লাভের আশায় আগাম পেঁয়াজ তুলছেন কৃষকেরা

0
48

পাবনার সুজানগর পৌর বাজারে সপ্তাহের প্রথম হাটবার ছিল রোববার। সকালে বাজারে অল্প পরিমাণে মানে কয়েক’শো মণ নতুন পেঁয়াজ উঠেছে।

এই নতুন পেঁয়াজের কেজিপ্রতি দাম – পুরোনো দেশি পেঁয়াজের চেয়ে একটু কম, তবে কৃষকরা বলছেন, তারা বাড়তি দামের আশায় পরিপক্ক হবার আগেই এটা তুলে ফেলেছেন – সেজন্য এগুলো আকারে ছোট এবং দ্রুত পচে যাবার ঝুঁকি আছে।

পেঁয়াজ নিয়ে বাজারের আসা একজন কৃষক জানিয়েছেন, প্রতি মণ পেঁয়াজ পাঁচ হাজার থেকে পাঁচ হাজার দুই শত টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই হাটে সর্বশেষ বাজার বসেছিল বুধবার। সেদিন মন প্রতি পেঁয়াজ সাড়ে নয় হাজার থেকে দশ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল।

সুজানগরের মানিকহাটের কৃষক মোহাম্মদ ওমর আলী প্রামাণিক জানিয়েছেন, এখন বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা এবং দাম দেখে তার মত পাবনার বেশির ভাগ কৃষকই নির্ধারিত সময়ের সপ্তাহ দুয়েক আগেই আগাম জাতের পেঁয়াজ তুলে বাজারে নিয়ে এসেছেন।

“চৈত্র মাসে বৃষ্টি হবার কারণে সেই সময় আমাদের খুব ক্ষতি হইছিল এ বছর। তখন অনেক পেঁয়াজ পচে গেছিল। সেই সময় আমরা ৫০০ টাকা, ৭০০ টাকা মণ বিক্রি করছি।”

“এখন দাম বাড়তির দিকে দেখে আমরা আগাম জাতের পেঁয়াজটা তুলে ফেলছি। এটা এখনো পুরোপুরি পরিপক্ব হয়নি, যে কারণে আকারে বেশ ছোট। আরো অন্তত সপ্তাহ দুয়েক মাঠে থাকলে ঠিক হইত এটা।”

বাংলাদেশে পাবনার কয়েকটি উপজেলা ও গ্রামে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজের ফলন হয়। এছাড়া বগুড়া, নীলফামারীসহ উত্তরাঞ্চলীয় কয়েকটি জেলা এবং মেহেরপুর সহ বেশ কয়েকটি জেলাতেই আগাম জাতের এই নতুন পেঁয়াজ উঠতে শুরু করেছে।

আর দেশব্যাপী কেবল পেঁয়াজই নয়, পেঁয়াজের কলি এবং পাতারও চাহিদা বেশি বলে জানাচ্ছেন কৃষকেরা। কৃষকেরা বলছেন, এ বছর পরপর দুইটি ফলনের সময়ই বৃষ্টিপাত হওয়ায় ক্ষেতে পানি জমে গোড়া পচে নষ্ট হয় বহু পেঁয়াজ।

মিঃ প্রামাণিক বলছেন, সেকারণে এখন যখন বাজারে চাহিদা বেশি, তখন সুজানগরের কৃষকদের বড় অংশটি আগাম জাতের পেঁয়াজ তুলে ফেলেছেন।

তবে, আগে তুলে ফেলার কারণে নতুন পেঁয়াজের মান নিয়ে অনেক কৃষকই পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। পাবনার সাঁথিয়ার কৃষক নুরনাহার বেগমও এবার পেঁয়াজ পরিপক্ক হবার অন্তত দশদিন আগে তুলে ফেলেছেন।

তিনি বলছিলেন আগামী দশ-বারোদিনের মধ্যে আগাম জাতের পেঁয়াজ পুরোপুরিভাবে বাজারে আসতে শুরু করবে, তখন দাম অনেক কমে যাবে। যে কারণে তারা এখন পেঁয়াজ তুলে ফেলেছেন।

“ভাদ্র মাসে যে পেঁয়াজটা লাগানো হইছিল, বৃষ্টির কারণে সেটা নষ্ট হয়ে যাওয়ায়, কার্তিক মাসে নতুন করে সময়ে আমরা ‘মূলকাটা’ পদ্ধতিতে পেঁয়াজ চাষ করেছি।

কিন্তু সেটাও গত মাসের বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়ে যায়। এখন যদি দুইটা টাকা বাড়তি পাওয়া যায়, তাহলে পেঁয়াজ তুলে না ফেলে উপায় কি?”

 

“এই পেঁয়াজটার মান হয়ত পরিপক্ক পেঁয়াজের তুলনার একটু কম হবে। সাইজে বেশ ছোট এবং এটা দ্রুত পচে যাইতে পারে। এইজন্য ঠিকমত সংরক্ষণ করতে হবে, আর দ্রুত বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে এই পেঁয়াজ।”

এদিকে, যারা কৃষিপণ্যের ব্যপারী মানে কৃষকদের কাছ থেকে পেঁয়াজ কিনে মজুদ করেন এবং ট্রাকে করে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে পাঠান, তারা বলছেন নতুন পেঁয়াজের সরবরাহ এখনো কম।

সুজানগর পৌর বাজারের একজন ব্যপারী মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, সবার ফলন একই সময়ে ওঠেনি, যে কারণে বাজারে সরবরাহ কম।

“আবার সরকার পেঁয়াজ আমদানি করছে শুনে অনেক কৃষক পেঁয়াজ তোলেনি। একই সঙ্গে নতুন পেঁয়াজ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমে গেছে, যেটা কৃষকের এবং আমাদের লোকসান করে দেবে।”

তিনি ব্যাখ্যা করছিলেন, তিনদিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম মণপ্রতি তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা কমে গেছে।

“এখন ধরেন আমি বুধবার সাড়ে নয় হাজার টাকা করে ৫০ মণ কিনছি, এখন আজকে সেই পেঁয়াজের দাম হইছে পাঁচ হাজার থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা।”

“নতুন পেঁয়াজ ওঠার সাথে সাথে দাম কমতে থাকবে, আবার সরকারের ভ্রাম্যমান আদালতের ভয়েও দাম কমবে। তো আমি তো তিন দিনের মধ্যে দুই লক্ষ টাকা ধরা খাইলাম!”

সুজানগর পৌর বাজারে প্রায় সাড়ে তিনশত ব্যপারী রয়েছেন। মিঃ হক জানিয়েছেন, সুজানগর বাজারে নতুনের তুলনায় পুরোনো দেশি পেঁয়াজের দাম এখনো বেশি।

নতুন পেঁয়াজ পাইকারি প্রতি কেজি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু পুরোনো দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১৭৫ থেকে ২১০ টাকায়।

( বিবিসি বাংলা)