চাঁপাইনবাবগঞ্জে তারা বেগমের স্বপ্ন বালু স্তূপের নিচে!

0
98

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ॥ চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চককীর্তি ইউনিয়নের রানিবাড়ি-চাঁদপুর চরকতলা চরেই তারা বেগমের স্বপ্ন ঢাকা পড়েছে মহানন্দা নদীর বালুর স্তূপে! মহানন্দা নদী ড্রেজিংয়ের বালুর নিচে তারা বেগমের সব ফসল।

এছাড়াও জমির ফসল ঘরে তুলতে না পেরে মানষিক অত্যাচারে রয়েছেন চরের কৃষকার। দুষছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ কর্তৃপক্ষককে। ক্ষতিপুরনের দাবী ক্ষতিগ্রস্থ তারা বেগমসহ অন্যান্য কৃষকদের।

প্রতিবন্ধী স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে তারা বেগম দিন-রাত পরিশ্রম করে সাড়ে তিন বিঘা জমিতে ধান চাষাবাদ করেছিলেন। শ্রমিকের মজুরির টাকা বাঁচাতে নিজেই কাদাপানিতে নেমে কাজ করেছেন। স্বামীকে নিয়ে রাত কাটিয়েছেন জমির পাশের কুঁড়েঘরে। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে ধার-দেনা করে স্বপ্ন ছিল ফসল ঘরে তুলে শোধ করবেন ঋণের টাকা। কিন্তু তা আর হলো না।

তারা বেগমের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার নয়াদিয়াড়ী গ্রামে। বালু ভরাটের সময় তার আর্তনাত দেখে তার পাশে দাঁড়ায় গ্রামবাসী। সবাই মিলে ইউপি চেয়ারম্যান-সদস্যকে নিয়ে মহানন্দা নদীতে ড্রেজিং করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ লিমিটেডের কর্মকর্তাদের কাছে যান।

কিন্তু তারা ফসলের ওপরেই বালু ফেলার কাজ চালিয়ে যান। এমনকি গ্রামবাসী পাইপ দিয়ে ফসলি জমি বাদ দিয়ে ফাঁকা জায়গায় বালু ফেলার অনুরোধেও মন গলেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা নদীতে ৩৬ কিলোমিটার ড্রেজিং করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

এর মধ্যে রানিবাড়ি-চাঁদপুর গুজরঘাট থেকে মল্লিকপুর ঘাট পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার নদী ড্রেজিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, ফসল না ওঠা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হোক ফসলি জমিতে বালু ফেলা। এমনকি পাইপ দিয়ে ফাঁকা বা পতিত জায়গায় বালু ফেলার দাবি স্থানীয়দের। শুধু তারা বেগমের একার নয়, আরও অনেকের ধান, গম, ভুট্টার জমিতে বালু ফেলা হয়েছে।

আর মাত্র ১০ দিন সময় পেলে চাষিরা ঘরে তুলতে পারতেন গম। ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে কাটতে পারতেন ভুট্টা। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, রানিবাড়ি চাঁদপুর চড়কতলা গ্রামের কিছু অসাধু বালু ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগসাজশে ফসলের ওপরেই বালু ফেলছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এসব বালু দিয়ে তারা ব্যবসা করবেন। অথচ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক।

শিবগঞ্জের চককীর্তি ইউনিয়নের রানিবাড়ি-চাঁদপুর গ্রামের কৃষক সাইরুল ইসলাম জানান, ভুট্টার প্রতিটি গাছে দুইটা তিনটা করে মোচা এসেছে। আর ১০ দিন হলেই ঘরে তুলত পারতাম। সেই হওয়া ফসলের ওপর বালু দিয়েছে। কোনো মানা, অনুরোধ শোনেনি তারা। এগুলো সরকারি খাসজমিও নয়। তারপরও বালু ফেলছে। এমনকি এর কোনো ক্ষতিপূরণও দেবে না।

সরকার কি আমাদের ওপর এমন অত্যাচার করবে? কৃষক মো. আলমগীর বলেন, কয়েক দিন আগে থেকে তারা খাসজমিতে নদী ড্রেজিংয়ের বালু ফেলছে। তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এগুলো বন্দবস্ত করা এবং রেকর্ডের জমি। বর্গা নিয়ে আমরা এসব জমি চাষাবাদ করি।

কয়েক দিন আগে আমার দুই বিঘা ভুট্টা নষ্ট হয়েছে। এখন আবার দুই বিঘা ধানের ওপর বালু ফেলবে। আমরা নদী ড্রেজিংয়ের বিপক্ষে নই। কৃষকদের জমির ওপরে কেন ফাঁকা জায়গা থাকতে? আমরা হাতে-পায়ে ধরছি, অনুরোধ করছি। কিন্তু তারা শুনছে না।

চককীর্তি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রবিউল ইসলাম জানান, কোনোরকম নোটিশ বা নির্দেশনা ছাড়াই কৃষকদের ফসলের ওপর বালু ফেলা হচ্ছে। এতে তারা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পাইপের সংযোগ দিয়ে পতিত বা ফাঁকা জায়গায় বালু ফেলতে অনুরোধ করলেও তারা শুনছে না। সরকারের কাছে এলাকার অসহায়, দরিদ্র কৃষকদের অবস্থা বিবেচনায় ফসলের ওপর বালু না ফেলার অনুরোধ জানাই।

তবে এ বিষয়ে কথা বলতে মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করলেও ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাকিব-আল-রাব্বী মুঠোফোনে বলেন, বিষয়টি আমি জানি না। এখন পর্যন্ত কেউ কোনো অভিযোগ করেনি।

যেহেতু এটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিষয়, তাই কৃষকদের তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ লিমিটেডের প্রতিনিধি খেলাফত আলী জানান, বালু ফেলার আগে কৃষকদের নোটিশ বা জানানোর বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ। আমরা নদী ড্রেজিং করে নদীর পাশে যেখানে জায়গা পাব, সেখানেই বালু ফেলব।

জেলা প্রশাসক এ কে এম গালিভ খান জানান, নদীর পাশে সরকারি খাসজমিতে বালু ফেলতে পারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে ফসল উঠিয়ে নেওয়ার পর বালু ফেলা উত্তম। বিষয়টি নিয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here