দক্ষিন গোয়ালদি গ্রামের সোহরাব মোল্যা ভর্তি আছেন। বৃহস্পতিবার সকালে পর থেকে তার সাথেও ডাক্তারের দেখা মেলেনি।

মুক্তিযোদ্ধা কেবিনে ডগ্রী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। তিনি শরীয়তপুর পৌর মেয়র রফিকুল ইসলামের ভগ্নিপতি। সেই কারনে হয়তো তাকে বৃহস্পতিবার রাতে একজন ডাক্তার দেখেছেন।

সদর উপজেলর তুলাতলা গ্রামের দেলোয়ার আকনের মেয়ে মীম (১০) শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি আছে। জ্বরে আক্রান্ত মেয়েকে নিয়ে বুধবার সদর হাসপাতালের বহির্বিভাগে ১৯ নম্বর কক্ষে ডাক্তার দেখায়। ডাক্তার ৫/৬টা পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষা প্রতিবেদন দেখে নাপা সিরাপ লিখে দেয় ডাক্তার। তাতে কোন কাজ হয়নি। পরে মীমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মেয়ের জ্বরের জন্য আল্ট্রাসনোগ্রাম ও এক্স-রে লাগবে কেন তা বুঝতে পারছে না মীমের পিতা। মীমের পিতা দেলোয়ার জানায়, শুক্রবার সকালে হুজুর ডাক্তার দেখে বলে মীমের টাইফয়েড জর। এতোগুলো পরীক্ষা করলাম তাতে টাইফয়েট ধরা পরলনা কেন। তাহলে পরীক্ষা করে কী লাভ।

পুরুষ ওয়ার্ডে হাসপাতালের একজন স্টাফকে তদারকি করতে দেখে তার কাছে জানতে যাওয়া হয় ডাক্তার রাউন্ডে আসবে কীনা? সে প্রতিবেদককে উল্টো প্রশ্ন করে রোগী কে? শুক্রবার রাউন্ডে ডাক্তার আসে না। বেশী জরুরী হলে নিচে জরুরী বিভাগে যান। তার পরিচয় জানতে চাইলে বলে, সে সার্জারী ডাক্তারের সহযোগী সালাম।

অফিস কক্ষ থেকে জানাযায় শুক্রবার রাউন্ড থাকে না। জরুরী বিভাগে মেডিকেল অফিসার ডা. শুভ্রদেব সাহা জরুরী বিভাগ সহ ১০০ শয্যার হাসপাতালের রোগীদের সেবা প্রদান করছেন।

এখন জনমনে প্রশ্নঃ একজন আবাসিক মেডিকেল অফিসার ১০০ শয্যা হাসপাতালে সকল সময় থাকবেন। রুটিন অনুযায়ী অন্যান্য ডাক্তাররাও হাসপাতারে দায়িত্ব পালন করেন। ১০০ শয্যার হাসপাতালে জরুরী বিভাগের একজন ডাক্তার সকল রোগীদের কি সেবা প্রদান করবে। তাছাড়া শুক্র ও শনিবার রোগবালাই কি ডাক্তারদের সাথে ছুটিতে থাকে? তাই ডাক্তাররা রোগীদের দেখেন না।