জাজিরায় বাল্যবিয়ের দায়ে স্কুল শিক্ষক তাওহিদ আটক

0
129



খোরশেদ আলম বাবুল, শরীয়তপুর ঃ শরীয়তপুরের জাজিরায় বাল্য বিবাহের দায়ে তাওহিদুল ইসলাম নামে আব্দুল গনি উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ও কাজীর সহকারী পরিচয়ে স্বপন মল্লিক পুলিশের হাতে আটকের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

মুচলেকা দিয়ে পুলিশ থেকে ছাড়া পেলেও শিক্ষক তাওহিদুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করবেন বলে জনিয়েছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ ও বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটি। এ চরিত্রহীন শিক্ষকের অপসারণ দাবী করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকগণ।

আব্দুল গনি বিদ্যালয়, বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার হিতামপুর গ্রামের শেখ হাফিজুর রহমানের ছেলে তাওহিদুল ইসলাম শরীরচর্চা শিক্ষক পদে ২০১৫ সালের মার্চ মাসে আব্দুল গনি উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। বিদ্যালয়ের নবম-দশন শ্রেণীর ছাত্রীদের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তেন শরীরচর্চা শিক্ষক তাওহিদুল।

গত বছর এসএসসি পরীক্ষার পরে তানজিলা নামে এক ছাত্রীর সাথে তার বিয়ের কথা চুড়ান্ত হয়। পরবর্তীতে লেনদেনের বিষয়ে বনিবনা না হওয়ায় সেই বিয়ে ভেঙ্গে যায়। পরবর্তীতে একাধিক মেয়ের সাথে তাওহিদুল পুনরায় অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।

বিষয়টি জানাজানির এক পর্যায়ে শিক্ষক তাওহিদুলের চরিত্রে কালিমা লেপন করে দেয়াল লেখন ও লিফলেট লিখে সাটিয়ে দেয়া হয়। তখন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে শিক্ষক তাওহিদুলকে রক্ষা করে এবং ভবিষ্যতের জন্য সাবধান করে দেন।

তিন মাস না যেতেই শিক্ষক তাওহিদুল পুনরায় কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন। নিজ বিদ্যালয় থেকে চলতি বছরে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়া প্রিয়া মল্লিক নামে অপ্রাপ্ত বয়স্কা এক ছাত্রীর সাথে বিয়ের পিড়িতে বসেন এই শিক্ষক।

অবশেষে শেষ রক্ষা হলোনা চারিত্রিক ক্ষয়ে জড়জড়িত শিক্ষক তাওহিদুলের। বিয়ের আসর থেকেই জাজিরা থানা পুলিশের হাতে আটক হয় শিক্ষক তাওহি-দুল। বিশেষ শর্তে পুলিশী আটক অবস্থা থেকে ছাড়া পেলেও ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত প্রিয়া মল্লিলকে স্ত্রী হিসেবে দাবী করতে পারবে না স্বামী তাওহিদুল। ঘটনা সেখানেই শেষ হয়নি।

তাওহিদুলের বিরুদ্ধে উপজেলা শিক্ষা অফিস, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটি ব্যবস্থা গ্রহন করবেন। তার পরেও সমাজ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে তাওহিদুলের চরিত্র কুলশিত হয়েছে।

অভিযুক্ত শিক্ষক শিক্ষক তাওহিদুল বলেন, আমরা তিন মাস পূর্বে কোর্ট মেরিজ করেছি। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতে গত ৫ জুলাই শুক্রবার বিয়ের আয়োজন করা হয়। বিয়ের আসর থেকে আমাকে ও কাজীকে পুলিশ আটক করে। থানা থেকে মুচলেকা দিয়ে এসেছি।

২০২০ সালের জুলাই মাসে প্রিয়া মল্লিকের বয়স ১৮ পূর্ন হলে আমরা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচিত হব। ইতোপূর্বে আমার বিরুদ্ধে যে সকল অপপ্রচার হয়েছে তা উদ্দেশ্য মূলক। তবে তানজিলার সাথে গত বছর বিয়ের কথা চুড়ান্ত হয়। তানজিলার পরিবারের অবৈধ চাহিদা পূরণ করতে না পারায় সেই বিয়ে ভেঙ্গে যায়।

বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান মিক্ষক বলেন, ৫ জুলাই শুক্রবার সোয়া ১০টায় আমাকে মোবাইল ফোনে বিয়ের নিমন্ত্রণ করেন শরীরচর্চা শিক্ষক তাওহিদুল। তাওহিদুল আরও বলে আপনি আমার অভিভাবক হিসেবে থাকবেন।

কার সাথে বিয়ে জানতে চাইলে তাওহিদুল বলে প্রিয়া মল্লিককে সে বিয়ে করছে। প্রিয়া মল্লিক এই বছর এসএসসি দিয়েছে। মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ ৩.৪৪ পেয়েছে। প্রিয়া অপ্রাপ্ত বয়স্ক বিধায় আমি বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করিনি।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম, আবুল কালাম আজাদ, ডিএম হাবিবুর রহমান, মো, রাসেল, আবু সালেহ, আফরোজা আক্তার জানায়, ৫ জুলাই সন্ধ্যার পরে তাওহিদুল ইসলাম স্যারের বিয়ের অনুষ্ঠান হবে বলে তাদের নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা না করে দুপুরে বিয়ের পিড়িতে বসে তাওহিদুল ইসলাম।

সহকর্মীদের ফাঁকি দিয়ে বিয়ের পিড়িতে বসেও শেষ রক্ষা পায়নি তাওহিদুল। বাল্য বিবাহ করার অপরাধে শিক্ষক তাওহিদুল পুলিশের হাতে আটক হয়। তারা আরও জানায়, তাওহিদুল এই পর্যন্ত এই রকম অনেক ঘটনা ঘটিয়েছে।

পরীক্ষার ডিউটিতে গিয়ে মেয়েদের সাথে সম্পর্ক করে, প্রশিক্ষনে গিয়ে মহিলা শিক্ষকদের সাথে প্রেম শুরু করে, বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রীদের মধ্যে যাদের বিয়ে হয়েছে তাদের মোবাইলে গভীর রাতে ফোন করে সে। অনেক ছাত্রীর স্বামী আমাদের কাছে বিচার নিয়ে আসে। মেয়েলি সংক্রান্ত সকল বাজে অভ্যাস তাওহিদুলের রয়েছে। তাওহিদুলের জন্য কোথাও মুখ দেখাতে পারি না।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোতালেব হোসেন বলেন, তাওহিদুলের বিরুদ্ধে দেয়াল লিখন ও লিফলেট বিতরণ হয়েছে। লিফলেট ছিড়ে ফেলে প্রথমে তাওহিদুলকে রক্ষা করে পরে তাওহিদুলকে বুঝিয়েছি। কোন বুঝই তাওহিদুলকে সচেতন করেনি। সে বারবার মেয়েলি বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে।

এবার বাল্যবিবাহর মতো যঘন্যতম অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়েছে। বিয়েতে আমাকেও দাওয়াত করা হয়েছিল। উপজেলা অফিসে যত মিটিং হয় ততবার বলে বাল্য বিবাহ মুক্ত সমাজ গড়তে হবে। যখন শুনেছি আমার বিদ্যালয়ের শিক্ষক বাল্যবাহে আবদ্ধ হতে যাচ্ছে তখন বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে অবগত করি।

আমার পূর্বেই প্রশাসন বিষয়টি টেরপেয়ে বিবাহস্থল থেকে বর ও কাজীকে আটক করে। শুনেছি মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছে। আমি প্রথমে শিক্ষকদের নিয়ে বসব পরে কমিটির সাথে বসে সিদ্ধান্ত গ্রহন করব। এভাবে চলতে দেয়া যায় না।

এই স্যারের ক্লাশে যেতে ভয় হয়। স্যারের আচরণ ভালো না। জানায় বিদ্যালয়ের অষ্টম থেকে দশম শ্রেনীর ছাত্রীরা। ছাত্রীদের অভিভাবকরা উৎকন্ঠায় সময় কাটায় বলেছেন। বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফজলুল হক আকন্দ বলেন, শিক্ষকদের আভ্যন্তরীণ কোন্দল বিষয়টি জটিল করেছে।

তাছাড়া শিক্ষক তাওহিদুলের একটু আধটু চারিত্রিক দোষও আছে। শুনেছি তিনমাস পূর্বে তাওহিদুল ও প্রিয়া কোর্ট ম্যারিজ করেছে।

গত শুক্রবার আনুষ্ঠানিক বিয়ে করতে যায়। কণের বিয়ের বয়স না হওয়ায় পুলিশ বিয়ের আসর থেকে বর ও কাজীকে আটক করে। পরে মুচলেকা নিয়ে ছেড়েছে। বিষয়টি একটি বিদ্যালয়ের জন্য দূর্নাম। আমি শিক্ষক ও কমিটিকে নিয়ে বসে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে একটা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করব।

জাজিরা থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বেলায়েত হোসেন বলেন, শুক্রবার পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া ইয়াছিন আকন কান্দি গ্রামে বাল্যবিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সংবাদ পেয়ে পুলিশ পাঠাই। বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে কাজীর সহকারী স্বপণ মল্লিক ও বর পরিচয়ে তাওহিদুল ইসলামকে আটক করা হয়। কনের বয়স পূর্ণ না হতে বিয়ে করবে না মর্মে মুচলেকা রেখে বরকে ছেড়ে দেয়া হয়।

জাজিরা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. মোজাম্মেল হক বলেন, বাল্যবিবাহ বন্ধে শিক্ষকের ভূমিক থাকবে। সেখানে শিক্ষকই বাল্যবিবাহ করছে। বিষয়টা খুব লজ্জার। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।