আদিতমারীর সেই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সনদ তলব

0
49
শাহিনুর ইসলাম প্রান্ত [লালমনিরহাট]: লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ১৬ শিক্ষার্থীর সেই নামুড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্রনাথ রায় ওরফে শিয়ালুর শিক্ষাগত সনদ তলব করেছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।
 
সোমবার (২১ অক্টোবর) বিষয়টি নিশ্চিত করেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এনএম শরীফুল ইসলাম খন্দকার।  এর আগে, রোববার (২০ অক্টোবর) রেজিস্ট্রি ডাকযোগে দ্বিতীয় দফায় পত্র পাঠিয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ তলব করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।
 
শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়রা জানান, উপজেলার পলাশী ইউনিয়নের নামুড়ী গ্রামে ১৯৮৮ সালে নামুড়ী বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় পড়াশোনার মান ভালো থাকায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়।
 
পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্রনাথ রায়ের আধিপত্যের কারণে নিম্নমুখী হয়ে পড়ে শিক্ষার মান ও পরিবেশ। বাধ্য হয়ে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের পাশের বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন।
 
বর্তমানে কাগজ কলমে ১৩৭ জন শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে রয়েছে মাত্র ১৬-২০ জন শিক্ষার্থী। প্রধান শিক্ষক ক্ষমতাসীন দলের নেতা হওয়ায় ক্ষমতা আর সুযোগ নিয়ে বিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রেশন করেন এবং তার স্ত্রী সুজাতা রানীকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। 
 
পরবর্তীতে ২০১৩ সালে জাতীয়করণ করা হয় বিদ্যালয়টি। জাতীয়করণের পরে প্রতিষ্ঠাকালীন তিন শিক্ষকের বদলি হলেও প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্রনাথের সস্ত্রীক রয়েছেন বহাল তবিয়তে। ফলে তাদের নিজস্ব গড়া নিয়ম-নীতিতেই চলে বিদ্যালয়ের পাঠদান।
 
বিদ্যালয় টিকিয়ে রাখতে পাশের বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী এবং ভুয়া কিছু নাম দিয়ে শিক্ষার্থীর হাজিরা খাতা তৈরি করেছেন এবং সে অনুযায়ী ভোগ করেন যাবতীয় সরকারি সুযোগ-সুবিধা। বাঁশ বাগানের ভেতর ও ধানক্ষেতের আইল দিয়ে বিদ্যালয়ে যোগাযোগের সংকীর্ণ পথ হলেও রয়েছে দোতলা ভবন।
 
নেই মূল ফটক। তথ্যের ডিসপ্লে বোর্ড থাকলেও নেই কোনো তথ্য। প্রবেশপথেই বিপজ্জনক টয়লেটের খোলা ম্যানহোল। সেখানে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। সেদিকেও নজরদারি নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
 
সরেজমিনে বিদ্যালয়টির এমন চিত্র তুলে ধরে গত শনিবার (১৯ অক্টোবর) ‘১৬ শিক্ষার্থীর জন্য ৪ শিক্ষক, দ্বিতল ভবন থাকলেও নেই রাস্তা!’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
 
এরপর নড়েচড়ে বসে কর্তৃপক্ষ। বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকালীন থেকে অদ্যাবধি দায়িত্বে থাকা প্রধান শিক্ষক উপজেলা শিক্ষা কমিটির সাবেক সদস্য রবীন্দ্রনাথ রায়ের শিক্ষাগত সনদ জাল বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।
 
সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কিছুদিন আগে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ওই প্রধান শিক্ষকের সনদ তলব করে যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দেন।
 
যার পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস তাকে চিঠি পাঠিয়ে সনদ তলব করেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব খাটিয়ে সেই চিঠির কোনো সদুত্তর দেননি প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্রনাথ রায়।
 
পুনরায় গণমাধ্যমে ওই বিদ্যালয়ের খবর প্রকাশিত হলে নড়েচড়ে বসে শিক্ষা অফিস। তাই রোববার রেজিস্ট্রি ডাকের মাধ্যমে পত্র পাঠিয়ে ৫ কর্মদিবসের মধ্যে সনদ দাখিল করতে নির্দেশ দেন শিক্ষা অফিস।
 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন, রবীন্দ্রনাথ রায় কয়েকবারে এসএস সি পাস করলেও এইচএসসিতে ইংরেজিতে ফেল করেন। এরপর টাকার বিনিময়ে জাল সনদে চাকরি করছেন। তার দাখিল করা সনদে নাম ও রোল নম্বরে কোনো মিল নেই।
 
এ কারণে শিক্ষা অফিস মৌখিক থেকে লিখিত চিঠি দিয়েও সনদ জমা করেননি। এমনকি জাতীয়করণের সময় দাখিল করা ফাইলটিও অফিস থেকে সরিয়ে নিয়েছেন তিনি। সরকার দলীয় নেতারা তার হয়ে শিক্ষা অফিসে ফোন করে সবকিছু রেখেছেন বহাল তবিয়তে।
 
নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক বলেন, প্রধান শিক্ষক ও তার স্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে চলে বিদ্যালয়টি। সবাই বদলি হলেও তাদের বদলি হয় না। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাসহ ‘ওপর মহলের’ সঙ্গে তার বেশ সখ্য থাকায় শিক্ষা অফিস ভুলেও এ বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন না। ফলে নিজেদের গড়া নিয়মে চলে বিদ্যালয়।
 
নামুড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্রনাথ রায় চিঠির জবাব বা জাল সনদ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
 
আদিতমারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এনএম শরীফুল ইসলাম খন্দকার বলেন, বিদ্যালয়টির পাঠদানের মান বাড়াতে ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের যাবতীয় সনদ যাচাই করতে চিঠি পাঠানো হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় সনদ দাখিল না করলে কঠোর  ব্যবস্থা নেওয়া হবে।