নিজের কবরের জায়গা খুঁজছেন মুক্তিযোদ্ধা মোকসেদ মিয়া

0
7

খোরশেদ আলম বাবুল, শরীয়তপুর ॥ শ্বাসকষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে একটি অটোবাইক ভাড়া করে গত সোমবার শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের জরুরী বিভাগে আসেন ডামুড্যা উপজেলার ছোট শিধলকুড়া গ্রামের সফুর আলী হাওলাদারের ৭৭ বছর বয়সী পুত্র মুক্তিযোদ্ধা মো, মোকসেদ মিয়া।

জরুরী বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে হাসপাতালে ভর্তি করে নেয়। সেই থেকে তিনি শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের মুক্তিযোদ্ধা কেবীনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সেখানে তিনি তিন দিনেও কোন খাবার পাননি।

ঔষধের মধ্যে পেয়েছেন গ্যাসট্রিকের বড়ি ও ইনজেকশন। দামী ঔষধ বাহির থেকে কিনে আনতে হয়। তার সাথে পরিবারের বা আপনজন কেউ নাই। ঔষধ, খাবারসহ কোন কিছুর প্রয়োজন হলে হাসপাতালের তৃতীয় তলা থেকে অসুস্থ শরীরে নিজেকেই বাহিরে যেতে হয়।

অসহায় এই মুক্তিযোদ্ধার সাথে আলাপকালে তিনি জানায়, প্রথম যখন ভারতের অম্পি নগরে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং সেন্টার চালু হয় তখন সে প্রথম ব্যাচে আলফা কোম্পানীতে ট্রেনিং গ্রহন করেন। পরবর্তীতে অস্ত্রসহ বাংলাদেশে প্রবেশ করে আট নম্বর সেক্টরের অধীনে তৎকালীন গোসাইরহাট থানার ডামুড্যা এলাকায় শত্রুবাহিনীর সাথে সম্মুখিন যুদ্ধ করে এলাকা শত্রুমুক্ত করেন।

এখন কেমন আছেন এই মুক্তিযোদ্ধা জানতে চাইলে তিনি জানায়, বর্তমানে এই মুক্তিযোদ্ধা খুব অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। তার কোন জায়গাজমি নাই। নাই কোন ঘর-বাড়ি বা মাথা গোজার ঠাই। তিনি শিধলকুড়া বাজারে রাস্তার পাশে খালের উপর একটা ছাপড়া ঘর নির্মাণ করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন।

সেই জায়গাটি সরকারি হওয়ায় তার নামে কোন হোল্ডিং নম্বর পড়েনি। নেই কোন বিদ্যুতের ব্যবস্থা। তাই তার স্ত্রী-সন্তান অসহায় মুক্তিযোদ্ধাকে ছেড়ে ঢাকায় চলে গেছে। এখন তাকে দেখার কেউ নেই। নেই তার মৃত্যু পরবর্তী কবরের নিশ্চয়তা।

আপনি একা এখানে পড়ে আছেন কেন? জানতে চাইলে তিনি জানায়, তার জমিজমা ছিল। শ্বাসকষ্টে প্রায় ১৫ বছর যাবৎ ভুগছেন তিনি। ইতোপূর্বে বক্ষ ব্যাধি হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীণ ছিলেন। চিকিৎসাকালীন সময় তার সহায়সম্বল বিক্রি করে ফেলেন। এখন তার কোন জায়গা জমি নাই। তার মৃত্যু পরবর্তী কবর হবে কোথায় তাও তার জানানাই।

এই পর্যন্ত সরকারী ভাবে আপনি কী সুবিধা পেয়েছেন জানতে চাইলে তিনি জানায়, প্রধানমন্ত্রীর প্রদত্ত ভাতা ছাড়া তিনি আর কিছুই পায়না। চিকিৎসার জন্য তিন লাখ টাকা অগ্রিম নিয়েছেন। তার প্রাপ্য ভাতা থেকে অগ্রিম টাকা কেটে নেয়ার পর প্রতি মাসে তিনি চার হাজার টাকা হাতে পান। কিন্তু প্রতিমাসে তার ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার ঔষুধ প্রয়োজন হয়। ঔষুধেরে টাকাই সংগ্রহ হয় না তার। তাহলে তিনি খাবেন কী?

আপনার অসহায়ত্ব কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি জানায়, তিনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা পরিাষদ চেয়ারম্যান, এমপি, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি বরাবর অনেক আবেদন করেছেন। সেই সকল আবেদনের কপি তিনি সংরক্ষণ করেছেন। এই পর্যন্ত তার কোন প্রতিফলন দেখতে পাননি। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তিনি কোন ভিজিএফ, ভিজিডি বা ন্যায্যমূলের (১০টাকা কেজি) চাউলও পাননি।

মুক্তিযুদ্ধের ৪৮ বছর পরে এখন আপনার দাবী কী, জানতে চাইলে তিনি জানায়, জীবনের ৭৭ বছর পার হয়েছে। এখন জীবনের শেষ প্রান্তে দাড়িয়ে আছেন তিনি। এই বয়সে তার চাওয়া পাওয়ার আর কিছুই নাই। এখন তার মৃত্যু পরবর্তী কবরের জায়গা দরকার। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত এমন কোন জায়গা নাই যেখানে তিনি আবেদন করেননি।

কিন্তু তিনি ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোন ভূমি বা মাথাগোজার ঠাই করতে পারেননি। এখন শুধু তার কবরের জায়গা দরকার। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি তার মৃত্যু পরবর্তী কবরের জায়গা খুজছেন। সরকারী ভাবে যেন তার এই ক্ষুদ্র দাবী পূরণ করা হয় এটাই তার শেষ দাবী। এ কথা বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন এই অসহায় মুক্তিযোদ্ধা।