মমতাজের সেকাল একাল

0
120

একদিকে তিনি জনপ্রিয় বাংলা লোকগানের সংগীতশিল্পী এবং অন্যদিকে জাতীয় সংসদের তিনবারের সদস্য। বলছিলাম বাংলাদেশের সুর সম্রাজ্ঞী খ্যাত মমতাজের কথা। যিনি চার দশকের ক্যারিয়ারে প্রায় ৭০০-এর অধিক গান গেয়ে রেকর্ড গড়েছেন।

তাকে নিয়ে বলতে গেলে অবশ্য শুরুতে বলতে হবে হানিফ সংকেতের কথা। কারণ তিনিই ২০০০ সালে গ্রাম-গ্রামান্তরের লুকিয়ে থাকা এই প্রতিভাবান শিল্পীকে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র মঞ্চে উন্মোচন করে দর্শকদের সামনে নিয়ে এসেছিলেন। পালাগান করে বেশ জনপ্রিয় এই গায়িকার কাছে ইত্যাদি টিম গেলে শুরুতে নাকচ করে দেন মমতাজ।

বলেন, টিভিতে গান করার কোনো ইচ্ছা নেই তার। পরে হানিফ সংকেত অনেক বুঝিয়ে তাকে রাজি করান। এরপর মোহাম্মদ রফিকুজ্জামানের কথায় ও সোহেল আজিজের সুরে ‘ইত্যাদি’র মঞ্চে বেজে উঠল সেই গান ‘রিটার্ন টিকেট হাতে লইয়া আইসাছি এই দুনিয়ায়, টাইম হলে যাইতে হবে যাওয়া ছাড়া না উপায়’। অনুষ্ঠানে গানটি প্রচারের পরপরই চারিদিকে ধুম পড়ে যায়। সবাই মমতাজকে খুঁজতে শুরু করেন। আর সেই দিন থেকে তিনি বনে যান দর্শকদের পছন্দের শিল্পী। আর মানিকগঞ্জের সেই পালাগানের গায়িকা থেকে সারা বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় তার জনপ্রিয়তা।

এদিকে, মমতাজ দর্শকদের মধ্যে নিজের জনপ্রিয়তার দ্যুতি ছড়িয়ে কিছুদিনের মধ্যে গেয়ে ফেলেন নিজের কণ্ঠে ‘ফাইট্টা যায়’, ‘আগে যদি জানতাম বন্ধু তুমি হইবা পর’ মতো হিট গান। গান দুটো প্রকাশের পর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মমতাজকে। পরে জনপ্রিয়তার সর্বোচ্চ শিখরে নিজেকে বসান এই শিল্পী। তখনই গ্রাম-বাংলার গানে অত্যন্ত জনপ্রিয়তার জেরে মমতাজ পেয়ে যান ফোক সম্রাজ্ঞীর খেতাবও।

মূলত মমতাজের গাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় গান ছিল ‘বন্ধু যখন বউ লইয়া, আমার বাড়ির সামনে দিয়া, রঙ্গ কইরা হাইট্টা যায়, ফাইট্টা যায় বুকটা ফাইট্টা যায়’। গানটি ওই সময় পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি এই গানের অ্যালব্যাম ‘প্রাণসই’ ছিল সে বছরের সবচেয়ে ব্যবসাসফল অ্যলব্যাম। শুধু এ গানের জন্যই রেকর্ড সংখ্যক এই অ্যালবামটি বিক্রি হয়েছিল মমতাজের। 

অবশ্য জনপ্রিয়তার পাশাপাশি গানটির জন্য মমতাজকে শুনতে হয়েছিল নানা সমালোচনাও। মূলত চটুল কথার জন্য সঙ্গীতবোদ্ধারা এই গানের খুব সমালোচনা করেছিলেন। এরপর মমতাজ একেধারে ‘নান্টু ঘটক’, ‘আমার ঘুম ভাঙ্গাইয়া গেলো গো মরার কোকিলে’সহ প্রচুর জনপ্রিয় গান গেয়েছেন। যে গানগুলো মমতাজকে এনে দিয়েছিল সুখ্যাতি। এরপর থেকে অডিও ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন পালাবদল এনেছিলেন মমতাজ। গানগুলো গাওয়ার পর থেকে তার যেকোন অ্যলব্যামই প্রচুর বিক্রি হতো।

মমতাজের জন্ম ১৯৭৪ সালের পাঁচ মে। তিনি গানের জগতে আসার আগে প্রথম জীবনে বাবা মধু বয়াতির কাছে তালিম নেন। পরে মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান এবং শেষে লোক গানের শিক্ষক আবদুর রশীদ সরকারের কাছে গান শেখেন। বাবা মধু বয়াতি ছিলেন মূলত বাউল শিল্পী।

এদিকে, সংসারে অভাব থাকায় শৈশবে বাউল গান গাইতেন মমতাজ। এরপর পালাগান, জারি গান-সহ বহু গান গেয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়েছেন তিনি। এত জনপ্রিয়তার পরেও পালাগান ছাড়েননি মমতাজ। সেই সূত্রেই তার পরিচয় শাহ আলম সরকারের সঙ্গে। যিনি মমতাজের বেশিরভাগ গানেরই রচয়িতা। ‘বান্ধিলাম পিরিতের ঘর, ভালোবাসার খুঁটির পর। আদরের দিলাম ঘরে চাল ও মনরে সুখেতে রব চিরকাল’ মমতাজের গাওয়া শাহ আলম সরকারের কথায় ইমন সাহার সুরে ‘মোল্লা বাড়ির বউ’ সিনেমার এই গানটি মুগ্ধ হননি এমন শ্রোতা কমই পাওয়া যাবে। আর ‘ফাইট্টা যায়’ শোনার পর যারা মমতাজের গানের সমালোচনা করেছিলেন তারাই গানটি শুনে প্রশংসা করেছিলেন শিল্পীর।

মমতাজের গাওয়া প্লে-ব্যাকে সবচেয়ে জনপ্রিয় গান ছিল ‘খায়রুণ লো তোর লম্বা মাথার কেশ’। এই গানটির পর তিনি চলচ্চিত্রের গানে নিজেকে স্বতন্ত্র্য করে তুলেছিলেন। এই সময় মমতাজ সারাদেশে বিভিন্ন সংগীতানুষ্ঠানে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। তাছাড়া সে সময় তিনি যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশেই সংগীত অনুষ্ঠানে গান গেয়েছেন এবং তার গান ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। বাংলা সংস্কৃতির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিশেষশত বাংলা নববর্ষের বৈশাখি মেলায় তার গান আজো অনেক জনপ্রিয়। 

ইতিহাস সিনেমার ‘মনে যদি পচন ধরে’ থেকে মনপুরার গান ‘আগে যদি জানতাম বন্ধু তুমি হইবা পর’ সব গানেই মমতাজ নিজেকে ভিন্নভাবে পরিচয় করিয়েছেন। এরপরে তিনি প্লে-ব্যাকের পাশাপাশি অভিনয়ও করেছেন। হৃদয়ের বন্ধনের তুমুল হিট গান ‘বধূ বেশে কন্যা যখন এলোরে’, অন্য মানুষ সিনেমার ‘বাজলো বাঁশি ছাড়লো গাড়ি’তে বিশেষ অভিনয়শিল্পী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন মমতাজ। গেলো বছরের ‘সত্তা’ সিনেমার ‘না জানি কোন অপরাধে’ গেয়েও আরেকবার দর্শকনন্দিত হয়েছেন মমতাজ। এরপর দেবী সিনেমায় গেয়েছেন ‘দোয়েল পাখির কন্যারে’। ভয়ংকর সুন্দর সিনেমায় তিনি গেয়েছেন ‘ফিরবো না আর ঘরে’। 

মমতাজ গানের পাশাপাশি অভিনয় করেছিলেন সিনেমায়। তিনি ‘মমতাজ’ সিনেমায় নিজ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, ছবিটিও বাণিজ্যিক সফল হয়েছিল। এমনকি জনপ্রিয়তাকে ছাড়িয়ে মমতাজ বেশকিছু বিজ্ঞাপনেও কাজ করেছেন। একসময়ের রমরমা অডিও ইন্ডাস্ট্রি এখন বিস্মৃতি। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন এসেছে গানের ঢঙে। সে পরিবর্তনে তাল মিলিয়েছেন মমতাজও।

প্রীতমের সুরে ‘লোকাল বাস’-এর মতো জনপ্রিয় গান সেটাই প্রমাণ করে। এই গানে পুরো ফিল্ম স্টাইলে হাজির হয়েছিলেন মমতাজ। এছাড়াও ‘বান্ধিলাম পিরিতের ঘর’ গানের জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কার পেতে পারতেন। হয়ত ভাগ্য তার সহায় হয়নি। এরপর নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ সিনেমার ‘নিশিপক্ষী’ গানের জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন মমতাজ।

এছাড়া বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে দর্শক জরিপে মমতাজ দু’বার মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি ক্যারিয়ার জীবনে অনেক সস্তা-চটুল গান গেয়েছেন ঠিকই, তবে কিছু কিছু গানের জন্য নিজেকে সমৃদ্ধি করেছেন। বিশেষ করে তরুণ ও উচ্চবিত্তদের মাঝে মমতাজের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। যেটা তার কোনো কনসার্টে উপস্থিত দর্শক দেখলে সহজেই বুঝা যায়।

একেবারে প্রান্তিক থেকে উঠে আসা এই জনপ্রিয় গায়িকা পরবর্তীতে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। বাবাকে স্মরণ করে তিনি চোখের হাসপাতাল নির্মাণ করেছেন। কারণ, অর্থাভাবে একটা সময় তার বাবা চোখের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেন। যা পরবর্তীতে তাকে ভীষণভাবে ব্যথিত করেছে।