নেতামী !!!

0
124

‘দুর্বুলার শীষে যেমন নিহারের পানি
কোন‘জনা বেঈমান কইছে এই দেহ হা,পনি-
বড় ঘর বান্দ্যাছাও মনা-ভাই, বড় করছ আশা
রজনী প্রভাতের কালে পঙ্খি ছাড়বে বাসা,।

একবার ব্যক্তিত্ববানদের সভায় কৌতুহল করিয়া ‘ব্যক্তিত্ব, কথাটির ব্যাখ্যা দানের অভিপ্রায়ে আমাকে ডাকা হইল। হোমরা-চুমরা কত গুলো লোক আসিয়া আমাকে অতিশয় আদর করিয়া মাইকের সামনে দাড়াঁ করিয়া দিল। আমি অত্যন্ত কাতর ও স্ব-ভয়ে- উচ্চারণ করিলাম ভাইসব; ‘ব্যক্তি তাহার আপন বৈশিষ্টকে সর্বচ্চে ধারন করিয়া অপরকে আকৃষ্ট করিবার এক অভিনব কৌশল হল ব্যক্তিত্ব ,।

ব্যাকরনের ভাষায় ‘ব্যক্তি শব্দ একক অর্থে সংখ্যা বাচক মানব, আর ত্ত্ব-শব্দের অর্থ দাড়ায়- ( ত-তৌহিদ, ত-তটস্থ, ও ব-বাহির) অর্থাৎ ব্যক্তিত্ব শব্দের সমষ্টিগত অর্থ দাড়াঁয় মানবের একক চিত্তে ভিতর বাহিরের সমন্বয়ের ধারনা।

আবার আরম্ভ করিলাম-‘ব্যক্তিত্ব শিখিবার চেয়ে বুঝিবার বিষয়,। সমাজের-সামাজিক আধিপত্যে ব্যক্তিত্বের প্রবনতা-ঐশ্বরীক আধিপত্য না দিলেও দেয় সামাজিক আধিপত্য, ও  উজ্বলতর ভাবে বেচেঁ থাকার ধারনা।

যাহারা ব্যক্তিত্বকে আশ্রয় করিয়া বাচিঁতে চাহে তাহারা সামাজ হিতৈষী না হলেও সমাজ বিদ্বেষী নয়। কিন্ত সমাজ সৃষ্টির ইতিহাসে ব্যক্তিত্বের একক প্রবনতার চেয়ে সর্বদানকে আশ্রয় করা হয়েছে। সমাজে মানুষ একে অপরের নিকট, পারস্পারিক ভাবেই দায় বদ্ধ ও সর্বমঙ্গলের প্রতি অনুগামী।

আমার কথা শুনিয়া সকলে বাহুবা দিতে লাগল। আমি আবার আরম্ভ করিলাম ‘ রাধানন্দ ঘোষ অফিসে ফুসঁ কাটিয়া লম্বা লম্বা গোফ রাখিয়া, দামী স্যূট-ট্রাই ও বিলেতি জোতায় ব্যক্তিত্ববান হয়েছে।

বাতাসে উড়–চুল, টান-টান কামিজ, পাহাড়ের ন্যায় উচু জোতা, আর চামেঙ্গী ভাষায় অনেক নারীই রুপসী সাজিয়া, দেমাগী ঢং দেখাইয়া-মুখে রং মাখাইয়া ব্যক্তিত্ববানের ধোঁয়া ছড়ায়া থাকে। অর্থাৎ অন্যদের চেয়ে আলাদা, হয়তো বা দামি! যাহাকে তাহারা ব্যক্তিত্ব ভাবিয়া থাকেন।

আমি এই সকল ব্যক্তিত্ববানদেরকে কেবলই তাল গাছের সাথে তুলনা করতে ইচ্ছুক। উচঁ তালগাছ প্রকৃতির পালনেই হাত উঁচু করিয়া সবায়কে জানিয়ে দেয় আমি শ্রেষ্ঠ। প্রচন্ড ঝড়-হাওয়াতেও তার দুল-দুল, দুলানী লক্ষনীয়।

তাহার শরীরটাও রসে টাইটুম্বুর। প্রচন্ড রোদে কর্ম ক্লান্ত ব্যক্তিরা দিবাকরের উত্তাপে অস্থির হইয়া যখন ব্যক্তিত্ব নামক তালগাছ নিচে আসিয়া দাঁড়ায় তখন কেবল চৈতন্য-ভিলাষীরাই আশ্রয় পেলেও-অধিকাংশ কেই ফিরতে হয় সামাজিকতার রোদ্র তাপে; চির অব্যস্থ  প্রকৃতির রোদ্র ছায়ায়। কারণ ব্যক্তিত্বের তাল গাছ বড় হইলেও তাহার ছায়া পড়ে সংর্কীন জায়গায়।

ব্যক্তিত্বের গাছ, অথার্ৎ তাল গাছে যে ফল ধরে তাহা দেখিতে বড়-ই, মনোরম। কেমন ডাহর-ডাহর! কাছে পাইতে ধরিতে ইচ্ছা জাগে। গাছের শোভা বৃদ্ধিতে ফলের জুড়ি নাই। গাছ হইতে দ্বৈত ক্রমে ফল পড়িলে পাড়া জুড়িয়া হৈঁই-চৈঁই পড়িয়া যায়।

কাহার আগে কে এই ফল কুড়াইবে? এ কথা সত্য যে, দন্ত-বীরদের জন্য এই ফল বড়ই উপকারী হলেও আমার মত দন্ত বিবর্জীত কেহ যদি সৌভাগ্য ক্রমে- এই ফল পাইয়া থাকে তবে তাহার ভাগ্য মন্দ। কারণ আমার মত লোকের এই সুস্বাদু ব্যক্তিত্বের ফল হজম হইবার নয়। প্রচন্ড আগ্রহ নিয়া বার কয়েক আমি, এই ব্যক্তিত্বেও ফল খাইতে গিয়া ছোবড়ার আঘাতে আমার মুখ নষ্ট করিয়া ফেলিয়াছি।

এই ব্যক্তিত্বের গাছের আর একটি বড় গুন-‘গাছের অম্লীয় রস,। এই রস বড়ই সু-স্বাদু।  অনেকাংশেই ব্যক্তিত্ববানরা এই গাছের অম্লীয় রস পান করার জন্য গাছের নীচে আসিয়া ভির জমায়; গ্লাসে গ্লাসে অবিবেচকের ন্যায় তালের রস (ব্যক্তিত্বের রস)পান করিয়া হেঁলিয়া-দুঁলিয়া বাড়ি ফিরিতেই কতেক রাস্তায় গাড়ী চাঁপা, কতেক ফুটপাতে সংজ্ঞাহীন, কতেক বহু কষ্টে বাড়ী ফিরিয়া বৌওকে-মা, বোনকে খালা বলিয়া তাহাদের কুলে মাথা রাখিয়া নিশ্চিন্তে ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া ব্যক্তিত্বের গাছের রসালো অমৃত গুনবার্তা  বিশ্বজোড়ে পৌছিয়ে দেওয়ার দিবা স্বপ্নে বিভোর থাকে—————।

আমি একটু নাড়িয়া-চড়িয়া মাউথ পিচ কচ্লাইয়া বলিলাম- আমি ব্যক্তিত্ববানদের পক্ষে নই!! বরং ব্যক্তিত্ববানদের পদাঘাতে আমি পৃষ্ঠ। সভার ডুম-চামড়রা জীর্ণ রোগাক্রান্ত হাত-খনা উচু করিয়া হাউ-মাউ করিয়া কি যেন বলিতে চাইল বুঝিলাম না । আমার বক্তব্যে শেষ শুবক‘টি  শুনিবা মাত্রই সভা মাঝে এক শ্রেণীর মানুষ অথার্ৎ প্যান-শার্ট পরিহিত ভদ্র সমাজ; হট্ট-গোল আরম্ভ করিয়া দিল।

সভাপতি, প্রধান অতিথি, ও বিশেষ অতিথিবৃন্দ ভীষন ক্ষুব্ধ হইয়া আয়োজকদের গালি-গালাজ করিতে লাগিলেন। এই সময় ব্যক্তিত্বের অশ্লীয় রস পানকারি কতিপয় লোক ঢলিতে ঢলিতে কাছে আসিয়া আমাকে উত্তম-মাধ্যম কিছু আদর করিয়া-গাঢ় ধরিয়া সভা হইতে বাহির করিয়া দিল।

আমার পাচঁ বছরের ভাতিজা ইমন সভা মাঝে আমার এই রুপ সম্মান দেখিয়া চিৎকার করিয়া কাদিঁতে থাকিল। আমি আমার যথার্থ পুরস্কার পাইয়া ভাতিজাকে সাথে লইয়া বাড়ি ফিরিলাম আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলাম আর কখনো এমন নেতামীতে যাব না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here