Monday, October 26, 2020
Home আন্তর্জাতিক দোহায় আফগান ও তালেবান শান্তি আলোচনায় এক নারী সাংবাদিক

দোহায় আফগান ও তালেবান শান্তি আলোচনায় এক নারী সাংবাদিক

আফগানিস্তানের তালেবান গোষ্ঠী নারীর বিরুদ্ধে যে কঠোর বৈষম্যমূলক আচরণ করেছিল, তা সবার জানা। শান্তি আলোচনার সময় একজন নারী সাংবাদিক যখন সেই গোষ্ঠীর কিছু পুরুষের মুখোমুখি হচ্ছেন তাদের সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য, তখন ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াচ্ছে?

কাতারের দোহায় এখন তালেবান এবং আফগান সরকারের মধ্যে যে ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা চলছে, সেটির খবর সংগ্রহ করতে গেছেন বিবিসির পশতু বিভাগের শাজিয়া হায়া ।

“আমি খুনি নই, কিন্তু আমাকে আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে একজন খুনি হিসেবে। আমি রাজনীতি নিয়ে কথা বলবো না। বরং আপনাদের সবার সঙ্গে বসার জন্য একটা সময় ঠিক করা যাক। আমরা একসঙ্গে চা খাব এবং আমি আপনাদের কিছু কবিতা শোনাবো।”

কথাগুলো তিনি বললেন নরমভাবে, তার মুখে মৃদু হাসি। তালেবানের খুব গুরত্বপূর্ণ একজন নেতা এভাবে কথা বলবেন, সেটা আমি আশা করিনি। কাতারের দোহায় জঙ্গিদের সঙ্গে আফগান সরকারের ঐতিহাসিক আলোচনার শেষ দিনে আমি তার দিকে এগিয়ে গিয়েছিলাম একটা সাক্ষাৎকারের অনুরোধ নিয়ে।

আমি তখন বিমানবন্দরের দিকে রওনা দেব। তখন হোটেলের লবিতে দেখলাম তালেবান প্রতিনিধিদলের কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের ঘিরে রেখেছে রিপোর্টার রা। একটা চমৎকার প্রতিবেদন লেখার জন্য তার কাছ থেকে দারুণ কোন তথ্য পাওয়ার এটাই শেষ সুযোগ।

কিন্তু তিনি তো কবিতা নিয়ে কথা বলতে দোহায় আসেন নি। আমিও না। রুদ্ধদ্বার আলোচনার খবর সংগ্রহ করা সবসময় কঠিন। আমাদের জন্য শুরুটা মোটেই আশাব্যঞ্জক ছিল না। দোহার শেরাটন হোটেলটা দাঁড়িয়ে আছে একেবারে সাগরের তীরে। যখন প্রথম এই হোটেলে এলাম, তখনই চোখে পড়লো তালেবান নেতারা ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

আমি আমার ব্যাগটা মেঝেতে রেখে তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম তক্ষুনি একটা সাক্ষাৎকারের অনুরোধ নিয়ে। অনেক সময় যদি কাউকে অপ্রস্তত অবস্থায় ধরতে পারেন, তাদের কাছ থেকে কথা বের করা যায়। খুব সতর্কভাবে লেখা কোন প্রেসবিজ্ঞপ্তির চেয়ে বরং এভাবেই একমাত্র পাওয়া যেতে পারে আপনার প্রতিবেদনে ব্যবহারযোগ্য কোন উদ্ধৃতি।

“আমি কথা বলবো না,” তালেবানের এই নেতা সাথে সাথে বললেন। আমি যখন আসলে তার দিকে ক্যামেরা হাতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, তিনি আমাকে আশা করছিলেন না।

আমি তার অস্বস্তি বুঝতে পারছিলাম এবং সাথে সাথেই একটু পিছিয়ে এলাম। আমি হাসিমুখে তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বললাম সাক্ষাৎকার নেবেন আমার পুরুষ সহকর্মী। আমি সেখানে থাকবো ক্যামেরা ধরার জন্য। দোহায় আমার কাজটা কথা কঠিন হতে যাচ্ছে, সেটা দ্রুতই আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।

শেষ পর্যন্ত আমি অবশ্য কথা বলতে অনিচ্ছুক ঐ তালেবান নেতার সাক্ষাৎকার নিতে পেরেছিলাম। কিন্তু সাক্ষাৎকারের পুরোটা সময় আমি খেয়াল করলাম, তিনি এবং তার প্রতিনিধিদলের অন্য তালেবান নেতারা আমার চোখে চোখ রাখছেন না। এটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল যে তারা পুরুষদের সঙ্গে কথা বলার সময় যতটা সহজ, মেয়েদের বেলায় মোটেই তা নন। এরা বিশ্বাস করে, একজন অপরিচিত নারীর চোখে রাখা মানে তাকে অশ্রদ্ধা করা। তাদের দৃষ্টিতে এটা পাপ।

আমি পুরো তিন মিনিট সময় ধরে একজন তালেবান নেতার সাক্ষাৎকার নিলাম কিন্তু তিনি একবারও আমার দিকে তাকালেন না। আমি সত্যিই বিশ্বাস করি তিনি যদি ভবিষ্যতে আমাকে দেখেন, তিনি মনেই করতে পারবেন না যে আমাকে তিনি একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন।

কিন্তু এসবের কিছুতেই আমি অবাক হইনি। যে গোষ্ঠীটি বহু বছর ধরে লুকিয়ে ছিল, লড়াই করছিল- তাদেরকে চোখের সামনে দেখা, নানা প্রশ্নের মুখোমুখি করা, সেটাও কয়েকমাস আগে অকল্পনীয় ছিল। কাজেই আমি আরও অনেক অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্য তৈরি ছিলাম।

আফগান সরকার এবং তালেবান নেতৃত্ব বহু মাস ধরে আলোচনা চালিয়েছে এরকম একটি মুখোমুখি বৈঠকের জন্য। তাদের আলোচনা কখনো এগিয়েছে, কখনো পিছিয়ে ছে। শেষ পর্যন্ত এই বৈঠক কখন, কোথায় হবে, সে ব্যাপারে তারা একমত হয়েছে। তখন আরও অনেক আফগান সাংবাদিকের মতো আমারও মনে হয়েছে, এই ঐতিহাসিক ঘটনার খবর সংগ্রহ করতে যাওয়া আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বহু দশকের রক্তপাত এবং খুনোখুনির পর দুই পক্ষ শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে এই যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে রাজী হয়। আমাদের চোখের সামনেই উন্মোচিত হচ্ছিল এক নতুন ইতিহাস।

দ’হাজার দুই সাল থেকে আমি অনেক ঘটনা, অনেক পরিবর্তন দেখেছি। তালেবানের পতনের পর এক নতুন আফগানিস্তান তখন যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু নতুন সরকার কে সাথে সাথেই আবার তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করতে হলো। কিন্তু ১৮ বছর পর দুই চরম শত্রুপক্ষ সমঝোতার জন্য আলোচনার টেবিলে মুখোমুখি।

দোহার উদ্দেশে কাবুল থেকে যখন বিমান ছাড়লো, আমি এই ঐতিহাসিক ঘটনার নানা দিক নিয়ে ভাবছিলাম। নারী অধিকার থেকে নারী স্বাধীনতার ভাগ্য, আফগানিস্তানের সংবিধান থেকে শুরু করে দুই পক্ষের আলোচনার বিষয়।

কীভাবে এই আলোচনার খবর সংগ্রহ করবো, সেটা নিয়ে আমি ভাবছিলাম। কার সাক্ষাৎকার নেব, কী প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবো এসবের পাশাপাশি একটি বিষয়ও আমার ভাবনায় এলো। আমি কী পোষাক পরবো? নিজেকে প্রশ্ন করলাম আমি। এটি আমার কোন অহমিকার ব্যাপার নয়। অনেক পুরুষ সহকর্মীর বেলায় এরকম প্রশ্ন হয়তো তাদের মাথাতেই আসবে না।

কিন্তু নারী স্বাধীনতা এবং অধিকারের ব্যাপারে তালেবানের যে কঠোর নিয়ম-কানুন, সেজন্যে একজন নারী সাংবাদিক হিসেবে আমাকে আমার পোশাক নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। যদিও আমার মাথা হতে পা পর্যন্ত পোশাকে আবৃত। কাবুলের রাস্তায় যে পোশাক পরে মেয়েরা প্রতিদিন অফিসে যান, যে পোশাক নিয়ে তাদের দ্বিতীয়বার ভাবতে হয় না, আমার পরনে সেরকম পোশাকই।

আমি এখানে এসেছি তালেবানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতাদের সাক্ষাৎকার নিতে। যে তিনদিন আমি এখানে থাকবো, তাদের সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।এখন আমি এখানে যে পোশাকে এসেছি, ১৮ বছর আগে এই পোশাকে আমার পক্ষে রাস্তায় হাঁটা সম্ভব ছিল না।

তখন আফগানিস্তানে তালেবান মেয়েদের পোশাকের ব্যাপারে যে কঠোর বিধান চালু করেছিল, তাতে নীল চাদর (হিজাবের মতো একটি পোশাক যা নারীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত আবৃত করে রাখে) পরা বাধ্যতামূলক ছিল। যারা এটি পরতো না, তাদের তালেবান কঠোর সাজা দিত। (বিবিসি বাংলা)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

করোনাভাইরাস: দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ২৩ জনের মৃত্যু

দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে। এই সময়ে নতুন করে আরও ১৩০৮ জন কোভিড-১৯ রোগী...

বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়ীতে প্রেমিকার অনশন হয় বিয়ে, না হয় আত্মহত্যা!

তারেক জাহিদ, ঝিনাইদহ- ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের চরপাড়া গ্রামে বিয়ের দাবিতে প্রেমিক রাশেদ মন্ডল(৩০) এর বাড়িতে ৫ দিন ধরে অনশনে থাকার পর অবশেষে...

দু’দিনের বর্ষণে বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি !

স্টাফ রিপোর্টার, ঝিনাইদহঃ ঝিনাইদহ জেলায় দু দিনের বর্ষণে বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শীতকালীন শাক সবজির। ফুলকপি, বাধাকপি, সিম, বেগুন, বরবটির...

৭০ বছরের প্রতিবন্ধি বৃদ্ধাকে ধর্ষন চেষ্টায় মতি ফকির !

স্টাফ রিপোর্টার, ঝিনাইদহঃ ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার গোপিনাথপুর গ্রামে ৭০ বছরের এক প্রতি বন্ধি বৃদ্ধাকে ধর্ষনের চেষ্টা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ তদন্তে শুক্রবার...

Recent Comments