Category: শিল্প সাহিত্য

  • বৈশাখ ও কল্পনা !

    বৈশাখ ও কল্পনা !

    কোন এক বৈশাখে,
    জীবনের প্রথম ভাগে-
    মনোঞ্চলতায় বিভোর হয়ে আদ্রীতার হাতে
    একগুচ্ছ কাচেঁর চূড়ি পড়াতে চেয়ে ছিলাম !

    আবেগে আপ্লুত হয়ে!
    অসীম বৈরীতাকে দূরে ঠেলে
    সাদা-কালোর ভালবাসায়,
    মনের গহীনে, রিনিঝিনি শব্দ শুনে ছিলাম,
    আদ্রীতার কংকন-হাতের ঝংকারে।।

    নেশার ঘোরে অতি-চুপিসারে,
    একগুচ্ছ ‘ভালবাসা’ রেখে ছিলাম
    আদ্রীতার মন-ড্রয়ারে।।

    সহসা, জীবনের রং
    আরো গভীর হয়ে উঠেছিল-
    অনন্দিন-অভিপ্রায়ে,
    অনাগত-বৈশাখের আগমনে!

    কিন্তু সেই গল্প, কেবল ছিল ‘কল্পনা’ !
    বাস্তবতা- জ্বলন্ত ‘টয়নগরী’
    যেখানে কেবল অস্তিত্ব ছিল-
    অপরাধের দূষিত কুন্ডলীর ।।

    ‘তারপর থেকে, হাজার বছর জ্বলছি
    কিন্তু নিঃশেষ হয়ে যায়নি’-

    এখনো, স্বপ্ন দেখি- অসার অব্যয়ে,
    ‘এক দিন আবারও বৈশাখ আসবে,
    কাচেঁর চূড়ির রিনিঝিনি শব্দে বেজেঁ উঠবে
    আমার চির-চেনা আদ্রীতার নগ্ন হাত খানি।।

     

     

     

     

  • বাঙ্গালীর সর্বজনীন সংস্কৃতির দিন ‘পহেলা বৈশাখ’

    বাঙ্গালীর সর্বজনীন সংস্কৃতির দিন ‘পহেলা বৈশাখ’

    পহেলা বৈশাখ দিনটি যতটা ধর্মীয় অনুভূতিসিক্ত, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব বাঙ্গালীর সর্বজনীন সংস্কৃতির দিন হিসাবে। সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই বাঙালিরা এই দিনটি বিচ্ছিন্নভাবে পালন করে আসছে বলে বিভিন্ন গবেষকরা মত প্রকাশ করেছেন। সভ্যতার আর্বতন-বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঋতুরাজ্যের জ্ঞান মানুষের মধ্যে বেগবান রয়েছে। এরপর এসেছে জ্যোতিষশাস্ত্র।

    সম্রাট আকবরের শাসনামলে বাংলা -উড়িষ্যায় ইলাহি সন, মৌসুমি বা ফসলি সন ও বিলায়েতি সনের চালু ছিল। ঘরে ঘরে ফসল তোলার সাথে খাজনা আদায়ের ব্যাপক প্রচলন ছিল। এজন্য সম্রাট আতবর জ্যোতিষশাস্ত্রবিদ আমির ফতেউল্লাহ সিরাজিকে দিয়ে হিজরি সনের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে ‘তারিখ ই-ইলাহি উদ্বাবণ ও এর প্রচলন করেন। সেই তখন থেকেই কৃষিপ্রধান সমাজে এই দিনটি সমাদৃত হয়ে আসছে।

    পহেলা বৈশাখ যেমন বাঙালির হৃদয়ে নতুন উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে তেমনি ‘ভূমিহীন’অর্থাৎ বর্গাচাষীদের জন্যও যন্ত্রণাদায়ক দিন হিসেবে আবির্ভূত হয়। শুরতেই এই দিনে সম্পাদন করা হতো জমিদারের রাজস্বের দিন হিসাব। প্রজারা বকেয়া খাজনা পরিশোধ করে মিষ্টিমুখ করত। ব্যবসায়ীরা তাদের হিসাব চুকিয়ে নিত। বৈশাখের যে লৌকিকতা তা শুরু হয় পরিবার থেকে। আত্নীয়,বন্ধু,ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিবেশি সুহৃদজনকে শুভেচ্ছা ও কুশল জানানো ছোট -বড়দের মধ্যে নববর্ষে আয়োজিত বৈশাখী মেলায় বহু মানুষের সমাগম হয়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মহামিলনের স্হান এই মেলা। শিশু কিশোররা চরকি,নাগরদোলা,বাঁশি,তালপাতার রকমারি আয়োজনে মেতে উঠে।কিশোরীরা ব্যস্ত চুরি, ফিতে,চুলের ক্লিপ,আলতা ,কাজল ইত্যাদি কেনার জন্য।

    কিন্ত পুরোনো বৈশাখ নিয়ে নানা তথ্য বিবৃত রয়েছে।পুরাণের মতে বিশাখা চন্দ্রের সপ্তবিংশ পত্নীর অন্যতম এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতে কেবল নক্ষত্র।জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সূর্যের অবস্হানের সঙ্গে বিভিন্ন নক্ষএের অবস্হানের সম্পর্ক দেখে মাস ভাগ এবং মাসগুলোর নামকরণ করেছিলেন।বিশাখ উন্ষতার সূচক।সঙ্গত কারণে বৈশাখের সঙ্গে যে উষ্ণতা বা খরতাপ-এর যা মিল রয়েছে তা বলা বাহুল্য। বৈশাখের স্বরুপ বিশ্লেষণে এই দিনটির গুরুত্বও কম নয়।

    পহেলা বৈশাখের সঙ্গে বাঙালির আদি সংস্কৃতি যেমন, যাএা ও পালা,কবিগান,গাজির গান,আলকাপ,পুতুল নাচ, বাউল- মুর্শিদি -ভাটিয়ালি গান, লাইলি-মজনু, রাধা-কৃন্ষ, ইউসুফ-জুলেখা ইত্যাদি পালা প্রদর্শনের আয়োজন করা হয় প্রত্যন্ত গ্রামে। মাস হিসেবে বৈশাখের স্বতন্ত্র পরিচয় আছে, যা প্রকৃতিতে ও মানবজীবনে প্রত্যক্ষ করা যায়। খররৌদ্র, দাবদাহ, ধু-ধু মাঠ, জলাভাব, কালবৈশাখীর ঝড়, ঝরাপাতা গাছে নতুন পাতার আবির্ভাব, আমের কলি ইত্যাদি প্রকৃতি পরিবেশের যোগ রয়েছে।

    বাঙালি জাতি বারবার বিদেশি শক্তির শাষণ-শোষণে, নিপীড়িত -নিঃগৃহীত হয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগোওরের সময়ে ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানভূমির প্রগতিশীল ছাএ চেতনায় পহেলা বৈশাখ রাজনৈতিক মাএায় বিকশিত হয়।পাকিস্তানি শাসনাধীনে বাঙালি সংস্কৃতিকে অপচেষ্টার বিরুদ্ধে গড়ে উঠা প্রতিবাদী চেতনার প্রকাশ। এর মধ্যে নববর্ষ বা বাংলা বর্ষবরণ উত্সব হয়ে উঠেছিল বাঙালি চেতনার ধারক ও বাহক। ৫২- এর ভাষা আন্দোলনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলার বাঙালিরা সংস্কৃতি সচেতন হতে শুরু করে এবং ৭১- এর স্বাধীনতা প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে অস্তিত্বের পুনরুদ্ধার করে।

    সর্বশেষে বলা যায়,পুরোনোকে বিদায় জানিয়ে নতুনকে আহ্বান করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই পালিত হয়ে আসছে বর্ষবরণ উৎসব। নতুন সম্ভাবনার প্রত্যাশায় নতুনকে বরণ করার রীতি বাঙালি জাতীয়তাবোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

    https://forum.daffodilvarsity.edu.bd/index.php/topic,40212.0.html

  • ‘বৈশাখী উৎসবে ধর্মের সংশ্রাব !

    ‘বৈশাখী উৎসবে ধর্মের সংশ্রাব !

    ‘বৈশাখী উৎসবের ঐতিহাসিক ধারা বিবেচনায় রেখে অপরিপক্ক জ্ঞান ও অসম্পূর্ণ মন-ভাবনায় কয়েক দিন আগে ‘অন্তরে বৈশাখের ইতিবৃত্ত’ নামে একটি লেখা দাঁড়া করাতে চেষ্টা করেছিলাম। লেখাটি আলোচনা-সমালোচনার দোষে দুষ্ট ছিল। আজ বৈশাখী উৎসবের ধর্মের সংশ্রাব  নিয়ে আলোচনার চেষ্টা   করব।

    বৈশাখ বাঙ্গালী জাতির সার্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসব। সংস্কৃতি সর্ম্পকে বলা যায়, কোন স্থানের মানুষের ভাষা আচার-ব্যবহার জীবিকা, সঙ্গীত, নৃত্য, সাহিত্য, সামাজিক সম্পর্কীত শিক্ষা-দীক্ষা, ও ধর্মীয় রীতি-নীতির মাধ্যমে যে, অভিব্যক্তি প্রকাশ করা হয় তাই সংস্কৃতি। তাই, সংস্কৃতিকে way of life বলা হয়। জাতি ও জাতীয়তার সাথে সংস্কৃতির সম্পর্ক নিরবিচ্ছিন্ন।

    একই সংস্কৃতির পরিমন্ডলে বিভিন্ন ধর্মের লোক থাকতে পারে, কিন্তু ঐক্যব্দ্ধ জাতি গঠনে একটি অভিন্ন সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। পুস্তকের ভাষায়, একই সংস্কৃতির সহজাত স্রোত-ধারায় বহু-ধর্মীয় সংমিশ্রনে, একটি অভিন্ন জাতীয়তা তৈরী হয় যা চিরাচরিৎ ধর্মীয় ধারনাকে বহুলাংশে মানবিক করে তুলে।

    আর ধর্মীয় সজ্ঞায় বলা হয়েছে- শতানের উপর জয়যুক্ত হওয়া এবং আত্মায় সত্যের আসন প্রতিষ্ঠা করাই ধর্ম। নিয়ম পালেন সাথে, জীবনের কদর্যতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রত্যেকটি মানুষের পবিত্র দায়িত্ব। সংস্কৃতিতে কদর্যতা থাকলেও বিবর্তন-যুগধারায় তা মানবিক পথে ধাবমান। তাই, জ্ঞানীরা বলেন, ধর্ম জীবন হলো মৌলিক আর সংস্কৃতি তার দর্শন। দর্শনহীন ধর্ম অসম্পূর্ণ।

    বৈশাখের সাথে ইসলাম ধর্মের সংশ্রাব অর্থহীন। মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থের কোথাও বৈশাখী উৎসব পালনের কথা উল্লেখ নাই। তবে বাঙ্গালী জাতির সংস্কৃতি ‘বৈশাখী উৎসব’ আংশিক ভাবে হলেও ভারতবর্ষে মুসলাম শাসকদের ‘শাসন ব্যবস্থাকে দীর্ঘায়িত ও সুসংহত করেছে এ কথা সকলেরই মানতে হবে। বিশেষ করে বিনদেশী শাসক সম্রাট আকবরের অভিনব ‘‘তারিখ ই-ইলাহি ’ আয়োজনে, অর্থনৈতিক বা সংস্কৃতির অন্তরালে ধর্মীয় সহিষ্ণু ভাবনায় ভাবতবর্ষে মুঘল শাসন/ ইসলামী শাসন সু-প্রতিষ্ঠা করার সুদুর প্রসারী রাজনৈতিক কূট-কৌশল ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

    ইতিহাস ধারাপদ থেকে জানা যায়, মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে বাংলা -উড়িষ্যায় ইলাহি সন, মৌসুমি বা ফসলি সন ও বিলায়েতি সনের চালু ছিল। ঘরে ঘরে ফসল তোলার সাথে খাজনা আদায়ের ব্যাপক প্রচলন ছিল। এজন্য সম্রাট আকবর জ্যোতিষশাস্ত্রবিদ আমির ফতেউল্লাহ সিরাজিকে দিয়ে হিজরি সনের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে ‘তারিখ ই-ইলাহি উদ্ভাবন ও এর প্রচলন করেন যা পরবর্তীতে ‘বৈশাখী উৎসব’ হিসাবে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপক-প্রচার ও প্রতিষ্ঠা পায়।

    বৈশাখী উৎসব আজ বাংলা ভাষা-ভাষী বাঙ্গালীদের প্রাণের উৎসব। বৈশাখ শব্দটির উৎপত্তিতেই সনাতন ধর্মের হৃদয়ত্বতা রয়েছে। বাংলা ভাষার প্রাণকোষ বাংলা-ব্যাকরণে বৈশাখ শব্দটির উল্লেখ পওয়া যায় এ ভাবে- বৈশাখ+ষ্ণ, অস্তার্থে।২। মন্থণ দন্ড।বিশাখা+ষ্ণ।বি;পু।বিশাখা নক্ষত্রযুক্ত পুর্ণিমা।

    ইতিহাস বিদূত, বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠিরা বহুকাল আগে থেকেই বৈশাখী উৎসব পালন করে আসছে। মূলতঃ আদি জাতি-গোষ্ঠীরা বৈশাখী উৎসবকে ‘বৈসাবি’ উৎবস হিসাবে পালন করত। বর্ণ বেদে তারা আলাদা আলাদা ভাবে, আলাদা আলাদা নামে এই উৎসব পালন করত। যেমন মারমা -রা সাংগ্রাই, ত্রিপুরা-রা বৈসু, তঞ্চঙ্গ্যা-রা বিষু এবং চাকমা-রা বিজু’ উৎসব হিসাবে পালন করত। এই সকল উৎসবকে সম্মিলিত ভাবে বৈসাবি বলা হয় যা আজও তাদের সমাজে ‘চেতনা-ধর্মী’ উৎবস হিসাবে বহমান রয়েছে।

    যুগ-যুগান্তরের ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়, বৈশাখ বা বৈসবী উৎসব পালনের সাথে বৈদিক জাতি-গোষ্ঠির পুরাণ, বেদ কিম্বা সনাতন ধর্মের সংশ্রাব রয়েছে। হিন্দুরা বহুকাল আগ থেকেই বৈশাখী উৎসবকে তাদের ধর্মীয় উৎসব হিসাবে পালন করে।

    হিন্দু চান্দ্র পঞ্জিকায় ১২টি মাস রয়েছে -চৈত্র, বৈশাখ, জৈষ্ট, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিণ, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পোষ, মাঘ ফাল্গুন। এই মাস গুলি নাম খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রত্যেকটি মাসের নাম এসেছে সেই মাসের পূর্ণিমার দিনে চলমান নক্ষত্রের নাম থেকে।

    পৌরানিক উপাখ্যানে উল্লেখ পাওয়া যায়, চন্দ্র দেবতা হলেন স্বর্গের দেব মণ্ডলীর অন্যতম । চন্দ্র দেবের পিতার নাম অত্রি মুনি এবং মাতার নাম অনুসূরযা । হরিবংশ পুরান অনুযায়ী, চন্দ্র দেবতার বিয়ে হয়েছিল প্রজাপতি দক্ষ রাজার ২৭ কন্যার সাথে । প্রজাপতি দক্ষ ২৭ কন্যার নাম ছিল– অশ্বিনী , ভরণী , কৃত্তিকা , রোহিনী , মৃগশিরা , আদ্রা , পুনর্বসু , পুষ্যা , অশ্লেষা , মঘা , উত্তরফাল্গুনী , পূর্বফাল্গুনী , হস্তা , চিত্রা , স্বাতী , বিশাখা , অনুরাধা , জ্যেষ্ঠা , মূলা , পূর্বাষাঢ়া, উত্তরাষাঢ়া , শ্রবনা , যনিষ্ঠা , শতভিষা , পূর্বভাদ্রপদ , উত্তরভাদ্রপদ , রেবতী । ২৭ কন্যাই চন্দ্র দেবকে খুব ভালোবাসতেন।

    কিন্তু চন্দ্রদেব কেবল রোহিনী কেই ভালোবাসতেন । বাকী ছাব্বিশ কন্যা মনের দুঃখে পিতা দক্ষের কাছে নালিশ জানান । এতে দক্ষ ,ক্ষিপ্ত হয়ে চন্দ্রদেবতাকে ক্ষয় রোগে আক্রান্তের অভিশাপ দেন । চন্দ্রদেবতা রোগে জর্জরিত হলে ব্রহ্মা , বিষ্ণু, দেবগণের কথা মতো সাগর তটে শিবলিঙ্গ নির্মাণ করে মহাদেবের তপস্যা আরম্ভ করলেন । মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে চন্দ্রদেবের সম্মুখ উপস্থিত হন। ফলে চন্দ্র দেব আংশিক ভাবে শাপ মুক্ত হন ।

    তৎপর তিনি চন্দ্রকে বর দেন, পূর্ণিমার পরদিন থেকে কৃষ্ণ পক্ষের প্রতিপদ থেকে চতুর্দশী পর্যন্ত চন্দ্রদেব ক্ষয় হতে থাকবেন , অমাবস্যার দিন সম্পূর্ণ ক্ষয় হবেন । আবার অমাবস্যার পরদিন থেকে শুক্ল পক্ষের প্রতিপদ থেকে চতুর্দশী পর্যন্ত একটু একটু করে বাড়তে থাকবেন , পূর্ণিমা তে পূর্ণ রূপ হবেন । এর পর চন্দ্র দেবতাকে মহাদেব শিরে ধারন করলেন । (পর্ব-১) চলবে—-

    https://forum.daffodilvarsity.edu.bd/index.php/topic,48771.0.html

  • দাদুর কাঁথা

    দাদুর কাঁথা

    বিশ্বাস বাড়ির নোনা ধরা দেওয়াল আর প্রায় রং উঠে যাওয়া ফাটলগুলো দেখে বোঝা যায়, একসময় এখানে লক্ষ্মীর বাস ছিল। কিন্তু সময় আর ভাগ্যের ফেরে এখন সবটা ম্লান। পলেস্তারা খসে পড়া বৈঠকখানাটা যেন নির্বাক হয়ে চেয়ে থাকে এক হারানো অতীতে।

    রিমের বাবা বিমল বাবুর কাঁধে এখন ঋণের পাহাড়, সারাদিন পাওনাদারদের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকেন। মা সুমিত্রা দেবীর কপালে দুশ্চিন্তার স্থায়ী ভাঁজ, উনুনে হাঁড়ি চড়বে কি না, সেই চিন্তায় রাত কাটে। অভাবের এই জরাজীর্ণ সংসারে একমাত্র উজ্জ্বল স্মৃতি ছিলেন রিমের দাদু, অবিনাশ বিশ্বাস।  তিনি ছিলেন এক রহস্যময় জহুরি, শুধু পাথর নয়, মানুষের মনের গভীরে থাকা আসল সোনা চিনতে পারতেন।

    সবসময় বলতেন, “হাতের রেখায় ভাগ্য থাকে না রে রিম, ভাগ্য থাকে মনের চাদরে। সেই চাদরের বুনিতেই থাকবে তোর আগামী।” দাদুর মৃত্যুর পর বাড়ির অনেক কিছুই ওলটপালট হয়ে গেল। দাদুর ঘরটা দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল।

    অপ্রয়োজনীয় ভেবে কেউ ওমুখো হতো না। একদিন বৃষ্টির দুপুরে, রিম  কৌতুহল নিয়ে ঘরটা পরিষ্কার করতে গেল। ঘরে থাকা অন্যান্য আসবাবের সঙ্গে পুরোনো আমলের সেই বিশাল সেগুন কাঠের আলমারিটা চুম্বুকের মতন আকর্ষণ করলো তাকে। ধুলোবালি আর মাকড়সার চালে ঘেরা আলমারিটা খুলে ফেললো রিম।

    আলমারিটা যেন একটা ছোটখাটো অন্ধকার গুহায় পরিণত হয়েছে। পুরোনো বই আর ন্যাপথলিনের  গন্ধে একাকার হয়ে এক অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ধুলোর আস্তরণ সরাতে একদম ওপরের তাক থেকে একটা ভাঁজ করা ভারী কাপড়ের স্তূপ তার হাতে ঠেকল। বের করে আনতেই দেখা গেল এক বিশাল নকশি কাঁথা। কাঁথাটা মেঝেতে বিছিয়ে রিম অবাক হয়ে গেল।

    সাধারণত কাঁথা লম্বাটে হয়, কিন্তু এটি নিখুঁত ৯ ফিট বাই ৯ ফিট একটি বর্গাকার কাঁথা। এর জমিন গাঢ় নীল, সোনালি, রূপোলি আর লাল সুতোয় অদ্ভুত সব জ্যামিতিক নকশা আঁকা। কোনো নকশা দেখতে নক্ষত্রমণ্ডলীর মতো, কোনোটা বা নদী বা পাহাড়ের মতো। রিম বিড়বিড় করে বলল, “দাদু কি জ্যামিতির ভক্ত ছিলেন নাকি? কাঁথা আবার স্কয়ার হয় কীভাবে?” সে আরও লক্ষ্য করল, কাঁথাটার ওজনে একটা অদ্ভুত ভারসাম্য আছে, মনে হয় এর সুতোগুলো যেন কোনো বিশেষ চুম্বকীয় শক্তি দিয়ে তৈরি।

    সেদিন রাতে হঠ্যৎ হাড়কাঁপানো শীত পড়ল। কলকাতার এ অঞ্চলে শীত সচরাচর অতটা বেশি হয় না, কিন্তু সেদিন মনে হলো  হিমালয় তুষারপাত এদিকেই চলে এসেছে। কোন এক অদৃশ্য কারণে বিছনার পাশেই রিম দাদুর সেই বিশাল কাঁথাটা রেখেছিল। শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে রিম দাদুর সেই কাঁথাটা গায়ে জড়িয়ে  শুয়ে পড়ল।

    শোবামাত্রই সে এক অদ্ভুত আরাম অনুভব করল। ৯ ফিট বাই ৯ ফিট হওয়ার কারণে সে যেদিকেই পাশ ফিরছে, কাঁথাটা তাকে পরম মমতায় জড়িয়ে রাখছে। কোনো কোণ থেকেই শরীরের এক ইঞ্চিও বাইরে থাকছে না। পা বেরিয়ে যাওয়ার কোনো ভয় নেই।

    আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাইরে যতই কনকনে ঠান্ডা থাকুক, এই কাঁথার নিচে ঢোকা মাত্রই শরীরটা এক অদ্ভুত উষ্ণতায় ভরে গেল—আর কাছে মনে হল কেউ একজন পরম আদরে উষ্ণতায় তাকে জড়িয়ে ধরেছে। সবচেয়ে বড় ম্যাজিকটা ঘটল কিছুক্ষণ পর। রিম লক্ষ্য করল, এই কাঁথাটির একটি বিশেষ গুণ আছে—ঘুমানোর আগে সে যে বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করছে, তার মস্তিষ্কের ভেতরে যেন সেই বিষয়ের একটা পরিষ্কার ছবি তৈরি হচ্ছে। সে ভাবছিল বাবার ঋণের কথা আর কালকের বড় ক্রিকেট ম্যাচের কথা। ভাবতে ভাবতেই সে এক গভীর, স্বপ্নিল ঘুমে তলিয়ে গেল।

    স্বপ্নে রিম দেখল সে একটা বিশাল স্টেডিয়ামে বসে আছে। স্কোরবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে ভারতের রান। সে স্পষ্ট দেখল, শেষ ওভারে জয়ের জন্য যখন ১২ রান দরকার, তখন অনামী এক তরুণ বোলার পরপর দুটো উইকেট তুলে নিয়ে ভারতকে ম্যাচ জিতিয়ে দিচ্ছে। স্টেডিয়ামের হর্ষধ্বনি তার কানে বেজে উঠল।

    সে আরও দেখল, পরদিন সকালে শেয়ার বাজারের একটা নির্দিষ্ট গ্রাফ রকেটের মতো ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে, ‘তাতান স্টিল’ কোম্পানির লোগোটা বারবার ভেসে উঠল। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই রিমের শরীরটা অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশি সতেজ মনে হলো। সে পরীক্ষা করার জন্য তার জমানো অল্প কিছু টাকা দিয়ে ওই ক্রিকেট ম্যাচে অনলাইনে বাজি ধরল এবং শেয়ার বাজারে তাতান স্টিলের স্টকে বিনিয়োগ করল। ফলাফল? হুবহু স্বপ্নের মতো! রিম স্তম্ভিত হয়ে গেল।

    সে বুঝতে পারল, এই ৯ ফিট বাই ৯ ফিট কাঁথা আসলে এক ভবিষ্যৎ দর্শন যন্ত্র। কয়েক দিনের মধ্যেই রিমের এই হঠাৎ পরিবর্তন নজর এড়ালো না তার দুই প্রিয় বন্ধু—বলাই আর শুভেন্দু। এদের মধ্যে বলাই ছিল আদ্যোপান্ত লোভী।

    সবসময় ফন্দি ফিকির করত কীভাবে কম পরিশ্রমে বড়লোক হওয়া যায়। ধারদেনা করে চলা বলাই রিমের নতুন দামী ফোন আর নিশ্চিন্ত ভাব দেখে হিংসায় জ্বলছিল। অন্যদিকে শুভেন্দু ছিল অত্যন্ত যুক্তিবাদী, প্রতিটি ঘটনার পেছনে বিজ্ঞান আর যুক্তি খুঁজত। বলাই একদিন রিমকে চেপে ধরল, “কিরে রিম, তুই কি লটারি পেয়েছিস? নাকি দাদুর ঘরে কোনো গুপ্তধন ছিল? আমাদের কাছে লুকচ্ছিস কেন?” আমাদের বলনা বিষয়টা কি? রিম বন্ধুদের ওপর বিশ্বাস করে কাঁথার রহস্যটা জানাল।

    সে বলল, “দাদুর এই ৯ ফিটের কাঁথাটায় আমি ভবিষ্যৎ  দেখতে পাচ্ছি।” শুভেন্দু কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইল না। সে বলল, “এটা অবৈজ্ঞানিক। নিশ্চয়ই তুই কোনো অ্যালগরিদম ব্যবহার করছিস। কাঁথা আবার ভবিষ্যৎ দেখায় নাকি!” বলাই ফিসফিস করে বলল, “রিম, পরের বিশ্বকাপের ফাইনালটা একবার দেখে নে না! আমরা সবাই মিলে বড়লোক হয়ে যাব। শুভেন্দু তোকে নিয়ে গবেষণা করবে।”

    রিম বন্ধুদের কথা মেনে নিল, কিন্তু সতর্ক করে দিল, “এটা দাদুর আশীর্বাদ, এটা নিয়ে কোনো নোংরামি করা যাবে না।” সেই রাতে কাঁথা গায়ে দিয়ে সে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট-এর ফাইনাল আর পরবর্তী এক সপ্তাহের শেয়ার বাজারের ওঠানামা নিয়ে চিন্তা করে ঘুমাল। স্বপ্নে সে দেখল কোন খেলোয়াড় কত রান করবে, আর সোনার দাম কতটা বাড়বে।

    দাদুর কাঁথার গুণ এতটাই প্রবল যে, স্বপ্নের প্রতিটি ডিটেইল তার মনে গেঁথে রইল। রিমের ভাগ্য বদলাতে শুরু করল, কিন্তু বলাইয়ের মনে লোভের আগুন দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল। সে ভাবল, এই কাঁথা যদি তার কাছে থাকে, তবে সে হবে দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী লোক। এক সন্ধ্যায়, বলাই রিমের বাড়িতে এল।

    সুযোগ বুঝে রিমকে অন্য কাজে ব্যস্ত রেখে, সে আলমারি থেকে দাদুর সেই ৯ ফিটের কাঁথাটা চুপিচুপি হাতিয়ে নিল। কাঁথাটা ব্যাগে ভরে সে প্রায় দৌড়ে বাড়ি ফিরল। তার বুক ধড়ফড় করছিল, কিন্তু চোখে ছিল কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন। সেদিন রাতে বলাই তার ঘরে দরজা বন্ধ করে দাদুর কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল। সে মনে মনে ভাবতে লাগল বিপুল সম্পত্তির কথা, অঢেল টাকার কথা। ভাবতে ভাবতেই সে ঘুমে তলিয়ে গেল।

    কিন্তু বলাইয়ের জন্য কাঁথা ভবিষ্যৎ নয়, বয়ে আনল ভয়ঙ্কর বাস্তব। স্বপ্নে সে দেখল, সে একটা অন্ধকার কুয়োর ভেতরে পড়ে যাচ্ছে। চারিদিকে অজস্র কালো হাত তাকে টেনে ধরছে। সে টাকার বদলে দেখল, জ্বলন্ত কয়লা তার দিকে ছুঁড়ে মারা হচ্ছে। একটা কর্কশ গলা তাকে ডাকছে, “তুই চোর! তোকে পুড়িয়ে মারা হবে!” বলাই ভয়ে চিৎকার করে জেগে উঠল। গা ঘেমে একাকার। কাঁথাটা যেন তার শরীরকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছে, ছাড়ানো যাচ্ছে না। অনেক কষ্টে নিজের গায়ের থেকে কাঁথাটা সরিয়ে নেয় সে।

    পরের কয়েক রাত বলাইয়ের জন্য নরকবাস হয়ে উঠল। যতবার সে টাকার কথা ভেবে ঘুমায়, ততবারই সে ভয়ঙ্কর দূরস্বপ্ন দেখে। কখনও দেখে সে সাপের কামড়ে মরছে, কখনও দেখে পাওনাদাররা তাকে  জলের ভিতরে চুবিয়ে ধরেছে।

    সে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। প্রচন্ড ভয় পেয়ে প্রতিবারই জেগে উঠতে হচ্ছে তাকে। কাঁথাটা তার কাছে এখন একটা অভিশাপ মনে হলো। সে বুঝতে পারল, এই কাঁথা তার জন্য নয়। এদিকে রিম কাঁথা খুঁজে না পেয়ে পাগলপ্রায়।

    সে বুঝতে পারল কে এই কাজ করেছে। শুভেন্দুকে সাথে নিয়ে সে বলাইয়ের বাড়ি গেল। বলাইয়ের চেহারা তখন চেনা যাচ্ছিল না—চোখের নিচে কালি, মুখ ফ্যাকাশে। রিমকে দেখেই বলাই ডুকরে কেঁদে উঠল। কাঁথাটা বের করে রিমের দিকে দিয়ে বলল, “রিম, আমাকে ক্ষমা কর। আমি লোভের বশে এটা নিয়েছিলাম।

    কিন্তু এই কাঁথা আমাকে বাঁচতে দিচ্ছে না। প্রতি রাতে আমি নরকে নিজেকে আবিষ্কার করছি।” রিম কাঁথাটা হাতে নিয়ে পরম মমতায় গায়ে বুলাতে লাগল। শুভেন্দু অবাক হয়ে সব দেখছিল। রিম বলল, “বলাই, এই কাঁথার ক্ষমতা তুই উপভোগ করতে পারবি না।” সে বলাই ও শুভেন্দুকে আসল সত্য জানাল।

    দাদু অবিনাশ বিশ্বাস মা, অর্থাৎ রিমের বড়দিদা, এই কাঁথাটি নিজ হাতে তৈরি করে ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বিদুষী এবং আধ্যাত্মিক নারী। তিনি কাঁথাটি তৈরির সময় প্রতিটি সুতোয় মন্ত্র এবং আশীর্বাদ বুনে দিয়েছিলেন।

    দাদুকে উপহার দেওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, “এই কাঁথাটা শুধু তোর গা ঢাকবে না, তোর বংশধরদের পথ দেখাবে। কিন্তু মনে রাখিস, এই কাঁথার ক্ষমতা বংশ পরম্পরায় এক প্রজন্ম পর পর জেগে উঠবে।”

    অর্থাৎ, অবিনাশ দাদুর পর এই কাঁথার ক্ষমতা রিমের বাবা বিমল বাবুর জীবনে সুপ্ত ছিল। রিম, অর্থাৎ পরবর্তী প্রজন্ম, এই ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে। তাই বলাই বা অন্য কেউ এই কাঁথার সুফল পাবে না, বরং লোভের শাস্তি পাবে।

    দাদুর মা চেয়েছিলেন, বিশ্বাস পরিবার যেন লোভের ফাঁদে না পড়ে, এবং অভাবের সময় এই কাঁথা যেন তাদের রক্ষা করে। বলাই সব শুনে নিজের ভুলের জন্য লজ্জিত হলো। সে আর কখনও ফাটকা খেলার কথা ভাবল না। রিম কাঁথা নিয়ে বাড়ি ফিরল।

    পরের কয়েক মাসে রিমদের ভাগ্য আমূল বদলে গেল। বিমল বাবু একদিন অবাক হয়ে দেখলেন, তার সব ঋণ শোধ হয়ে গেছে। রিম তাকে একটা নতুন কাপড়ের বড় শোরুম খুলে দিল। বাড়িতে নতুন রঙের প্রলেপ পড়ল, মা সুমিত্রা দেবীর রান্নাঘরে এল আধুনিক সব সরঞ্জাম। বিশ্বাস বাড়ির শ্যাওলা ধুয়ে গেল।

    পাড়ার লোক অবাক হয়ে দেখল, অভাবী রিম এখন এলাকার অন্যতম প্রভাবশালী তরুণ। বলাইয়ের লোভ দূর হলো, আর শুভেন্দু কাঁথার ক্ষমতাকে ‘জেনেটিক কোড’-এর এক রহস্যময় বহিঃপ্রকাশ বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল। টাকা আসার  সঙ্গে সঙ্গে রিম লক্ষ্য করল তার মানসিক শান্তি কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে।

    কিন্তু সে দাদুর সেই সঙ্কেত ভোলেনি। লোভের পথ পরিহার করে সে বন্ধুদের জানিয়ে দিল, সে আর ক্রিকেট বা শেয়ার বাজার নিয়ে স্বপ্ন দেখবে না। এই কাঁথা সে কেবল বড় কোনো বিপদ বা পরিবারের জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করবে। রিম তার পরিবারকে এক সুন্দর ও সচ্ছল জীবন উপহার দিল। বাবার ব্যবসা এখন সুপ্রতিষ্ঠিত।

    রিম নিজেও এখন এক সফল যুবক, নিজের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সে কোনোদিনই সেই কাঁথাটার কথা ভোলেনি। বহু বছর পর, রিম যখন নিজেই বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে, তার চুল পেকে সাদা হয়েছে, তখন সে তার নাতিকে কাছে ডাকল।

    সে জানত, প্রতিটি প্রজন্মের নিজস্ব কিছু লড়াই থাকে। কখনও অভাবের, কখনও বা অস্তিত্বের। রিমের নাতি এখন যে  এই বাড়িতে বড় হচ্ছে, সেখানে অভাবের কোনো ছাপ নেই, কিন্তু তার সামনে হয়তো আসবে অন্য কোনো বড় সংকট।

    কারণ সে জানে, তার ছেলের জীবনে এই কাঁথা সুপ্ত থাকবে, কিন্তু তার নাতির জীবনে এটি আবার জেগে উঠবে। রিম দাদুর সেই সেগুন কাঠের আলমারিটা খুলল। ধুলোহীন, সযত্নে রাখা সেই ৯ ফিট বাই ৯ ফিটের নকশি কাঁথাটা বের করল।

    কাঁথাটা এখনও আগের মতোই উজ্জ্বল আর উষ্ণ, এর জ্যামিতিক নকশাগুলো আজও রহস্যময়। রিম কাঁথাটা আবার ভাঁজ করে আলমারির একদম নিরাপদ তাকে তুলে রাখল। চাবিটা তার নিজের পুরনো ডায়েরির ভেতরে লুকিয়ে রাখল।

    সে তার ডায়েরিতে লিখে গেল: “এই কাঁথা কেবল শীত নিবারণের জন্য নয়, এটি অন্ধকারের পথপ্রদর্শক। যখন তোমাদের চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসবে, যখন যুক্তিতে কোনো সমাধান মিলবে না, তখন এই কাঁথার নিচে আশ্রয় নিও। বড়দিদার আশীর্বাদ এবং দাদুর আত্মা তোমাদের পথ দেখাবে।

    কিন্তু সাবধান, একে যেন কোনোদিন লোভের হাতিয়ার করো না। এর রহস্য  যেন শ্রদ্ধা আর ভালোবাসাতেই লুকিয়ে থাকে। মনে রেখো, এই ক্ষমতা তোমাদের বংশ পরম্পরায় এক প্রজন্ম পর পর জেগে উঠবে—লোভের আগুনের সাথে লড়াই করার শক্তি দিয়ে।” রিম আলমারির চাবিটা সযত্নে নিজের ড্রয়ারে রেখে দিল।

    সে জানে, একদিন তার পরবর্তী প্রজন্মের কেউ অভাবের তাড়নায় বা কোনো বড় সংকটে এই আলমারি খুলবে। আর তখনই ৯ ফিট বাই ৯ ফিটের এই ম্যাজিক আবার জেগে উঠবে, কোনো এক রাতে ভবিষ্যৎ দেখাবে নতুন কোনো উত্তরসূরিকে।

  • আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বাংলাদেশ !

    আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বাংলাদেশ !

    আমলা হলো যে কোন দেশের সরকারের উচ্চ পদস্থকর্মকর্তা। যারা সরকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা নিয়ম নীতি প্রনয়নে সরকারকে সহযোগিতা করেন। আমলাতন্ত্রের ইংরেজী শব্দ bureaucracy. এটি মূলতঃ ফারসি শব্দ। ফরাসি শব্দ ‘Bureau’ (ব্যুরো – অর্থ: ডেস্ক, অফিস বা টেবিল) এবং গ্রীক শব্দ ‘Kratos’ (ক্রাতোস – অর্থ: শাসন বা ক্ষমতা) এই দুইটি শব্দ মিলে bureaucracy শব্দটি গঠিত হয়েছে। আক্ষরিক অর্থে আমলাতন্ত্র হচ্ছে “দপ্তর সরকার” বা “ডেস্ক শাসন” (Desk Government)। এটি মূলতঃ এমন একটি শাসন ব্যবস্থা বা প্রশাসনিক কাঠামো, যা নিয়ন্ত্রিত হয় অফিসিয়াল কর্মকর্তাদের দ্বারা ।

    আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে জ্যাক ক্লদ মেরী ভিনসেন্ট ডি গৌনে আমলাতন্ত্র শব্দটি প্রথম ব্যবহার করলেও আমলাতন্ত্রের সূচনা হয়েছে মূলত ঃ ফ্রান্সের লুইরাজ বংশের অামল থেকে। ফ্রান্সের বিখ্যাত লুই রাজবংশের অত্যাধিক বিলাশীতা ও জনবিছিন্নতায় তাদের অধিনস্থ্য সরকারী উচ্চ পদস্থ্য কর্মারীরা সুযোগ বুঝে রাজকিয় ক্ষমতা সুকৌশলে হস্তগত করেন। বলা যায় লুই রাজবংশের হাত ধরেই পৃথিবীতে আমলাতন্ত্র অন-অনুষ্ঠানিক বিকাশ ঘটে।

    ফরাসী রাজবংশের বংশানুক্রমিক বিলাসীতা ও জনসংযোগ বিছিন্নতায় ক্রমে ক্রমেই গুপ্ত আমলাতন্ত্র তাদের বলয় ও প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। এই গোপন আমলাতন্ত্র প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীতে বিশ্বরাজনীতিতে ‘কূটনৈতিক বিপ্লব নামে প্রসারতা পায়। বলা যায়, বিশ্বরাজনীতিতে কূটনৈতিক তৎপরতা আমলাতন্ত্রেরই প্রত্যক্ষ ফল।

    দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে, আমলাতন্ত্রের বিস্তারের অন্যতম কারণ রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব। বিশেষ করে এই অঞ্চলটিতে সুশাসনের অভাব ও শাসকদের অতিমাত্রায় জনবিছিন্নতা এবং রাজনৈতিক অজ্ঞতার কারণে এখানে আমলাতন্ত্র রীতিমত ভয়ন্কর রুপ ধারন করেছে।

    এই অঞ্চলটির অন্যতম দেশে হিসাবে বাংলাদেশ ভৌগলিক অবস্থানগত কারণেই (জন্মলগ্ন থেকে) আমলাতন্ত্রে নির্মজ্জিত। এখানে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরা রাজনীতিতে অবস্থান করছেন। তথাকথিত গণতন্ত্রের কারণে এই দেশে আমলাতন্ত্রের গতি-প্রকৃতি দিন দিন লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েই চলছে।

    দিকদর্শন, স্বাধীনতাওর পর্ব থেকেই দেশটিকে অদূরদর্শী রাজনীতিকরা পেয়ে বসেছে। গণতন্ত্রের নামে অসৎ, লুটেরা এবং অশিক্ষিতরা অধিকাংশ হারে জনগনকে প্রলোভন দেখিয়ে নেতৃত্ব আসছেন। অজ্ঞ নেতৃত্বের কারণে এখানে গবেষণাধর্মী ও ত্ত্বাতিক উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না।

    অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী এই সকল রাজনীতিবিদরা দেশ প্রেম বা দেশের উন্নয়নের চেয়ে ব্যক্তিক উন্নয়নের দিকে বেশী ঝুকে পড়ছে। জাতীয় সম্পদ লুটপাট করে গড়ে তুলছে বিপুল বিত্ত-ভৈরব। আর তাদের এই সকল অবৈধ কাজকে কাগজ কলমে বৈধতা দিচ্ছে তাদের অধিনস্ত আমলারা।

    মূলতঃ চাকুরীতে অধিক প্রমোশন, নিদিষ্ট নিয়মের বাহিরে অধিক সুযোগ সুবিধা আদায় এবং  অকঠ্য প্রশাসনিক দূরব্যাধতা তৈরী করে তারা পরোক্ষ ভাবে রাজনীতি নিয়ন্ত্রন করছেন। ক্ষমতার পালা বদলে তারা দল বা ব্যক্তি বিশেষের উপর নির্ভর না করে ক্ষমতাকে টার্গেট করছেন।

    তথাকথিত গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও তারা “বহাল তবিয়তে” অবস্থান করছেন প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী দেশে একটি অবকাঠামোগত পরিবর্তনের সুযোগ আসলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তা আর সম্ভব হচ্ছে না। বলা যায় গণতান্ত্রিক সচলতা এখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় র্নিমজ্জিত। যার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ যত্রতত্র প্রশাসনিক কর্মকতা নিয়োগ প্রক্রিয়া।

    এই অবস্থা নিরসনে, তথাকথিত গণতান্ত্রিক ধারার পরির্বতন আবশ্যক। দেশ ও জাতির সর্বাঙ্গিন মঙ্গলের স্বার্থে পুরাতন নিয়ম নীতির উর্ধেব উঠে এখন একটি যুগোপযোগী সংবিধানই পারে অনেকাংশে আমলাতন্ত্রের লাগাম টানতে। অন্যথায় সরকারের ভিতরে আরো একটি সরকারের ‘দ্বৈত শাসন সৃষ্টি’ সময়ের অপেক্ষা মাত্র।

    মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, প্রধান সমন্বয়ক, জাতীয় নাগরিক পার্টি, সাটুরিয়া উপজেলা শাখা ।

     

  • মানিকগঞ্জে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র ও মেটলাইফের উদ্যোগে ‘বই মেলা’ অনুষ্ঠিত

    মানিকগঞ্জে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র ও মেটলাইফের উদ্যোগে ‘বই মেলা’ অনুষ্ঠিত

    বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের উদ্যোগে ও মেটলাইফ বাংলাদেশের সহযোগিতায় মানিকগঞ্জ সদর ও সিংগাইর উপজেলায় ৪ দিনব্যাপী এক জমজমাট বই মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মহান স্বাধীনতার এই মার্চ মাসের প্রথম দিন হতে জেলা সদরের বিজয় মেলা মাঠে ও সিংগাইর উপজেলা চত্বরে এই বই মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

    আলোকিত মানুষ গড়ার এই বই মেলায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের  ব্যাপক উপস্থিতি আর বিক্রিও হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ বই। বুধবার (৪ মার্চ)  মেলার সমাপনী অনুষ্ঠিত হয়। মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা প্রধান অতিথি হিসেবে বই মেলা উদ্বোধন করেন।

    এ সময় তিনি বলেন, একটি মেধাবী ও জ্ঞানী প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে অবশ্যই আমাদের সন্তানদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বই পড়ার অভ্যাস মানুষের মনের জানালা খুলে দেয় এবং জ্ঞান ও কল্পনার পরিধির বিকাশ ঘটায়। বিভিন্ন ডিভাইস আসক্তি থেকে মুক্ত রেখে আদর্শ মানুষ তৈরি করে।

    তিনি বলেন, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র এবং ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি মেটলাইফ মানুষ গড়ার এই যে মহান মিশন চালিয়ে যাচ্ছে এ জন্য তাদের অবশ্যই অভিনন্দন। সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ বই মেলার ইনচার্জ অমিত চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ফারজানা প্রিয়াংকা। তিনি বলেন, ছোটবেলা হতেই বাচ্চাদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে বড় হয়েই তারা বই পড়ে।

    অপর দিকে যারা ছোটবেলা হতে বই বিমুখ হয় তারা বড় হয়েও বই পড়তে চায় না। বইয়ের জ্ঞান ও শিক্ষার সাথে কখনও কোন ডিভাইসে দেখা ঘটনার তুলনা হয় না। যারা বই পড়ে তাদের মেধা, মননশীলতা আর প্রজ্ঞাই অনন্য হয়। তিনিও বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র ও মেটলাইফকে ধন্যবাদ জানান।

    বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মেটলাইফ শাহানুর এজেন্সি (মানিকগঞ্জ) ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মো. শাহানুর ইসলাম।

    তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের একজন ভক্ত। তাছাড়া অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের আলোকিত মানুষ গড়ার এই মহান মিশনের মেটলাইফ সার্বিক সহযোগিতা করে যাচ্ছে। আমি মেটলাইফের একজন সদস্য হিসেবে সত্যিই আজ গর্বিত।

    বিশ্ব সেরা বীমা কোম্পানি মেটলাইফ শুধুই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সিআরপির অসহায় মানুষের জন্য কিছুদিন আগে এই মানিকগঞ্জেই মেটলাইফ ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মেটলাইফ দেশের যে কোন প্রয়োজনে তার সহযোগিতার হাত সব সময় প্রসারিত করে আসছে।

    বাংলাদেশ নয় পুরো বিশ্বেই মেটলাইফ এক আস্থা ও ভালোবাসার নাম। বন্যা, মহামারি, শিক্ষা, চিকিৎসা, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা সহ নানাবিধ মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে মেটলাইফ ফাউন্ডেশন সেরা।

    এ সময় মেটলাইফ শাহানুর এজেন্সি ইউনিট ম্যানেজার মো. রমজান আলী ও মো. আসাদ হোসেনসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন

  • আব্দুর রউফ চৌধুরী সাহিত্য পদক পাচ্ছেন রফিকুর রশীদ ও আকিমুন রহমান

    আব্দুর রউফ চৌধুরী সাহিত্য পদক পাচ্ছেন রফিকুর রশীদ ও আকিমুন রহমান

    দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী-এর স্মৃতিকে ধারণ করে প্রবর্তিত ‘দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী সাহিত্য পদক ২০২৬’ পাচ্ছেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক রফিকুর রশীদ এবং কথাসাহিত্যিক-প্রাবন্ধিক আকিমুন রহমান।

    আগামী ৪ এপ্রিল ২০২৬ বিকেল ৩টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালা মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁদের হাতে পদক তুলে দেওয়া হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন আবুল কাসেম ফজলুল হক, সভাপতি, বাংলা একাডেমি।

    উদ্বোধক হিসেবে থাকবেন কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কথাসাহিত্যিক মনি হায়দার।

    এছাড়া অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, গবেষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও পাঠক-অনুরাগীরা অংশ নেবেন। পুরস্কারপ্রাপ্তদের সম্মাননা ক্রেস্ট, উত্তরীয় ও নগদ অর্থ প্রদান করা হবে।

    বাংলা সাহিত্যে সামগ্রিক অবদান, সৃজনশীলতা এবং সমাজমনস্ক সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ এই দুই সাহিত্যিককে পদক প্রদান করা হচ্ছে। তাঁদের রচনায় সমকালীন সমাজবাস্তবতা, ইতিহাসচেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। এর আগে দেশের বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও শিল্পীরা এ পদকে ভূষিত হয়েছেন।

    উল্লেখ্য, আব্দুর রউফ চৌধুরী বাংলা সাহিত্যে তাঁর দ্রোহী মনন, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবমুক্তির প্রত্যয়ে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তাঁর সাহিত্যকীর্তিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যেই প্রতিবছর এই সাহিত্য পদক প্রদান করা হয়।

  • আমার ভাষা আন্দোলন

    আমার ভাষা আন্দোলন

    পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পম্চিমারা নানান অযুহাতে বাঙ্গালীদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্ঠায় লিপ্ত হয়। প্রথম আঘাত আসে ভাষার উপর।। ফলে ১৯৪৭ সালের ১৯শে নভেম্বর বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, আইনজীবি, শিল্পী, সাংবাদিক ও সরকারী-বেসরকারী ও ওলামারা মুর্খ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে একটি স্বারক লিপি পেশ করেন। ১১মার্চ রাষ্ট্রভাষা সাবকমিটির উদ্দ্যোগে ধর্মঘট ও ছাত্র বিক্ষোভের আহব্বান করা হয়।

    এই বিক্ষোভ থেকে তোয়াহা, ওলি আহাদ, শেখ মজিব, বাহাউদ্দিন চৌধূরীসহ ৬৯ জন ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়।  ১৪ই মার্চ তারা মুক্তি পেলে  ১৫ই মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ‘সাধারন ছাত্রসভা আহুত হয়। ১৯৪৭  সালের ৭ ডিসেম্বর ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র/ছাত্রীদের সম্মেলনে ঢাকসুর ভি.পি ফরিদ আহম্মদ ‘বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা ও শিক্ষার বাহনের দাবি করেন। তিনি বলেন ‘রাষ্ট্রভাষা, লিঙ্গুয়া, ফ্রান্কা নিয়ে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে তার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পূর্ববাংলার জনগনের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা।

    ১৯৪৭ সালের ১লা সেপ্টমবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ ও রসায়ন বিভাগের দুই অধ্যাপক জনাব আবুল কাশেম ও নূরুল হক পাকিস্তান ‘তমদ্দুন মজিলস নামে একিট সংগঠেনর গোড়াপওন করেন । ১৯৪৭ সালে ঢাকায় তমুদ্দিন মজলিসের উদ্দোগে এক সাহিত্য সম্মেলনে পূববাংলা সরকারের মন্ত্রী ও সাহিত্যিক জনাব হাবিবুল্লাহ বাহারে সভাপতিত্বে বক্তাগন বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রকাশ দাবি করেন।

    ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর জিয়া উদ্দিন আহম্মদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার সপক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। কিন্তু জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এর প্রতিবাদ জানান। দৈনিক আজাদ পত্রিকায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা র্শীষক নিবন্ধে তিনি লেখেন ‘পাকিস্তান ডোমিনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলের অধীবাসিদের মাতৃভাষা বিভিন্ন যেমন পশতু, বেলুচি, পাঞ্জাবী, সিন্ধি এবং বাংলা, কিন্তু উর্দু কোন অঞ্চলের মাতৃভাষা রুপে চালু নাই। যদি বিদেশী ভাষা বলিয়া ইংরেজী ভাষাকে অবজ্ঞা করা হয় তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারুপে গ্রহন না করার পক্ষে কোন যুক্তি নাই।

    এরই প্রেক্ষাপটে করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব পাশ হয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষা বাংলা ও উর্দু করার সুপারিশ করা হয়। ফলে ১৫ই ফ্রেরুয়ারী প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন রাষ্ট্রভাষা ‘সংগ্রাম পরিষদের’ সাথে এক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তিতে বলা হয় ‘এপ্রিল মাসের ব্যবস্থাপনা সভায় এই বিষয়ে একটি প্রস্তাব উপস্তাপন করা এবং পাকিস্তান গনপরিষদও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এই ব্যাপারে একটি বিশেষ প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে।

    ১৯৪৮ সালের ২৫শে ফ্রেরুয়ারী কংগ্রেস নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তান গনপরিষদে সর্বপ্রথম ইংরেজী, উর্দু ভাষার পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা করা প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। কংগ্রেস সদস্য শ্রীশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত, ও হেমহরি বর্মা তার এই প্রস্তাকে সমর্থন করেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধীতা করেন। ১৯৪৭ সালের ১১ই মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সারাদেশে সাধারন ধর্মঘট পালিত হয়। উপায় অন্ত না দেখে খাজা নাজিমুদ্দিন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সাথে চুক্তির একটি চুক্তি হয়।

    কিন্তু হঠাৎ করেই ১৯৪৯ সালের ২৪শে মার্চ পাকিস্তানের গর্ভনর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক ঝটিকা সফরে ঢাকায় এসে রমনার রেস্ কোর্স ময়দানে পাচঁলক্ষ লোকের সমাবেশে ঘোষনা করেন ‘উর্দু, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তাৎক্ষনীক ছাত্রসমাজ এর তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং পরের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র/ছাত্রীদের পক্ষ থেকে শাসছুল হক, তোয়াহা, কামরুদিন, আবুর কাশেম, লিলিখান, অলি আহাদ, নইমুদ্দিন আহমেদ শামসল আলম ও সৈয়দ নজরুল ইসলামের পক্ষ থেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাকে একটি স্বারক লিপি দেওয়া হয়। তা সত্যেও জিন্নাহ সাহেব ঢাকায় তার বিদায়ই ভাষনেও সবায়কে পাকিস্তানী হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন ‘বাঙ্গালী, সিন্ধি ও পাঞ্জাবী বেলুচি পরিচয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য বিপদজ্জনক।

    ১৯৪৮  সালের ২৭শে ফ্রেরুয়ারী সামছুল আলমকে আহব্বায়ক করে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ছাত্রদের প্রচন্ড আন্দোলনের মুখে পরবর্তীকালে জিন্নাহ গোপনে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের সাথে দেখা করে ‘বাংলাকে‘ প্রাদেশিক সরকারি ভাষা হিসাবে মেনে নিয়ে পূর্ববাংলার ছাত্রসমাজের সাথে একটি আপোষ রফার ব্যাপারে মধ্যস্থতা করার অনুরোধ জানান। ঢাকসুর ভি.পি ফরিদ উদ্দিন, সাধারন সম্পাদক গোলাম আজম ও আব্দুর রহমান চৌধুরী (মহসীন হলের সহ-সভাপতি) আপোষ প্রস্তাবে রাজী হলেও শেখ মজিবুর রহমান, তোয়াহা, অলি আহাদ, তাজউদ্দিন আহম্মদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম আন্দোলন চলিয়ে যাওয়ার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন।

    শেখ মজিবুর রহমানের এইরুপ একক নেতৃত্বের কারনে পরবর্তীতে তাদের সাথে দ্বন্দের সূত্রপাত হয় এবং তারা ভিন্ন শিবিরে স্বাধীনতা বিরোধীতা করেন । ১৯৪৮  সালের ১১ই মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সারাদেশে সাধারন ধর্মঘট পালিত হয়। ২৭ ডিসেম্বর করাচিতে নিখিল পাকিস্তান শিক্ষক সম্মেলনের উদ্বোধণী ভাষনে কেন্দ্রীয় শিক্ষা সচিব ফজলুর রহমান বাংলাভাষায় আরবি হরফ যুক্ত করার পক্ষে জোরাল চুক্তি প্রর্দশন করেন।

    ১৯৪৮ সালের ৩১শে ডিসেম্বর কার্জন হলে ‘পূর্বপাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান তা যেমন সত্য, তার চেয়ে সত্য আমরা বাঙ্গালী; এটি কোন আদর্শের কথা নয়, এটি বাস্তবসত্য। ১৯৪৯ সালের ৭ই ফ্রেরুয়ারী পেশোয়ারে পাকিস্তান শিক্ষা উপদেষ্ঠা, বোর্ড সভায় বাংলা বর্ণমালা বিলুপ্ত করে আরবী হরফ প্রবর্তনের পক্ষে ধর্মীলেবাসে নানা যুক্তি প্রদর্শন করেন। ফলে সচতুর রাজরৈতিক নেতৃত্ব ১৯৪৯সালের ২৩শে জুন পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল হিসাবে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠাব করেন।

    এই সংগঠনটি শুরু থেকেই পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রকার অন্যায়-অত্যাচার, শোষন ও নীপিড়নের বিরোদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে। ১৯৪৯ সালের ১২ই মার্চ পাকিস্তান সংবিধান সভার প্রস্তাব অনুসারে শাসনতান্ত্রিক মূলনীতি নির্ধারন কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি  সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সংবিধান সভায় তোদের অন্তবর্তীকালীন রির্পোটে শাসনতান্তিক বিষয়ে রাষ্টভাষাকে ‘উদ্দু’ করার সুপারিশ করে। ইতিপূর্বে ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে ঢাকা আরমানিঢোলা ময়দানে নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের এক জন সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত জনসভায় মওলানা ভাসনী ও শামছুল হক (১ম সাধারন সম্পঁদক আওয়ামীলীগ) এর নেতৃত্বে এক বিক্ষোভ মিছিল গর্ভমেন্ট হাইজের দিকে রওয়ানা হেল পুলিশ বাধা প্রদান করে ।

    আন্দোরনকারীরা বাধা উপেক্ষ করে সামনের দিকে অগ্রসর হলে- আইন শৃংখলা ভঙ্গের অজুহাতে মওলানা ভাসনী ও শামছুল হককে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৮ সালের ১২ অক্টোবর এই সংবিধান কমিটি পাকিস্তান অবর্জাভার অফিসে এক সভার আহব্বান করে এবং তাতে কমরুদীন আহম্মদ আতাউর রহমান খান, মোহাম্মদ তোয়াহা, তাজউদ্দিন আহম্মদ পাকিস্তান অবজাভারের সম্পাদক আব্দুস ছালাম ও মানিক মিয়া অংশ গ্রহন করেন। বৈঠকে আন্দোলনের কর্ম-পরিকল্পনা এবং পরিধি নিয়ে আলোচনা হয়।

    ১৯৫০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মূলনীতি নির্ধারক কমিটির রির্পোট প্রকাশের সাথে সাথে ঢাকার রাজৈনিতক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয় । পূর্ব বাংলার উপর একটি অগনতান্ত্রিক প্রস্তাব চাপিয়ে দেওয়ার চক্রন্তের বিরোদ্ধে স্বঃফুর্ত প্রতিবাদে পাকিস্তান অবর্জাভার অফিসে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে ডেমোক্রেটিভ ফেডারেশনের নামে একটি সংগঠেনর জন্ম হয়। এই ডেমোক্রেটিভ ফেডারেশনের সদস্যবৃন্দ বিকল্প শাসনতন্তের খড়সা তৈরির জন্য সংবিধান কমিটি নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেন।

    ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিনের ভাষণ প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন খাজা নাজিমুদ্দিন ২৫ জানুয়ারি ঢাকায় আসেন এবং ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানের এক জনসভায় দীর্ঘ ভাষণ দেন। তিনি মূলত জিন্নাহ্’র কথারই পুনরুক্তি করে বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচারিত তাঁর ভাষণে তিনি আরো উল্লেখ করেন যে কোনো জাতি দু’টি রাষ্ট্রভাষা নিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারেনি।নাজিমুদ্দিনের বক্তৃতার প্রতিবাদে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২৯ জানুয়ারি প্রতিবাদ সভা এবং ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালন করে।

    সেদিন ছাত্রসহ নেতৃবৃন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় সমবেত হয়ে ৪ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সভা এবং ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।পরে তারা তাদের মিছিল নিয়ে বর্ধমান হাউসের (বর্তমান বাংলা একাডেমী) দিকে অগ্রসর হয়। পরদিন ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার লাইব্রেরি হলে অনুষ্ঠিত সভায় মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ৪০ সদস্যের সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মী পরিষদ গঠিত হয়।সভায় আরবি লিপিতে বাংলা লেখার সরকারি প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করা হয় এবং ৩০ জানুয়ারির সভায় গৃহীত ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন দেয়া হয়। পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল, সমাবেশ ও মিছিলের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে।

    পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে এসে সমবেত হয়। সমাবেশ থেকে আরবি লিপিতে বাংলা লেখার প্রস্তাবের প্রতিবাদ এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের দাবি জানানো হয়। ছাত্ররা তাদের সমাবেশ শেষে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করে।

    ২০ ফেব্রুয়ারি সরকার স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় এক মাসের জন্য সভা, সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিভিন্ন হলে সভা করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ৯৪ নবাবপুর রোডস্থ আওয়ামী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মী পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরিষদের কিছু সদস্য নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার পক্ষে থাকলেও, সবশেষে ১১-৩ ভোটে[ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

    ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে একই বিষয় নিয়ে পৃথক পৃথক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় সলিমুল্লাহ হলে ফকির শাহাবুদ্দীনের সভাপতিত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ফজলুল হক মুসলিম হলে অনুষ্ঠিত সভায় নেতৃত্ব দেন আবদুল মোমিন। শাহাবুদ্দিন আহমদের প্রস্তাব অনুযায়ী রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকে এই সিদ্ধান্তটি জানিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নেন আবদুল মোমিন এবং শামসুল আলম।

    পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচী অনুযায়ী এ দিন সকাল ৯টা থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে এসে জড়ো হয়। তারা ১৪৪ ধারা জারির বিপক্ষে স্লোগান দিতে থাকে এবং পূর্ব বঙ্গ আইন পরিষদের সদস্যদের ভাষা সম্পর্কে সাধারণ জনগণের মতামতকে বিবেচনা করার আহ্বান জানাতে থাকে। পুলিশ অস্ত্র হাতে সভাস্থলের চারদিক ঘিরে রাখে। বিভিন্ন অনুষদের ডীন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ঐসময় উপস্থিত ছিলেন।

    বেলা সোয়া এগারটার দিকে ছাত্ররা গেটে জড়ো হয়ে প্রতিবন্ধকতা ভেঙে রাস্তায় নামার প্রস্তুতি নিলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে ছাত্রদের সতর্ক করে দেয়।কিছু ছাত্র ঐসময়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের দিকে দৌঁড়ে চলে গেলেও বাদ-বাকিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে পুলিশ দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং পুলিশের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে।

    উপাচার্য তখন পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ বন্ধ করতে অনুরোধ জানান এবং ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দেন। কিন্তু ছাত্ররা ক্যাম্পাস ত্যাগ করার সময় কয়েকজনকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অভিযোগে পুলিশ গ্রেফতার শুরু করলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ছাত্রকে গ্রেফতার করে তেজগাঁও নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় ছাত্ররা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে পুনরায় তাদের বিক্ষোভ শুরু করে।

    বেলা ২টার দিকে আইন পরিষদের সদস্যরা আইনসভায় যোগ দিতে এলে ছাত্ররা তাদের বাঁধা দেয়। কিন্তু পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে যখন কিছু ছাত্র সিদ্ধান্ত নেয় তারা আইনসভায় গিয়ে তাদের দাবি উত্থাপন করবে। ছাত্ররা ঐ উদ্দেশ্যে আইনসভার দিকে রওনা করলে বেলা ৩টার দিকে পুলিশ দৌঁড়ে এসে ছাত্রাবাসে গুলিবর্ষণ শুরু করে।
    পুলিশের গুলিবর্ষণে আব্দুল জব্বার এবং রফিক উদ্দিন আহমেদ ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এছাড়া আব্দুস সালাম, আবুল বরকতসহ আরও অনেকে সেসময় নিহত হন। ঐদিন অহিউল্লাহ নামের একজন ৮/৯ বছরেরে কিশোরও নিহত হয়।

    ছাত্র হত্যার সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে জনগণ ঘটনাস্থলে আসার উদ্যোগ নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সমস্ত অফিস, দোকানপাট ও পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্রদের শুরু করা আন্দোলন সাথে সাথে জনমানুষের আন্দোলনে রূপ নেয়।রেডিও শিল্পীরা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে শিল্পী ধর্মঘট আহ্বান করে এবং রেডিও স্টেশন পূর্বে ধারণকৃত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতে থাকে।

    ঐসময় গণপরিষদে অধিবেশন শুরুর প্রস্তুতি চলছিল। পুলিশের গুলির খবর জানতে পেরে মাওলানা তর্কবাগিশসহ বিরোধী দলীয় বেশ কয়েকজন অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করে বিক্ষুদ্ধ ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়ান। গণপরিষদে মনোরঞ্জন ধর, বসন্তকুমার দাস, শামসুদ্দিন আহমেদ এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত-সহ ছোট ছয়জন সদস্য মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনকে হাসপাতালে আহত ছাত্রদের দেখতে যাবার জন্যে অনুরোধ করেন এবং শোক প্রদর্শনের লক্ষ্যে অধিবেশন স্থগিত করার কথা বলেন।

    কোষাগার বিভাগের মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশ, শরফুদ্দিন আহমেদ, সামশুদ্দিন আহমেদ খন্দকার এবং মসলেউদ্দিন আহমেদ এই কার্যক্রমে সমর্থন দিয়েছিলেন। যদিও নুরুল আমিন অন্যান্য নেতাদের অনুরোধ রাখেননি এবং অধিবেশনে বাংলা ভাষার বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন।

    ১৯৫১ সালে লাহোরে কায়েদে মিল্লাত লিয়াকত আলী খান আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। ফলে সারাদেশ ব্যাপি রাজ নৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশীক পরিষদ নির্বাচনে ঘোষিত হলে মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে অন্যান্য দল মিলে যুক্তফ্রন্ট নামীয় একটি সমন্বিত বিরোধী ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ গঠন করার উদ্যোগ নেয়া হয় এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর তারিখে কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও পাকিস্তান খেলাফত পার্টির সঙ্গে মিলে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠন ।

    যুক্তফ্রন্টের প্রধার তিন নেতা ছিলেন মওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এই যুক্তফ্রন্ট ২১ দফার একটি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে। যথা-

    ১. বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হবে। ২. বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি ও সমস্ত খাজনা আদায়কারী স্বত্ব উচ্ছেদ ও রহিত করে উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিতরণ এবং খাজনা হ্রাস ও সার্টিফিকেট মারফত খাজনা আদায় রহিত করা হবে। ৩. পাট ব্যবসা জাতীয়করণ এবং তা পূর্ববঙ্গ সরকারের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় আনা এবং মুসলিম লীগ শাসনামলের পাট কেলেঙ্কারির তদন্ত ও অপরাধীর শাস্তি বিধান করা। ৪. কৃষিতে সমবায় প্রথা প্রবর্তন এবং সরকারি সাহায্যে কুটির শিল্পের উন্নয়ন। ৫. পূর্ববঙ্গকে লবণ শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা। ৬. কারিগর শ্রেনীর গরীব মোহাজেরদের কর্মসংস্থানের আশু ব্যবস্থা। ৭. খাল খনন ও সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে বন্যা ও দূর্ভিক্ষ রোধ । ৮. পূর্ববঙ্গে কৃষি ও শিল্প খাতের আধুনিকায়নের মাধ্যমে দেশকে স্বাবলম্বী করা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) মূলনীতি মাফিক শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা। ৯. দেশের সর্বত্র অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার প্রবর্তন এবং শিক্ষকদের ন্যায্য বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা। ১০. শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার, মাতৃভাষায় শিক্ষাদান, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের ভেদাভেদ বিলোপ করে সকল বিদ্যালয়কে সরকারি সাহায্যপুষ্ট প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। ১১. ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রভৃতি প্রতিক্রিয়াশীল আইন বাতিল এবং উচ্চশিক্ষা সহজলভ্য করা। ১২. শাসনব্যয় হ্রাস, যুক্তফ্রন্টের কোনো মন্ত্রীর এক হাজার টাকার বেশি বেতন গ্রহণ না করা। ১৩. দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ-রিশ্ওয়াত বন্ধের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন। ১৪. জননিরাপত্তা আইন, অর্ডিন্যান্স ও অনুরূপ কালাকানুন বাতিল, বিনাবিচারে আটক বন্দির মুক্তি, রাষ্ট্রদ্রোহিতায় অভিযুক্তদের প্রকাশ্য আদালতে বিচার এবং সংবাদপত্র ও সভাসমিতি করার অবাধ অধিকার নিশ্চিত করা। ১৫. বিচারবিভাগকে শাসনবিভাগ থেকে পৃথক করা। ১৬. বর্ধমান হাউসের পরিবর্তে কম বিলাসের বাড়িতে যুক্তফ্রন্টের প্রধান মন্ত্রীর অবস্থান করা এবং বর্ধমান হাউসকে প্রথমে ছাত্রাবাস ও পরে বাংলা ভাষার গবেষনাগারে পরিণত করা। ১৭. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ ঘটনাস্থলে শহীদ মিনার নির্মাণ করা এবং শহীদদের পরিবারবর্গকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া। ১৮. একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস এবং সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষনা করা। ১৯. লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গের পূর্ণ স্বায়ত্তসাশন এবং দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মূদ্রা ব্যতীত সকল বিষয় পূর্ববঙ্গ সরকারের অধীনে আনয়ন, দেশরক্ষা ক্ষেত্রে স্থলবাহিনীর হেডকোয়ার্টার পশ্চিম পাকিস্তানে এবং নৌবাহিনীর হেডকোয়ার্টার পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপন এবং পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্রনির্মাণ কারখানা স্থাপন ও আনসার বাহিনীকে সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত করা। ২০. কোনো অজুহাতে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা কর্তৃক আইন পরিষদের আয়ু না বাড়ানো এবং আয়ু শেষ হওয়ার ছয়মাস পূর্বে মন্ত্রিসভার পদত্যাগপূর্বক নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। ২১. যুক্তফ্রন্টের আমলে সৃষ্ট শূন্য আসন তিন মাসের মধ্যে উপনির্বাচনের ব্যবস্থা করা এবং পরপর তিনটি উপনির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী পরাজিত হলে মন্ত্রিসভার পদত্যাগ করা।

    ১৯৫৪ সালের মার্চের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন অর্জ্জন করে। তন্মধ্যে ১৪৩টি পেয়েছিল মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী মুসলিম লীগ, ৪৮টি পেয়েছিল শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামী ইসলাম পার্টি লাভ করেছিল ২২, গণতন্ত্রী দল লাভ করেছির ১৩টি এবং খেলাফত-ই-রাব্বানী নামক দলটি ১টি আসন। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ সম্পূর্ণরূপে এ নির্বাচনে পরাভূত হয় ; তারা কেবল ৯টি আসন লাভ করতে সমর্থ হয়।

    এ নির্বাচনে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য ৭২টি আসন সংরক্ষিত ছিল। এগুলোর মধ্যে কংগ্রেস লাভ করেছিল ২৪টি আসন, কমিউনিস্ট পার্টি ৪টি, শিডিউল্ড কাস্ট ফাউন্ডেশন ২৭টি, গণতন্ত্রী দল ৩টি এবং ইউনাইটেড পগ্রেসিভ পার্টি ১৩টি আসন লাভ করেছিল। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী একটি আসনে জয়ী হয়েছিলেন।১৯৫৪ সালের ৩ রা এপ্রিল শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুক হক চার সদস্য বিশিষ্ট যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা গঠন করেন।

    পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী পরিষদ গঠন করা হয় ১৫ মে তারিখে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুর হক। যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় এসে বাংলা একাডেমী গঠন করে।এ প্রতিষ্ঠান বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের সংরক্ষণ, গবেষণা এবং মান উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করবে বলে গঠনতন্ত্রে উল্লেখ করা হয়। যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল মাল গোলাম মাহমুদ ১৯৫৪ সালের ৩০ মে তারিখে কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক সরকার বাতিল ঘোষণা করে। ১৯৫৫ সালের ৬ জুন তারিখে যুক্তফ্রন্ট পুণর্গঠন করা হয়; যদিও আওয়ামী লীগ মন্ত্রী পরিষদে যোগদেয়নি।

    ১৯৫৪ সালের ৩১ মে ‘ব্লাসফেমি’ আইন জারি করে পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রী পরিষদ বাতিল করে দিয়ে শাসনতন্ত্রের ৯২ (ক) ধারা জারীর মাধ্যমে প্রদেশে গভর্ণরের শাসন প্রবর্তন করেন। একথা সত্য যে, ১৯৫6 সালের ১২ সেপ্টেম্বর হোসেন শহীদ সোহ্ওয়ার্দীর প্রধানমন্ত্রিত্বে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ ও রিপাবলিকান পার্টির কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হলে সোহ্ওয়ার্দী সাহেব মার্কিনমূখী পররাষ্ট্রণীতি গ্রহন করেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সিয়াটো, সেন্টো প্রভুতি সামরিক চুক্তির পক্ষ অবলম্বন করেন।

    সাথে আরো ছিল মৌলানা আতাহার আলীর নেজামে ইসলাম পার্টি। গনতন্ত্রী দলের নেতা ছিলেন হাজী মোহাম্মদ দানিশ এবং মাহমুদ আলি সিলেটি। ফলে কেন্দ্রীয় সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এইরুপ আমেরিকাপন্থী মতাদর্শের কারনে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রাদেশীক সভাপতি মওলানা ভাসানীর সাথে মতানৈক্য দেখা দেয়।  ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামেয় দলটি থেকে সম্প্রদায়িক ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে দলটিকে অসম্প্রদায়ীক ও সর্বজনীন করে নির্বানে অংশ গ্রহনের তুরজুর চলে। কেন্দ্রীয় সভাপতি ও প্রাদেশীক সভাপতির পরস্পর ভিন্ন মতার্দশের কারনে আওয়ামী লীগ ভেঙ্গে  যায় এবং মওলানা ভাষানির নেতৃত্বে ন্যাশনার আওয়ামী লীগ নামে একটি নতুন দলের সৃষ্টি হয়।

    https://banglatopnews24.com/emer-bese-endulon/

  • ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতি গঠণে ‘ট্যার্নিং পয়েন্ট’

    ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতি গঠণে ‘ট্যার্নিং পয়েন্ট’

    গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সুষ্ঠ ও সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলার জন্য একটি আদর্শীক রাষ্ট্র-কাঠামো প্রয়োজন। রাষ্ট্র বা সমাজে ন্যায়ণীতি পরায়ন ব্যক্তির নেতৃত্বে ‘ সরকার বা দেশ পরিচালিত হলে তাদের কাছ থেকে জবাবদেহীমূলক সেবা ও অধিকার আশা করা যায়। কিন্তু অতিব দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে বিগত ৫৪ বছরেও একটি ন্যায়ণীতি পরায়ণ বা জবাবদেহীমূলকঃ সরকার গঠিত হয়নি। যার কারণে বরাবরই জনগন তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

    স্বাধীনতাত্তর বাংলাদেশে যে কয়টি সরকার গঠিত হয়েছে তারা অধিকাংশই ছিল আত্মকেন্দ্রীক। দেশে ও জনগণের ভালোতে তাদের অবদান আশানুরুপ ছিল না। বলাযায়, তারা ভালোর খোলসে আবৃত্ত একটি পচনশীল সরকার ছিল যা কেবল দলিয় বিনিময়ে চলনশীল ছিল। এই, ধোকাবাজ ও অসার নেতৃত্বের কারণে দীর্ঘ  ৫৪ বছরেও বাংলাদেশ তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি।

    বিশেজ্ঞদের মতে, বিগত সময়ে বাংলাদেশের বৃহৎ তিনটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসলেও তারা জনগণের আশা পুরন করতে পারেনি। নির্বাচিত হওয়ার আগে তারা বিভিন্ন প্রতিশ্রতি দিলেও ক্ষমতা দখল করার সাথে সাথে তার সন্ত্রাস, চাদাঁবাজী ও লুন্ঠনে সময় পার করেছে। দেশের বিপুল পরিমান সম্পদ বিদেশে পাচার করে গড়ে তুলছে প্রমোদ-অট্রলিকা।

    সর্বোপরি তারা অসম রাজনৈতিক মন্ত্র বলে গড়ে তুলেছে একটি অস্থির প্রজন্ম যারা জনসেবার পরির্বতে ক্ষমতা আর পেশী শক্তিকে ব্যবহার করে জনসাধারনকে ভয় দেখিয়েছে বা ক্রমাগত ‘পদানত করেছে। ফলে, অনুপাতিক হারের অধিকাংশ শান্তি প্রিয় মানুষ ‘এক অসুস্থ্য রাজনৈতিক ব্যধিতে’ মারাত্বক ভাবে আক্রান্ত হয়েছে। বিগত ৫৪ বছর ধরে চলতে থাকা এই ব্যাধি ক্রমাগত বেড়ে এখন মহামারির রুপ ধারন করেছে।

    এমতবস্থায়, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশ ও জাতি গঠণে ‘ট্যার্নিং পয়েন্ট’ হিসাবে বিবেচিত। কারণ একটি যুগান্তকারী বিপ্লবের মাধ্যমে গঠিত ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ আসন্ন নির্বাচনের দায়িত্ব নিয়েছে। বহুদিনের আশাহত জাতি নতুন আশায় জাগ্রত হয়েছে। ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে তারা একটি নিরপেক্ষ ও সুন্দর নির্বাচন দেখতে চান।

    বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দেড় বছরে তাদের অনেক সিদ্ধান্তেই জাতি আশাবাদী হয়েছেন। ইতিমধ্যে সত্য ও ন্যায়ের স্লোগানে যুব-তরুণ সমাজ কুসংস্কারের প্রাচীর ভাঙ্গতে শুরু করেছে। জুলাই বিপ্লব জানিয়ে দিয়েছে তারা শাসক নামক জালিমদের আর ভয় পায় না। আবু-সাঈদ ও হাদির পথেই এসকল যুবকেরা সত্য ও সুন্দরের পথে বুকে তাজা বুলেট নিতে ডাক দিয়েছে-

    `কারার ঐ লৌহ কপাট
    ভেঙে ফেল কর রে লোপাট
    রক্ত জমাট শিকল পুজোর পাষাণ বেদী
    ওরে ও তরুণ ঈষাণ
    বাজা তোর প্রলয় বিষাণ
    ধ্বংস নিশান উক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি’ ॥

    সত্য সুন্দরের পথের এই অগ্রযাত্রায় দেশবাসী অংশ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে- কেবল আদর্শীক ও নিষ্ঠাবান নেতৃত্বই পারে একটি কল্যাণকর ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে। তাই আসুন হাতে হাত রাখি, সত্য সুন্দরের পথে থাকি।

    মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, প্রধান সমন্বয়ক, জাতীয় নাগরিক পার্টি সাটুরিয়া উপজেলা শাখা।
  • “এসপ্রেসো”

    “এসপ্রেসো”

    তোমার শহর ছেড়ে দিয়েছি
    ভুলে গিয়েছি, বাতাসের গন্ধ
    -মিতালী মৃদতায়,
    পাশে থাকার আনন্দ।।

    ছিল, অমৃত সাধ
    কাঁটাতে দিবস-রাত-
    অতি চুপিসারে-
    তোমার নগ্ন বুকেঁ।।

    হারিয়ে ফেলেছি পথ
    যা ছিল চির-চেনা,
    স্বরণে কৃতার্থতা,
    শোধিতে দায় -দেনা।

    অকারণ, বাড়ছে বাতুলতা!
    আজ, দেউরী ধারায়,
    চুপি-চুপি কানাঘোষা
    -পাড়ায় পাড়ায়।

    এ নাকি প্রেম রোগ ?
    নাই যার সুখ-দুখ!
    অকারণে বিলাপ হাসিঁ
    চিরন্তন ছেড়ে, কল্পনা ভালবাসি !