ইউএনওকে হত্যার হুমকি, চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুই জিডি

0
573
শাহিনুর ইসলাম প্রান্ত [লালমনিরহাট]: লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ইউএনওকে হত্যার হুমকি ও ১৯টি চেক ছিঁড়ে ফেলার ঘটনায় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েসের বিরুদ্ধে থানায় পৃথক দুইটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
রোববার বিকেলে আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের স্টেনোটাইপিস্ট হাবিবুর রহমান বাদী হয়ে দুটি জিডি করেন।
এর আগে একইদিন সকালে অফিসে গিয়ে অফিস সহকারীর নিকট থেকে ফাইলপত্র নিয়ে প্রকাশ্যে চেক পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েস।
জিডি সূত্রে জানা গেছে, আদিতমারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েস নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে বিধিবিধান ও নীতিমালা লঙ্ঘন করে কাজের জন্য চাপ প্রয়োগ করে আসছেন। এর ব্যত্যয় ঘটলে সেই দপ্তরের কর্মকর্তাকে অশ্রব্য ভাষায় গালমন্দসহ প্রাণনাশের হুমকি দেন চেয়ারম্যান। উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, ভিজিডি, মাতৃত্বভাতা, কৃষি প্রণোদনা, সামাজিক নিরাপত্ত বেষ্টনীর সুবিধাভোগীর তালিকায় নিজের অংশ দাবি করেন চেয়ারম্যান।
বিধি বহির্ভূতভাবে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ না দেয়ায় এবং প্রাক্কালন কাজ সমাপ্ত না হতেই বিল পরিশোধ না করায় সাম্প্রতিক সময় উপজেলা প্রকৌশলী ও সহকারী প্রকৌশলীকে রুমে বেঁধে পেটানোর হুমকি দেন চেয়ারম্যান। শুধু তাই নয়, তার কথামতো কাজ না করায় একজন মহিলা কর্মকর্তাকে বহিরাগতদের দিয়ে মানহানি ঘটানোর হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। সকল দপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনা তুলে ধরা হয় অভিযোগে।
অভিযোগে আরো বলা হয়, বৃহস্পতিবার (১২ নভেম্বর) মাসিক সমন্বয় সভায় ভিজিডি ও মাতৃত্ব ভাতার তালিকায় নিজের অংশ দাবি করেন উপজেলা চেয়ারম্যান। যা বিধিসম্মত না হওয়ায় ইউএনও নাকোচ করে দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সভা অসমাপ্ত রেখে চলে যান চেয়ারম্যান।
এরপর চেয়ারম্যান ইউএনও অফিসের সিসিটিভি ক্যামেরা লোক মারফতে খুলতে গেলে তার ছবি তোলেন ইউএনও মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন। একই সাথে ক্যামেরা খুলে ফেলার কারণ জানতে চাইলে ইউএনওকে অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ করেন চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েস।
এ সময় চেয়ারম্যান ইউএনওকে বলেন, “বেশি কথা বললে পিটিয়ে নরসিংদী পাঠিয়ে দেবো। উপজেলা পরিষদ কী তোর বাবার সম্পত্তি, উপজেলা পরিষদ কি তুই চালাবি?” এভাবে গালমন্দ করে হত্যার হুমকি দেয়া হয়।
এ ঘটনায় ওইদিন রাতে ১৭ জন অফিসার ও ইউএনও মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
এসব ঘটনায় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে রোববার (১৫ নভেম্বর) বিকেলে আদিতমারী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ইউএনও মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন। যার নং- ৫৫৮। জিডিতে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে উপজেলা পরিষদ চত্তরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে রোববার সকালে উপজেরা পরিষদ চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েস অফিসে এসে তার অফিসের স্টানোটাইপিস্ট হাবিবুর রহমানের কাছ থেকে ফাইলপত্র নিয়ে ১৯টি চেক পাতা প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলেন। উপজেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিলের যৌথ স্বাক্ষরিত সোনালী ব্যাংক আদিতমারী শাখার হিসাব নং ৩৩০০৪৯৬৪ এর ১৯টি চেক পাতা ছিঁড়ে ফেলেন চেয়ারম্যান।
এ ঘটনায় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের স্টানোটাইপিস্ট হাবিবুর রহমান বাদী হয়ে রোববার আদিতমারী থানায় একটি জিডি করেন। যার নং- ৫৫৯।
আদিতমারী থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, ইউএনও মহোদয় নিরাপত্তা চেয়ে একটি ও চেক পাতা ছিঁড়ে ফেলার ঘটনায় অপর একটি জিডি করা হয়েছে। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা হবে। এ ছাড়াও উপজেলা পরিষদের পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
অপরদিকে ইউএনওসহ ১৭ জন অফিসারের দায়ের করা অভিযোগটি তদন্ত শুরু করে জেলা প্রশাসন। রোববার তদন্ত কর্মকর্তা লালমনিরহাটের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রফিকুল ইসলাম দিনভর উপজেলা পরিষদ হলরুমে বিভিন্নজনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। তবে তিনি সাংবাদিকদের সামনে কোন মন্তব্য করেননি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন বলেন, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বিভিন্ন সময় আমাকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছেন। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছেন। তাই আমি নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করেছি। এছাড়াও আমার ও চেয়ারম্যানের যৌথ সাক্ষরিত ১৯টি চেক পাতা তিনি ছিঁড়ে ফেলেছেন। সেটা নিয়েও জিডি করা হয়েছে।
শনিবার (১৪ নভেম্বর) সংবাদ সম্মেলনে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েস। তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তারা দলবদ্ধ হয়ে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন। তবে রোববার (১৫ নভেম্বর) জিডি প্রসঙ্গে তার সাথে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here