আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারী ২০২৬ সাল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দীর্ঘ ১৭ বছর ভোট না দিতে পারা বাংলার আপামর জনতা মুখিয়ে আছে আসন্ন নির্বাচনে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে। বহুল কাঙ্খিত এই নির্বাচনে, সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের নিয়ে একটি জন-বান্ধব সরকার গঠিত হবে এই প্রত্যাশা দেশের সকল মানুষের। তারই ধারাবাহিকতায় ইতিমধ্যে সারাদেশ জোড়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে, (আসন ভিত্তিক) প্রচারনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা বিজয়ের প্রত্যাশা নিয়ে তাদের নিজ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে-মানুষের দ্বারে দ্বারে ভোট প্রাথর্ণা করছেন।
একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশের ‘নির্বাচনী-রাজনীতির’ অমূল পরিবর্তন হয়েছে। তাই, এবারের নির্বাচনের ফলাফল প্রার্থীদের অতীতের কাজ এবং ভবিষ্যৎ কর্ম-প্রতিজ্ঞার উপর বিরাট প্রভাব ফেলবে এমন আশাবাদ বিশেজ্ঞদের। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণে- ঢাকার নিকটবর্তী মানিকগঞ্জ-৩ (মানিকগঞ্জ সদর-সাটুরিয়া) আসনে কে হতে যাচ্ছেন আগামী দিনের (সংসদ সদস্য) কান্ডারী তার চুলচেরা বিশ্লেষন চলছে জন-মহলে।
মানিকগঞ্জ-৩ (ঢাকার নিকটবর্তী) আসনটি নানান দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই আসনটিকে অদূর ভবিষ্যতে একটি ‘সম্ভাবনাময় শিল্প এলাকা’ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তাছাড়া কৃষিজ (শাক-সবজি ও তরী তরকারী) দ্রব্য উৎপাদনে এই আসনটির জাতীয় পর্যায়ে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছে। পরিসংখ্যানে দেখাগেছে, ঢাকা শহরে আমদানীকৃত ৪০ শতাংশ কৃষিজ দ্রব্য (শাক-সবজি ও তরী-তরকারী) মানিকগঞ্জ-৩, এর মানুষ যোগান দিয়ে থাকে। সম্ভাবনাময় শিল্প এলাকাটিতে ইতিমধ্যেই বৃহত্তর শিল্প পরিবার- বসুন্ধরা গ্রুপ, আকিজ গ্রুপ, তারাসীমা (বি২বি গ্রুপ) ও মুন্নু গ্রুপ তাদের ভবিষ্যৎ বৃহৎ-পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে দিয়েছে। তাই, সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে মানিকগঞ্জ-৩ আসনের গুরুত্ব অপরীসিম।
মানিকগঞ্জ-৩ আসনটি- মানিকগঞ্জ সদর এবং সাটুরিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত। এই আসনটিতে মোট ভোটার সংখ্যা- ৩,৫৮,৪৬১ জন (পুরুষ- ১৭৮৫৪৭ এবং নারী- ১,৭৯,৯১৪ জন)। এর মধ্যে মানিকগঞ্জ সদরে মোট ভোটার সংখ্যা ২০,৬১২৪ জন এবং সাটুরিয়া উপজেলায়-১৫২৩৩৭ জন। স্বাধীনতা পরবর্তী দশবারের নির্বাচনে এই আসনটিতে পাচঁবার জাতীয়তাবাদী পার্টি বিএনপি, একবার জাতীয় পার্টি, এবং বিতর্কীত নির্বাচন করে চারবার আওয়ামীলীগের প্রার্থীরা (পর্যাক্রমে) ক্ষমতা ভোগ করেছেন। কিন্তু যুগ-উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় এই আসনটিতে তেমন শ্রীবৃদ্ধি হয়নি। যতটুকু উন্নয়ন হয়েছে-তার অধিকাংশই শহরকেন্দ্রীক।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে- বিএনপির মনোনিত আফরোজা খানম রিতা (ধানের শীষ প্রতিক), বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা (ফুটবল ), জাতীয় পার্টির আবুল বাশার বাদশা (লাঙ্গল), বাংলাদেশ জাসদের মোঃ শাহজাহান আলী সাজু (মোটরগাড়ী), রফিকুল ইসলাম খান-স্বতন্ত্র (মোটর সাইকেল) মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ (বাইসাইকেল) আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মফিজুল ইসলাম খান কামাল (সূর্যমূখী ফুল), ১০ দলিয় ঐক্যজোটের প্রার্থী (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস) মোঃ সাঈদ নূর (রিকসা) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শামসুদ্দিন সাহেব (হাতপাখা) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছেন।

আফরোজা খান রিতাঃ আফরোজা খান রিতা বাংলাদেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা (সাবেক মন্ত্রী) হারুন-আর রশিদ মুন্নু মিয়ার মেয়ে। উত্তরাধীকার সূত্রেই তিনি রাজনীতি ও অথনৈতিক ভাবে শক্তিশালী প্রার্থী। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে তিনিই ছিলেন মানিকগঞ্জের নির্যাতিত বিএনপির নেতাকর্মীদের একমাত্র র্ত্রানকর্তা। দুঃসময়ে দলের প্রতি তার সহমর্মীতা ও সহযোগিতা নিঃসন্দেহে স্বরনীয়। সেই সুবাদে এই আসনটিতে তার ভালো ফলাফলের সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া স্বধীনতাত্তোর কাল থেকেই এই আসনটি বিএনপির ঘাটি হিসাবে পরিচিত। জনমত জরিপে. এখানে বিএনপি দলীয় প্রার্থী আরোজা খান রিতা ও ১০ দলীয় জোট প্রার্থী মওলানা সাঈদ নুরের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কথা থাকলেও মওলানা সাঈদ নুরের বহুলাংশের অ-পরিচিতির কারণে এখানে বিএনপি ভালো করবে বলে স্থানীয়দের অভিমত।

আতাউর রহমান আতাঃ বিএনপির একজন ত্যাগী ও জনপ্রিয় নেতা। দুঃসময়ে রাজনৈতিক মাঠের পরীক্ষিত নেতাদের আইকন তিনি। তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায় কারণেই বিতর্কীত আওয়ামী শাসনামলেও তিনি দুই-দুইবার উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে ছিলেন। তাছাড়া দুর্দিনে, তিনি জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্ববায়কের দায়িত্বও পালন করেছেন। মানিকগঞ্জ-৩ আসনের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ায় তার প্রতি সাধারন জনতার ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। সম্প্রতি, বহিস্কৃত এই নেতার প্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিজদলীয় প্রার্থীর সমর্থকদের অসৌজন্যমূলক আচারন জনমনে সহানুভূতি সৃষ্টি করেছে। যা ‘ভোটের হিসাব-নিকাশ পাল্টিয়ে দেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

আল্লামা মওলানা সাঈদ নূরঃ ১০ দলের জোটের প্রার্থী হিসাবে খেলাফত মজলিসের মওলানা সাঈদ নূরকে ভিআইপি প্রার্থী হিসাবে গন্যকরা হয়। কিন্ত প্রথম পর্যায়ে এই আসনটিতে প্রচার-প্রসারে জামায়াতে ইসলামীর মওলানা দেলোয়ার হোসেন ব্যাপক ভাবে এগিয়ে ছিলেন। নির্বাচনী মাঠের অভিজ্ঞ এই প্রার্থী, ইতিপূর্বে কয়েকটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে জনমনে ‘সত্যবাদি ধারন ও গঠনমূলক রাজনীতিক হিসাবে নিজেকে পরিচিতি করেছেন। জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপক সমর্থন সত্ত্বেও হঠাৎ করে এই আসনটিতে প্রাথী পরির্তন করে খেলাফত মজলিসের মওলানা সাঈদ নুরের (তুলনামূলক ভাবে অপরিচিত) নাম ঘোষনায় জামায়তপন্থী ও সাধারন ভোটারা অনেকটা হতাশায় ভোগছেন।

মোঃ সাজাহান মিয়া (সাজু) ঃ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রার্থী মোঃ শাজাহান মিয়া একজন সৎ ও মৃদুভাষি মানুষ। তার মার্কা মোটরগাড়ী। আওয়ামী শাসনামলের কঠিণ দিনগুলোতে নির্বাচন করে তিনি সাটুরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। উপজেলার একমাত্র শিল্প এলাকায় (ধানকোড়ায়) বাড়ী হওয়াতে তিনি বৃহত্তর- শ্রমজীবি মানুষের সমর্থনের আশা রাখেন। তাছাড়া ঐক্যবদ্ধ সমাজতান্ত্রিক ফ্রন্ড ও খেটে খাওয়া মানুষদেরকে পাশে নিয়ে তিনি এগিয়ে চলছেন।

ড. রফিকুল ইসলাম খানঃ নিরিবিলি ও ‘সব্যসাচী’ মানুষ। তিনি নির্বাচন করছেন মোটর সাইকেল প্রতিক নিয়ে। প্রবাসী হলেও তিনি এলাকার মানুষের জন্য আর্শীবাদ স্বরুপ। বিগত বিশ বছর থেকে তিনি একাধারে মানিকগঞ্জ সদর ও সাটুরয়ার দরিদ্র-অসহায় মানুষদের অকাতরে সাহায্য-সহযোগীতা করে যাচ্ছেন। গবীর- অসহায়দের বিনামূল্যে ঘর প্রদান, যাকাতের কাপড় বিতরণ, দুস্থ্যদের আর্থিক সহযোগিতা, এবং দরিদ্র-ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বিনামূল্যে হজ পালনের সহযোগিতা করেন। রাজনীতি বিদ পরিচয়ের পরির্বতে এলাকায় তিনি দানবীর ব্যক্তি হিসাবেই বেশী পরিচিত। সহজ সরল জীবন-যাপনে অবস্থ্য ড. রফিকুল ইসলাম ক্লিন ইমেজের মানুষ হলেও একশ্রেণীর মানুষ তাকে স্বৈরাচারের দোসর মনে করেন।
মওলানা শামসুদ্দিন সাহেবঃ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মওলানা শামসুদ্দিন। তিনি লড়ছেন হাত পাখা প্রতিক নিয়ে। মানিকগঞ্জ-৩ আসনে তাদের অংসখ্য ভক্তবৃন্দ রয়েছে। তাদের সমর্থন- সহযোগিতা ও পীরভক্ত তরিকাপন্থীদের সমর্থন তার জন্য আর্শীবাদ হয়ে উঠতে পারে।
উল্লেখ্য, বিগত সময় গুলোতে বারবারই এই আসনটিতে শহরকেন্দ্রীক প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। জুলাই বিপ্লবের পরে জনসচেতনতায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। অনুপাতিক হারে ৪৩% জনসংখ্যার সাটুরিয়াবাসী তাদের দীর্ঘ দিনের বঞ্চনার বহিঃ প্রকাশ ঘটাতে পারেন নিজ উপজেলার প্রার্থীদের ভোট দিয়ে এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
প্রয়াতঃ নির্বাচনী সার্বিক ফলাফল ভোট প্রক্রিয়ার আগের দিন পর্যন্তও স্থির নয়। প্রচার চলাকালীন সময় নিদিষ্ট ফলাফল বলা মুশকিল। তাই চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য মানিকগঞ্জ-৩ বাসীদের আরো কিছুদিন (আগামী ১২ ই ফ্রেরুয়ারী) পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।