ইতিহাসের পাতা থেকে:  মুজিব নগর সরকারের শপথ গ্রহণ !

0
188

১০ এপ্রিল আগরতলা বৈঠকের সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেয়া হয়। খবরটি প্রচারে তখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ভারতীয় সংবাদসংস্থা পিটিআই’র আগরতলা প্রতিনিধি অনিল ভট্টা-চার্যের। তার আগরতলার বাসভবনটি তখন ভারতে আশ্রয় নেয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামরিকনেতৃ- বৃন্দ, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের কাছে একরকম প্রেসক্লাব হয়ে গিয়েছিল ! আগরতলা বৈঠকে সরকার গঠণের সিদ্ধান্ত হলেও কৌশলগত কারণে শপথ অনুষ্ঠানের দিন ও স্থানটি গোপন রাখা হয়।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, চুয়াডাঙ্গা শহরে প্রবাসী সরকারের শপথ হবে। কিন্তু চুয়াডাঙ্গার তৎকালীন – আওয়ামী লীগ নেতা ডাঃ আসাবুল হক (হ্যাবা ডাক্তার) কথাচ্ছলে এক বিদেশী সাংবাদিককে তথ্যটি জানিয়ে দিলে তাৎক্ষনীক ভাবেই পাকিস্তানি বাহিনী চুয়াডাঙ্গা দখল করে নেয়। এরপর সিদ্ধান্ত হয় মেহেরপুরের বৈদ্যেরনাথতলার স্থানটির।

চুয়াডাঙ্গা আওয়ামী লীগ নেতা এ্যাডভোকেট ইউনুস আলীসহ আরও কয়েকজন অনুষ্ঠানের আয়োজন প্রস্তুতির দায়িত্ব পান। অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়ে পদে পদে দেখা দেয় নানান বিপত্তি! শপথ গ্রহন অনুষ্ঠানে আগত জনসাধারনের সিংভাগই ছিল এতিম ও অসহায় লোকজন। গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে জোগাড় করা হয় চেয়ার! এই চেয়ার গুলোর কোনটির ছিল হাতল; কোনটির ভাঙ্গা পা! যেগুলোর পা ভাঙ্গা সেগুলোর নিচে ইটের সাপোর্ট দিয়ে কোন মতে দাড়া করে রাখা হয়।

মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের ‘গার্ড অব অনার’  দিতে জোগাড় করা হয় কয়েকজন ‘আনসার ও ‘গ্রাম পুলিশের সদস্য! কিন্তু নতুন দেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা গাইতে জানেন এমন কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না! পরিশেষে জানা যায় সীমান্তের ওপারে কৃষ্ণনগরে একটি মেয়ে আছে যে আমার সোনার বাংলা গাইতে জানে।

অতএব লোক পাঠিয়ে কৃষ্ণনগর স্কুলের ক্লাস এইটের ছাত্রী মেয়েটিকে তার অভিভাবকসহ নিয়ে আসা হয়। এভাবে অনুষ্ঠান সাজাতে অনেক জোড়াতালির ব্যবস্থা করা হয়। ১৬ এপ্রিল বিকেলে কলকাতা প্রেসক্লাবে যান ‘ব্যারিষ্টার আমির উল ইসলাম। সাংবাদিকদের বলেন, ১৭ এপ্রিল সকালে বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্ব পূর্ণ একটি অনুষ্ঠান হবে।

সাংবাদিকরা যারা যেতে চান তারা যেন ভোরবেলা প্রেসক্লাবে থাকেন। এখান থেকে গাড়িতে করে তাদের অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু কোথায় অনুষ্ঠান, কিসের অনুষ্ঠান সে জবাব না দিয়েই ঝড়ের বেগে সেখান থেকে বেরিয়ে চলে যান ব্যারিষ্টার আমির উল ইসলাম! কিন্তু খবরটি কলকাতার মিডিয়া পাড়ায় মূহুর্তে চাউর হয়ে যেতে সময় লাগেনি! সকালে যদি আবার গাড়ি মিস হয় সে আশংকায় অনেকে রাত কাটান প্রেসক্লাবে!

১৭ এপ্রিল সকাল যথারীতি প্রেসক্লাবে আসেন ব্যারিষ্টার আমির উল ইসলাম। তার সঙ্গে আরও কয়েকটি গাড়ি। কোথায় যাচ্ছি কেন যাচ্ছি এমন একশ প্রশ্ন সবার। কিন্তু আমির উল ইসলাম এর কিছুরই জবাব না দিয়ে সবাইকে গাড়িতে উঠতে অনুরোধ করেন। যে কয়েকটি গাড়ি এসেছে সাংবাদিক তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। কিন্তু কারও এ নিয়ে কথা তোলার সময় নেই। যে যেভাবে পেরেছেন গাদাগাদি করে চড়েন গাড়িতে! গাড়ির বহর চলতে থাকে বাংলাদেশ সীমান্তের উদ্দেশে।

এদিকে মেহেরপুরের বৈদ্যরনাথ তলায় চলে আরেকটি পর্ব। বিদেশি সাংবাদিকরা আসার আধাঘন্টা আগে সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দিন সহ নেতৃবৃন্দ সেখানে পৌঁছেন। অনুষ্ঠানস্থলের কিছুদূর একটি ঝোপের মতো এলাকায় একটি ইপিআর ক্যাম্প। নেতৃবৃন্দকে সেই ইপিআর ক্যাম্পে নিয়ে বসিয়ে রাখা হয়।

সে কারনে বিদেশি সাংবাদিকরা অনুষ্ঠানস্থলে এসে দেখেন বাংলাদেশের নেতারা বাংলাদেশের ভিতর থেকে অনুষ্ঠানস্থলে আসছেন! অনুষ্ঠান শেষে নেতারা আবার হেঁটে হেঁটে চলে যান সেই ইপিআর ক্যাম্প! বিদেশি সাংবাদিকরা দেখেন বাংলাদেশের নেতারা আবার চলে যাচ্ছেন বাংলাদেশের ভিতরে! বিদেশি সাংবাদিকরা চলে যাবার আধাঘন্টা পর শপথ নেয়া নেতারারাও আবার চলে যান ভারতে।

এ ব্যাপারে অনুষ্ঠান সংগঠকদের অন্যতম এ্যাডভোকেট ইউনুস আলী এই প্রতিবেদককে বলেছেন, যুদ্ধে অনেক কৌশলগত অবস্থান নিতে হয়। তখন বিদেশি সাংবাদিকদের আস্থা অর্জনে কৌশলগত অভিনয়টি করা হয়েছে! শপথ নেয়া প্রবাসী সরকারের নেতারা ভারতে চলে যাবার আধাঘন্টার মধ্যে হানাদার পাকি-স্তানি বাহিনী পৌঁছে যায় মুজিবনগরে! তারা ক্রোধে লন্ডভন্ড করে দেয় গোটা এলাকা। কিন্তু তার আগেই বিশ্ব জেনে গেছে নতুন এক দেশ-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার খবর।

পাকিস্তানীদের বিরোদ্ধে মুক্তিযুদ্ধাদের সার্বিক সাহায্য করার জন্য ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী অস্থায়ীভাবে ছয়টি সেক্টর গঠন করে। এই সেক্টর গুলো হচ্চে যথা- ১. আলফা যার হেডকোয়াটার ছিল পশ্চিমবঙ্গের মুরথি ২. ব্রাভো সেক্টর যার হেডকোয়াটার রায়গঞ্জ, ৩. চার্লি হেডকোয়াটা বিহারের চাকুলিয়ায়, ৪. ডেল্টা হেডকোয়াটার ডেউটামুরা. ৫. ইকো আসামের মাসিপুর এবং ৬.ফক্রটর্ট যার হেডকোয়াটার মেঘালয়ের তুরাতে স্থাপন করা হয়।

প্রবাসী সরকারের তত্বাবধানে সর্বপ্রথম ১৯৭১ সালে ২৮ সেপ্টেম্বর বিমান বাহিনী গঠিত হয়। অত্যন্ত সংর্কীন পরিসরে মাত্র দুইটি ফ্রাইটার এবং দুটি হেলিক্পটার নিয়ে তাদের পত চলা শুরু হয়। পদ্মা এবং পলাশ নামের দুইটি গান বোট ও ৪৪ জন ফ্রান্স ফেরত বাঙ্গালী কমান্ডো নেভল সেনা নিয়ে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ নাগাদ গঠিত হয় নৌবাহিনী। সর্ব স্তরের দেশ প্রমিক বাঙ্গালী জনসাধানকে নিয়ে ভারতের সার্বিক সহযো-গিতায় ২১ নভেম্বর গঠিত হয় সশস্ত্রবাহিনী। সীমান্তবর্তী এলাকায় স্থাপন করা হয় সশস্ত্র ট্রেনিং সেন্টার ও পূর্নবাসন কেন্দ্র।

একথা সত্য যে, এই সংর্কীন পরিসরে সশস্ত্র বাহিনী গঠিত হলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যে ব্যাপকহারে মুক্তি-পাগল জনগন এতে যোগদান করতে থাকে এবং বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত ও প্রতিকূল অবস্থাকে ডিঙ্গিয়ে সীমান্তবর্তী ট্রেনিংসেন্টার গুলোতে ট্রেনিং নিয়ে বাংলার মুক্তির সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ে। মুক্তি  যুদ্ধে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লক্ষ লোক অংশ গ্রহন করে যার পাচঁভাগের চার ভাগই ছিল কৃষক বা কৃষক পরিবার সংশ্লিষ্ট।

১৯৭১ সালের ২১ শে নভেম্বর প্রবাসী সরকারের উদ্দ্যোগে গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী। ১৯৭১ সালের ৬ই নভেম্বর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ভাষনে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্ধিরা গান্ধী বলেন- ‘The cry Independence arose after sheik mujib was arrested and not before himself, so far as I know has not asked for Independence ever now. সমাজতান্ত্রিক ও পুজিঁবাদী দ্বন্দের কারনে পূর্বও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে এই ঘুর্নিভূত রাজনৈতিক অবস্থায় আমেরিকা পররাষ্ট্র বিষয়ে ‘এক আমেরিকা বহুনীতি গ্রহন করেন।

প্রেসিডেন্ট নিক্রনের নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্ঠা হেনরি কিসিঞ্জার চীনকে বুঝাতে সক্ষম হন যে, দক্ষিন এশিয়ায় সোভিয়েত প্রভাব বাড়তে দেওয়া হবে না। আবার পাকিস্তানকে আশস্ত করে যে, পূর্বপাকিস্তানের উপর তারা নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আমেরিকার কোন আপত্তি নাই। ভারতের সাথে আলোচনায় তিনি বলেন ‘পুর্বপাকিস্তান স্বাধীন হলে তাদের কোন লাভ হবে না; বরং বামপন্থিরা জয়ী হলে অচিরেই তারা ভারতে প্রবেশ করবে।

তা সত্যেও ১৯৭১ সালের ৯ আগষ্ট ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন ২০ বছর মেয়াদী মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষর করে।  চুক্তির ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ ছিল ‘দুই পক্ষের কেউ আক্রান্ত হলে অথবা আক্রান্ত হবার আশংঙ্খা দেখা দিলে সেই আশংঙ্খা নিশ্চিহৃ করার উদ্দেশ্যে উভয় পক্ষ অতিসত্বর আলোচনা করে সম্মিলিত ভাবে নিজেদের শক্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

এই চুক্তির আন্তর্জাতিক মূল্যমান, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অনূকূল যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ভারতীয় সেনা-বাহিনীর প্রস্তুস্তি পর্বের অগ্রগতি বিচার-বিশ্লেষণ করে ইন্দিরা গান্ধী অক্টোবর মাসের শুরুর দিকে এই মর্মে উপসংহারে উপনিত হন যে, বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য আসন্ন শুষ্ক মৌসুমের প্রারম্ভে ভারতীয় সেনাবাহিনী সর্র্বাত্মক যুদ্ধ চালালে তা হবে যথোপযুক্ত সময়। তাই আসন্ন সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য নিজ রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্ব প্রস্তস্তি সর্ম্পূন করে বিশ্বজনমত গঠনের লক্ষ্যে ২৪ অক্টোবর ১৯ দিনের এক লম্বা সফরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিম ইউরোপে যান।

(একথা সত্য যে, মার্কিন প্রশাসনের কিছু সিনেটর ও কংগ্রেসম্যান বাঙ্গালীদের পক্ষ নিয়ে পশ্চিমপাকিস্তানে অথনৈতিক ও সামরিক সাহায্য না পাঠাতে হাউসে গালাঘার আমেন্ডমেন্ট আইন পাশ করান কিন্তু প্রেসি-ডেন্ট নিকসন ও হেনরি কিসিহ্জারের বিরোধীতায় তা ব্যর্থ হয়ে যায়) স্বদেশে ফিরে এসে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ১৫ নভেম্বর কংগ্রেস দলের কার্যকারী সভায় ঘোষনা করেন ‘Bangladesh has come to stay, there is no power on the earth which can alter this position(the financial times November 16, 1971) এ সময় আন্তজার্তিক অঙ্গনে রাজনৈতিক সর্ম্পকের সমীকরনে নতুন মাত্র যোগ হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন নিজ নিজ স্বার্থর কারণে পরস্পরের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই দুই শক্তিধর রাষ্ট্রের সর্ম্পক উন্নয়নে মধ্যস্থতা করে পাকিস্তান। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে তাইওয়াকে বহিস্কার করে তদস্থলে ২৩ বছরের মার্কিন বিরোধীতার আবসান ঘটিয়ে ২৫ অক্টোবর জাতিসংঘের উভয় পরিষদে গনচীনকে সদস্য করা হয়। এ ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, পাকিস্তান সংহতি রক্ষায় বাংলাদেশের চীন ও আমেরিকা এক যোগে কাজ করবে।

আরব বিশ্বও সর্ববৃহৎ মুসলিমরাষ্ট্র পাকিস্তান ভাগ হয়ে যাওয়ার ব্যাপার মেনে নিতে চাননি। নভেম্বরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের অভ্যন্তরের যুদ্ধ পরিস্থিতি ভারতের সর্বাত্মক অনুকূলে হয়। একই সময়ে আর্ন্তজাতিক অঙ্গনের রাজনৈতিক চাপে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ার আগেই দ্রুত যুদ্ধাভি-যানের প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহনে ভারত উভয় সংকটে পড়ে।

ঠিক এই সময় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধা এবং সীমান্তে ভারতীয় ও বাংলাদেশী বাহিনীর মিলিত ও ক্রমবর্ধিত চাপে মিত্র রাষ্ট্র (আমেরিকা ও চীনের) হস্তক্ষেপের আশ্বাসে ৩ ডিসেম্বরে ভারতের সাথে যুদ্ধ ঘোষনা করে। ফলে আক্রমনকারী অপবাদ থেকে ভাতর রক্ষা পায়। মাকির্ন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিষয়ক উদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তান রক্ষায় বহুমূখী তৎপরতা শুরু করেন।

তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে ভারতকে আগ্রাসী রাষ্ট্র হিসাবে চিহিৃত করে চূড়ান্ত বিজয়ের আগেই যুদ্ধবিরতি কার্যকরের মাধ্যমে পাকিস্তানের পরাজয় ঠেকিয়ে রেখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন নস্যাৎ-এর চেষ্ঠা করে। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে দক্ষিন উপকূল থেকে সপ্তম নৌবহরের মাধ্যমে সরাসরি হস্তক্ষেপে করা এবং চীনের দ্বারা ভারতের উত্তর সীমান্তে আক্রমন চালানো চেষ্টা চলায়। ৩ ডিসেম্বর সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তান রক্ষায় হেনরি কিসিঞ্জার দুইটি সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন।

এক. বাংলাদেশে পাকিস্তানী বাহিনীর পরাজয়ের আগেই যুদ্ধ বিরতি এবং সৈন্য প্রত্যাহারে জাতিসংঘকে কাজে লাগান।

দুই. ১৯৫৯ সালে পাকিস্তান-মার্কিন প্রতিরক্ষা চুক্তির অজুহাতে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য বাংলাদেশের উপকূলে সপ্তম নৌবহর মোতায়ন করা। সপ্তম নৌবহর ব্যবহারে মার্কিনীরা পাকিস্তানকে দুইটি শর্তের কথা উল্লেখ করেন।

১. পুনার্ঙ্গ যুদ্ধ শুরু হবার পর কমপক্ষে তিন সাপ্তাহ নিজ শক্তিতে পাকিস্তানকে ঠিকে থাকতে হবে। উত্তর সীমান্তে চীনের যুগপৎ আক্রমন চালাতে হবে। ৩রা ডিসেম্বর ভারতের সাথে পাকিস্তানের যুদ্ধ ঘোষনার সাথে সাথে বাংলাদেশে-ভারতের যৌথ বাহিনীর অভিযান করে এবং বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগন সর্বত্র ভাবেই যৌথবাহিনীর সহযোগিতায় বিপুলভাবে এগিয়ে আসে। ফলে যৌথ বাহিনী অসামান্য গতি অর্জনে সক্ষম হয়।

এদিকে ৪ এবং ৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি এবং ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারে জন্য পর পর দুটি প্রস্তাব উস্থাপন করলে দুটি প্রস্তাবেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো প্রদান করে। ৬ ডিসেম্বর ভারত আনুষ্টনিক ভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। ৭ ডিসেম্বর যৌথবাহিনীর কাছে পাকিস্তানের শক্তিশালী ঘাটি যশোরের পতন হয়। ওয়াশিংটনে হেনরি কিসিঞ্জিার চীনকে উত্তর সীমান্ত আক্রমন এবং সপ্তম নৌবহর ব্যবহারে জন্য ‘চীনা কতৃপক্ষ ও মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সঙ্গে অনবরত দেন-দরবার করতে থাকে।

8 ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের সাধারন পরিষদের অধিবেশনে ১০৪/১১ ভোটে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাস করিয়ে নিলেও সোবিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত এই প্রস্তাবের ভ্রুক্ষেপ না করে বাংলাদেশের দ্রুত বিজয় অর্জনে মনযোগ দেন। ৯ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট নিক্রন ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম উপকূলে অবস্থিত সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরে অবস্থান নেওয়ার নিদের্শ দেন।

বাংলাদেশে পাকিস্তান বাহিনীর পতনরোধে নৌ, বিমান,ও স্থল তৎপরতার সম্ভাব্য মিশন দেওয়া হয়। (সপ্তম নৌববহরের টাস্কফোর্সে পাঁচহাজার সৈন্যসহ ৭৫টি জঙ্গী বিমান, পাঁচটি হেলিকপ্টার, মিসাইল ও ডেষ্ট্রয়ার সহ ২৫টি অ্যাসল্ট হেলিকপ্টার সংযোক্ত করা হয়।

১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে জানিয়ে দেন ‘ভারত যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হলে সপ্তম নৌবহর নিয়োগসহ শক্তি প্রযোগ করা হবে। এই হুমকীর মোকাবেলায় সোভিয়েত ইউনিয়ন পাঁচটি সাব-মেরিনসহ ১৬টি নৌযুদ্ধ জাহাজ বঙ্গোপসাগর ও তার আসে-পাশে মোতায়ন করে।

ফলে বিশ্বজোড়ে হৈচৈই পড়ে যায় যে যুদ্ধ আর্ন্তজাতিক রুপ পরিগ্রহ করছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা প্রায় নিরুত্তাপ হয়ে পড়েন। কিন্তু অদম্য সাহস ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে এই সংকট মুহুর্তে শান্ত ও ধীর থেকে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী তিনটি সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন।

প্রথমতঃ সপ্তম নৌবহরের মিশন ব্যর্থ করার জন্য ভারতীয় নৌবাহিনীর সর্বচ্চ ব্যবহার ।

দ্বিতীয়তঃ ঢাকা অভিমুখে যৌথবাহিনীর অভিযানের গতি বৃদ্ধি।

তৃতীয়তঃ সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক সাহায্য নিশ্চিত করা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা ব্যবস্থা হিসাবে জাতি সংঘের মাধ্যমে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ থেকে ভারতকে বিছিন্ন করার চেষ্ঠা করে। তারা প্রতিরক্ষা চুক্তির ব্যধবাধকতা দেখিয়ে সপ্তম নৌবহর পাকিস্তানের পক্ষে নিয়োগের চেষ্ঠা করে। সর্বপরি সামরিক হস্তক্ষেপে চীনকে সম্মত করতে চেষ্ঠা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১২ই ডিসেম্বরের মধ্যে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে ভারতে হুমকি প্রদান করলে ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নকে কাজে লাগিয়ে মার্কিনীদের কাছে থেকে সুকৌশলে কিছুটা সময় বের করে আনে।

ইতিমধ্যে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দেয় যে, তারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ গ্রহনে বিরোধী তবে তারা জাতিসংঘে পাকিস্তানের পক্ষে সব রকম সাহায্য সহযোগিতা দিবে। ১২ ডিসেম্বর চীন-যুক্তরাষ্ট্র মিলে নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব উপস্থাপন করলে তৃতীয়বারের মত সোভিয়েত ইউনিয়ন তাতে ভেটো প্রদান করে।

ইতিমধ্যে সপ্তম নৌবহর নোঙ্গর করার সম্ভাব্য চট্রগ্রাম উপকূলের সকল জায়গা ভারতীয় নৌ, বিমান, ও স্থল বাহিনী দখল করে নিলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধান কমান্ডার জেনারেল আব্দুল্লাহ নিয়াজী অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে পৌছানোর আগেই ১৬ই ডিসেম্বর বিকালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে নিয়াজী নিঃশর্ত ভাবে মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসর্মপন করে। (লেখাটি সংশোধন যোগ্য)

মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইতিহাস বিভাগ ।

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here