সুলতান’ আমাদেরই একজন

0
85

“সুলতান পাগলা” নামেই আমাদের কাছে পরিচিত, নাম তার সুলতান। জন্মের পর থেকেই আমি তাকে এরকম দেখে আসছি। তার বয়স যেন বাড়ে না, দাড়ি -চুলে পাক ধরে না আবার দাঁতগুলোও ঠিকঠাক। আমরা ভাবতাম, আসলে সুলতানের বয়স কত?

কত আর হবে? হয়তোবা আমাদের থেকে কিছুটা বড়! আসলেই কি তাই? কেউ জানে না, তার বয়স কত? কারো অবশ্য হিসাব রাখার কথাও না। তার জন্ম নিবন্ধন সনদ কিংবা জাতীয় পরিচয় পত্রও নেই। তবে আনুমানিক ৫৫-৬০ বছর হবে বলে গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ অনেকের মতামত।

সুলতানের বাবা “নাইলা” পাগল ছিলেন না। তবে তার মা “জামিরন বিবি” র মানসিক সমস্যা ছিল। সারাদিন মানুষের বাড়ি খাওয়া দাওয়া করলেও নিজেদের থাকার মত তাদের ঘর ও জমি ছিল।

সুলতানের বাবার মৃত্যুর পর সুলতানের মা এই বসতভিটায় থাকলেও সুলতান থাকতো অন্যের বাড়িতে। সুলতানের মায়ের খাবার আর পরনের কাপড় ছাড়া চাওয়ার কিছু ছিল না। ভালো বা সাদা মনের মানুষ বলতে যা বুঝায় তাই। কারো কোন অনিষ্ট করেছে এমন খবর কেউ কখনো শুনে নাই। দোষের (অনেকেই বিরক্ত ছিল) বলতে ঐ একটাই কাজ করতেন, তা হলো প্রাকৃতিক কাজে অন্যের শৌচাগার ব্যবহার করা।

এভাবেই একদিন সাদামাটা, এলোমেলো জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে হঠাৎ করে সুলতানের মা নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। যার খবর আজ পর্যন্ত কেউ দিতে পারে নি। এমনকি তার মৃত্যুর খবরও কেউ দিতে পারে নি। তাই তার নিখোঁজ হবার অনেক দিন পর গ্রামবাসীর উদ্যোগে তার জন্যে মিলাদ, দোয়া এবং খরচ অনুষ্ঠান করা হয়।

অবাক করার বিষয় হলো -আমাদের গ্রামে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকে যখন তার বাবা-মা এই সুলতানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, কোন অভিভাবকই বলে না যে, ইনি তোমার কাকা হয়, মামা হয় কিংবা দাদু হয়। সবাই বলে, এ হলো “সুলতান পাগলা”। তো আমরা তাকে সুলতান পাগলা নামেই চিনবো, এটাই স্বাভাবিক।

সুলতানের কৈশোর এবং যৌবন কেটেছে অন্যের বাড়িতে রাখালের মত কাজ করে। তবে পারিশ্রমিক নিয়ে প্রশ্ন আছে। অন্তত আমি ছোটবেলা থেকেই এরকম দেখে আসছি। সুলতানও ওর মায়ের মতো। চাহিদা বা নিজের স্বার্থ বলতে খাওয়া, পরা ও থাকার জায়গা। ভারী কাজ তেমন করতে না পারলেও অনেক কাজই তো করতে পারে।

তারপরও সেই কাজের মূল্যায়ন এবং তার ন্যায্য পাওনা আমরা কি মিটাই? খুব বেশি বাড়িতে অবশ্য সে কাজ করে নাই। হাতে গুনা যে কয়টা বাড়িতে সে কাজ করেছে, হিসেব করলে প্রত্যেক বাড়িতেই তার পাওনা আছে, হতে পারে সেটা পরিমানে সামান্য। পাগলের পরিশ্রমেরও তো মূল্য আছে।

গরুর জন্যে ঘাস কাটা, সামান্য বোঝা বহন করা এবং কিছু হালকা ঘর – গৃহস্থালি র কাজই সে ভালোভাবে করতে পারে। কোন প্রকার টাকা-পয়সার হিসাব তো করতেই পারে না আবার সেটা স্মরণ রাখার প্রশ্নই উঠে না। তাই বাজারঘাট করা তার পক্ষে অসম্ভব।

সে টাকা বলতে দুই টাকা, দশ টাকা এবং পঞ্চাশ টাকাকেই চিনে। ধাতব মুদ্রায় তার কোন আগ্রহ নেই। ওগুলো নাকি পকেট থেকে পড়ে যায়।অন্য কোন নোট সে চিনে না। যেমনঃ দশ টাকা, পঞ্চাশ টাকার নোটের পার্থক্য সে করতে পারে না। তার কাছে একই রকম মনে হয়।

ধুমপানের অভ্যাস সুলতানের বহুদিনের। যখনি কারো সাথে দেখা হবে তার কাছে প্রথম চাওয়া বিড়ি-সিগারেট অথবা দুই টাকা। চেনা/অচেনা মানুষের কাছে দুই টাকা সে চাইবেই। গায়ে হাত দিয়ে কথা একটাই, “তোর ভালো হবে, দুই টাকা দে।”

এভাবে করে প্রতিটি ঈদ উৎসব ছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সারাবছর তার উপার্জন ভালোই হয়। আর এই সব অর্থও জমা রাখেন, যখন যে বাড়িতে কাজ করে, সেই বাড়ির গৃহকর্তার কাছে। বিভিন্ন সময় যে গৃহকর্তার কাছ থেকে বিড়ি সিগারেট খাওয়ার জন্য কিছু টাকা নেন না তা কিন্তু নয়। তবে তা পরিমানে সামান্য।

মজার ব্যাপার হলো সুলতান যাকে দেখে তার কাছেই টাকা চায়। এমতাবস্থায় কেউ যদি দুষ্টুমির ছলে ওর কাছে টাকা চায় কিংবা পকেটে চিরুনি অভিযান চালাতে চায় তাহলে ও তার কাছে ঘেঁষবে না। পাছে ওর টাকা কেউ নিয়ে যায়।

সুলতানের পরিধানের কাপড়, সে তো(নতুন হোক কিংবা পুরাতন) মানুষেরই দান। ও তো আর একজন স্বাভাবিক মানুষের মতো কাজ করতে পারে না। তাই মাঝেমধ্যে ঘুরে বেড়ানোর ফাঁকে যখন যেখানে ওর সুযোগ হয়, সেখানে খাবারের ব্যবস্থাও হয়ে যায়। যেমনঃ গ্রামে যে কোন ধরনের অনুষ্ঠানে ওর দাওয়াতের দরকার হয় না। খাবারে আগেই ও পৌঁছে যাবে। প্রয়োজনে কিছু হালকা কাজও করে দেবে।

নতুন জামা-কাপড় পড়ে আমরা যেমন ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করি সুলতানও তেমন নতুন শার্ট-প্যান্ট, পায়জামা-পাঞ্জাবি কিংবা লুংগি পরে ঘুরে বেড়ায় এবং মানুষের কাছ থেকে তার পোশাক সম্পর্কে সু-মন্তব্য শুনতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে। তখন যদি মনে পড়ে, পোশাক দানকারী সম্পর্কে কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করে।

সুলতান মানুষের কাছ থেকে হাত পেতে টাকা ভিক্ষা করে একথা ঠিক, আবার এটাও ঠিক যে সে কখনো কারো সাথে টাকা নিয়ে জোড়াজুড়ি করে না। সদা হাস্যোজ্জ্বল, সদালাপী, নরম ও কোমলমতি, শিশুসুলভ আচরণ তার সারাজীবনের অহংকার। তাকে আল্লাহর একজন বিশেষ বান্দা বলে আমার কাছে অন্তত মনে হয়। তার অসুস্থতার খবর আমি কখনো শুনেছি কিনা আমার মনে পড়ে না। শুধু একবার বাস দূর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কথাই আমার মনে পড়ে।

একজন মুসলিম হিসাবে ঈদের নামাজ, জুমার নামাজ, শবে বরাতের নামাজ এবং তারাবির নামাজসহ বিশেষ নামাজের সময় সুলতানকে অবশ্যই মসজিদে পাওয়া যায়। এটাও তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

সমাজের আট-দশজনের মতো সুলতানেরও যৌবনে বিয়ে হয়েছিল। পার্শ্ববর্তী ‘ভোঁয়া’ গ্রামের “কমলা বেগমের” সাথে যে কিনা অনেকটাই সুলতানের মতো, নিজের ভালমন্দ পুরোটা বুঝে না। আমাদের গ্রামবাসী চাঁদা তুলে অনেক ধুমধাম করে ওর বিয়ের আয়োজন করেছিল।

নিছক মজা করার উদ্দেশ্যে নয়, ওদের জীবনের পূর্ণতা দেওয়াই ছিল মূখ্য। কিন্তু বিয়েটা শেষ পর্যন্ত টিকে নি। বিয়ের কয়েকদিন পরেই কমলা বেগম চলে যায়। কারণঃ কমলা বেগমের সহজ সরল স্বীকারোক্তি, “আমি ভেবেছিলাম আমার বিয়ে হচ্ছে ভোয়া গ্রামের সবচেয়ে ধর্নাঢ্য ব্যক্তি কুদ্দুস মাস্টারের বড় ছেলে ‘গোলাপের’ সাথে।” এ যেন দিবাস্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়! গরীবের আকাশে স্বপ্ন সূর্যের রশ্মি আলো ছড়ালে তাতে তো কারোই ঘুম নষ্ট হওয়ার কথা না।

আমাদের গ্রামে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা আশ-পাশের গ্রামের থেকে একটু বেশি। তাই বিভিন্ন ছুটিতে আসা চাকরিজীবীদের কাছে প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির পরিমানটাও একটু বেশি। কথা হলো ওর ঐ দানের টাকার যদি সঠিক ব্যবস্থাপনা হতো তাহলে আজ ওর আর্থ-সামাজিক অবস্থান পরিবর্তন হওয়ার কথা। আর ও ন্যায্য মজুরির কথা না হয় আর না-ই বললাম। (writer Parvez Rana)