বিশ্ব ঐতিহ্য বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন ঘুরে আসুন জীববৈচিত্র্য উপভোগ করতে

0
376
শেখ সাইফুল ইসলাম কবির: বিশ্ব ঐতিহ্য একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য উপভোগ করতে বছরজুড়েই পর্যটকদের আসা-যাওয়া থাকে। তবে, শীতের মৌসুমে বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপ সাগরের অববাহিকায় গড়ে ওঠা এলাকায় পর্যটকদের ভিড় বাড়তে থাকে।সমুদ্র, পাহাড় বা চা বাগান তো অনেক দেখা হলো। ভাবছেন এবারের শীতের ছুটি কিভাবে কাটানো যায়? ঘুরে আসতে পারেন প্রাকৃতিক রহস্যেঘেরা সুন্দরবন।
উপভোগ করে আসতে পারেন বানরের চিৎকার-চেঁচামেচি, হরেক পাখির দল, ময়ূরের কেকা ধ্বনি, অপরূপ চিত্রল হরিণের দল, বন মোরগের ডাক, কুমির, হরিয়াল, গাছের সঙ্গে পেঁচিয়ে থাকা অজগর, মৌমাছির গুঞ্জন ও বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গর্জন। এছাড়াও সেখানে রয়েছে ৩শ’ ৩০ প্রজাতির গাছ, ২শ’ ৭০ প্রজাতির পাখি, ১৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪২ প্রজাতির বন্য প্রাণী ও ৩২ প্রজাতির চিংড়িসহ ২শ’ ১০ প্রজাতির মাছ। সুন্দরবনের এসব নয়নকারা দৃশ্যের কারণেই বর্তমানে পর্যটকরা আকৃষ্ট হচ্ছে সেখানে যেতে।
আগের তুলনায় বর্তমানে সুন্দরবনে পর্যটকদের সংখ্যাও বেড়ে গেছে বহুগুণে।এখন আর টেলিভিশনের পর্দায় নয় চাইলে বাস্তবেই ঘুরে আসতে পারেন প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন থেকে। কিন্তু অনেকে মনে করে সুন্দরবন ঘুরতে যাওয়া বেশ বিপদজনক। কিন্তু এখন আপনি চাইলেই নিরাপদে ঘুরে আসতে পারেন সুন্দরবন। এক্ষেত্রে আপনি কোনো ট্যুর কোম্পানি অথবা অভিজ্ঞ ট্যুর গাইডের সাহায্য নিতে পারেন। প্রতিবছরই সুন্দরবন ভ্রমণের সবচে’ উত্তম সময় হলো অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত। পর্যটকদের চাপ সামলাতে সুন্দরবনে এরই মধ্যে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি ট্যুরিজম সেন্টার।

অন্যান্য দর্শনীয়স্থানগুলোর চেয়ে সুন্দরবন ভ্রমণ একটু আলাদা। তাই সুন্দরবন ভ্রমণের আগে জেনে নিন, কখন যাবেন, কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন বা কাদের সাথে যাবেন। ভ্রমণপিপাসু পাঠকদের কথা ভেবে সুন্দরবন ভ্রমণের খুঁটিনাটি তুলে ধরা হলো-

কী দেখতে যাবেন

সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল হরিণ, বন্যশূকর, বানর, কুমির, ডলফিন, কচ্ছপ, উদবিড়াল, মেছোবিড়াল ও বন বিড়ালসহ রয়েছে ৩৭৫ এর অধিক প্রজাতির বন্যপ্রাণী। সেইসাথে সুন্দরবনজুড়ে জালের মতো জড়িয়ে থাকা ৪৫০টি ছোট বড় নদী-খাল ভ্রমণের অপার সুযোগ পাবেন ভ্রমণপিপাসুরা।

সুন্দরবনের পর্যটন স্থান

বাংলাদেশের বণ্যপ্রাণীর বৃহত্তম আবাসস্থল সুন্দরবনজুড়েই পর্যটকদের জন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার অপার সুযোগ রয়েছে। তবে, এরমধ্যে শরণখোলার টাইগার পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত কটকা, কচিখালীর অভয়ারণ্যকেন্দ্র, করমজল বন্যপ্রাণী ও কুমির প্রজননকেন্দ্র, কলাগাছিয়ায় ইকোট্যরিজম সেন্টার, হিরণপয়েন্ট খ্যাত নীলকমল অভয়ারণ্য, দুবলারচর, মানিকখালী, আন্দারমানিক ও দোবেকী এলাকায় পর্যাটকদের আনাগোনা বেশি থাকে।

থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা

সুন্দরবনের ভেতরে পর্যটকদের থাকা ও খাওয়ার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। পর্যটকদের সুন্দরবনে রাত্রিযাপন করতে চাইলে তাদের বহনকারী নৌযানেই ব্যবস্থা করতে হয়। তবে আগে থেকে যোগাযোগ করে গেলে সুন্দরবনের ভেতরে থাকা বিশ্রামাগারেও অবকাশ যাপনের সুযোগ করে নিতে পারেন।

সুন্দরবন ভ্রমণে খরচ

ট্যুর কোম্পানির মাধ্যমে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় তিন দিন-দুইরাত সুন্দরবন ভ্রমণ করা যায়। ট্যুর কোম্পানির মাধ্যমে যেসব পর্যটক সুন্দবন ভ্রমণ করতে চান তারা সাধারণত বাগেরহাট অথবা খুলনায় আসার পর পর্যটক বহরে যুক্ত হন। ভ্রমণকারীদের অনেকে আবার ট্যুর কোম্পানি ছাড়া নিজেরা নৌযান ভাড়া নিয়ে সুন্দরবন ভ্রমণ করেন।

কিভাবে যাবেন সুন্দরবনে

রাজধানী ঢাকা থেকে সরাসরি সুন্দরবনে যাওয়ার সুযোগ নেই। সুন্দরবন ঘুরতে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে বাসে এবং লঞ্চে করে বাগেরহাটে যেতে হবে। ঢাকা থেকে এসি ও ননএসি দুই ধরনের বাস চলাচল করে। সেক্ষেত্রে নন-এসি বাসের ভাড়া পড়বে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। ঢাকা থেকে সড়ক পথে বাগেরহাটে পৌঁছাতে সময় লাগে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। বাগেরহাটে থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার সড়ক পথে পাড়ি দিয়ে যেতে হবে মোংলা। মোংলা থেকে নৌযানে করে কিছুদূর যাওয়ার পরেই সুন্দরবনের দেখা মিলবে।

সুন্দরবনের ভ্রমণের কোথায় কত ফি দিতে হবে

সুন্দরবনের ভ্রমণ নীতিমালা অনুযায়ী অভয়ারণ্য ছাড়া জনপ্রতি প্রতিদিন দেশি পর্যটকদের ফি দিতে হবে ৭০ টাকা, অপ্রাপ্ত বয়স্কদের (১২ বছরের নিচে) ১৫ টাকা ও বিদেশিদের জন্য এক হাজার টাকা। অন্যদিকে, অভয়ারণ্য এলাকায় ভ্রমণের জন্য দেশি পর্যটকদের ১৫০ টাকা, বিদেশি পর্যটকদের এক হাজার ৫০০ টাকা, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ৩০ টাকা এবং অপ্রাপ্তদের ১০ টাকা ফি দিতে হবে।

আর শুধু করমজল এলাকা ভ্রমণে দেশি পর্যটকদের ২০ টাকা, বিদেশিদের ৩০০ টাকা, অপ্রাপ্তদের ১০ টাকা, দেশি গবেষক দের ৪০ টাকা ও বিদেশি গবেষদের জন্য ৫০০ টাকা ফি দিতে হয়। সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য নিবন্ধনকৃত নৌযানের বিভিন্ন রকমের প্রবেশ ফি দিতে হয়। ১০০ ফুটের ঊর্ধ্বে লঞ্চ হলে এক হাজার টাকা, ৫০ ফুটের ওপরে ১০০ ফুটের নিচে ৮০০ টাকা, ৫০ ফুটের নিচে ৫০০ টাকা, ট্রলার ৩০০ টাকা, দেশি নৌকা ১০০ টাকা, স্পিডবোট দুই হাজার টাকা। স্পিডবোট (মাদার ভেসেলের সাথে) ৫০০ টাকা, জালিবোট (ট্যুরিস্টবোট) ২০০ টাকা।
এসব ফি’র সাথে ভ্যাট দিতে হবে পর্যটকদের। প্রতিদিনের জন্য লঞ্চের অবস্থান ফি ৩০০ টাকা। প্রতিটি নৌযানে বন বিভাগের পক্ষ থেকে দুইজন করে প্রহরী দেওয়া হয়।সুন্দরবনে রয়েছে বেশ কিছু মনোমুগ্ধকর জায়গা। এর মধ্যে রয়েছে হিরণ পয়েন্ট, দুবলার চর, শরণখোলা, ছালকাটা, টাইগার পয়েন্ট টাওয়ার, টাইগার পয়েন্ট সি বিচ, জামতলা সি বিচ, সাত নদীর মুখ, কালীরচর উল্লেখযোগ্য।

হিরনপয়েন্ট যার প্রকৃত নাম নীলকমল। এখানে রয়েছে বন বিভাগের সুন্দর অফিস, মিঠাপানির পুকুর ও পুকুরপাড়ের পাশেই ওয়াচ টাওয়ার। বনবিভাগের অফিসটি ঘুরে ফিরে দেখার জন্য বেশ ভালো। এছাড়া ঘুরে দেখতে পারেন সুন্দরবনের ভেতরটি। যেখানে দেখতে পাবেন ম্যানগ্রোভের সারি। এ সময় আপনার সঙ্গে অবশ্যই ট্যুর গাইড বা গাদাবন্দুকধারী বনরক্ষী নিয়ে যেতে হবে। এ পথ কাদামাটিযুক্ত পিচ্ছিল, তাই সবাইকে দল বেঁধে চলতে হবে। তা না হলে পথ হারিয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে। এছাড়া ট্যুর গাইড বা বনরক্ষীরা পথ চলতে চলতে পাতা ছিড়ে ফেলে রেখে যায় যাতে পথ হারিয়ে না যায়। এসব ট্যুর গাইড বা বনরক্ষীদের কাছ থেকে সুন্দরবনের ভেতরের জগত সম্পর্কে নানা বিস্মকর তথ্য পেতে পারেন।

সুন্দরবনে যাবেন আর বাঘ দেখবেন না তা কি করে হয়। সুন্দরবনের মূল আকর্ষণ হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার। কিন্তু সুন্দরবনে গিয়ে বাঘ দেখেন আর নাই দেখেন বাঘের পায়ের ছাপ অবশ্যই দেখবেন। এ পায়ের ছাপ দেখে মনে হবে যেন বাঘ এই কিছুক্ষণ আগেই এ পথ পাড়ি দিয়েছে। এ সদ্য ছেড়ে যাওয়া বাঘের পায়ের ছাপের ছবিও তুলে আনতে পারেন। তবে সুন্দরবন ভ্রমণে গিয়ে বাঘের দেখা না পেলেও আফসোস করার কিছুই নেই কারণ আপনার মনের আর হাতের ক্যামেরার মেমোরি কার্ড কিন্তু বোঝাই হয়ে যাবে বিশেষ মুহুর্তগুলোর ছবিতে।

এছাড়াও ঘুরে আসতে পারেন দুবলার চরে। বঙ্গোপসাগরের এ দ্বীপটি পরিচিত শুটকিপিল্লি হিসেবে। প্রতি বছরই বিভিন্ন স্থান থেকে জেলেরা মাছ ধরার মৌসুমে এ দ্বীপে অস্থায়ী ঘরবাড়ি তৈরি করে সাগর থেকে বিপুল পরিমাণ মাছ ধরে এবং তা থেকে শুটকি বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে। এছাড়াও দুবলারচরে প্রতি বছরই কার্তিক মাসে রাসপূর্ণিমায় ‘রাসমেলা’ বসে। এ রাস মেলা হিন্দুদের পূণ্যস্নান উপলক্ষে বসে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস রাসমেলা হচ্ছে ‘রাধা-কৃষ্ণের মিলন উৎসব’।

তবে সুন্দরবন ভ্রমণকালে আপনাকে যেসব জিনিস অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে তা হলো, বিশুদ্ধ পানির বোতল, প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ফাস্ট এইড বক্স, এক জোড়া কেডস, ক্যামেরা, রেডিও, প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র।

যেভাবে যাবেন : সুন্দরবন যেতে হলে ঢাকা থেকে সরাসরি চেয়ার কোচে মংলা বন্দরের পর্যটন ঘাটে পৌঁছে যেতে পারেন।সেখান থেকে চেয়ার কোচ বা ট্রেনে খুলনা গিয়ে কোন আবাসিক হোটেলে রাত কাটাতে পারেন। পর দিন খুলনা জেলখানাঘাট থেকে লঞ্চে চলে যেতে পারেন সুন্দরবনে।সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে প্রবেশ চাইলে খুলনা কিংবা মংলা থেকে নৌপথে যেতে হবে।মংলার কাছাকাছিই ঢাইনমারীতে রয়েছে বনবিভাগের কার্যালয়।

সেখানেই সুন্দরবনে প্রবেশের আনুষ্ঠানিকতা বা বিধিমালা শেষ করতে হবে।সাধারণ পর্যটকদের জন্য জনপ্রতি ৫০ টাকা, বিদেশি পর্যটকদের জন্য ৭শ’ টাকা।এছাড়া লঞ্চ ভারা ২৫শ’টাকা কিন্তু ছোট লঞ্চের জন্য প্রবেশ ফি কিছুটা কম।পর্যটকদের সাঙ্গে ভিডিও বা ক্যামেরা থাকলে অতিরিক্ত ১শ’ টাকা দিতে হবে বন বিভাগকে। তবে এসব ঝামেলাপূর্ণ কাজ পর্যটকদের করতে হয় না। ট্যুরিজমলিমিটেডের লোকজনই আনুষঙ্গিকতা সেরে নেবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here