আমলা হলো যে কোন দেশের সরকারের উচ্চ পদস্থকর্মকর্তা। যারা সরকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা নিয়ম নীতি প্রনয়নে সরকারকে সহযোগিতা করেন। আমলাতন্ত্রের ইংরেজী শব্দ bureaucracy. এটি মূলতঃ ফারসি শব্দ। ফরাসি শব্দ ‘Bureau’ (ব্যুরো – অর্থ: ডেস্ক, অফিস বা টেবিল) এবং গ্রীক শব্দ ‘Kratos’ (ক্রাতোস – অর্থ: শাসন বা ক্ষমতা) এই দুইটি শব্দ মিলে bureaucracy শব্দটি গঠিত হয়েছে। আক্ষরিক অর্থে আমলাতন্ত্র হচ্ছে “দপ্তর সরকার” বা “ডেস্ক শাসন” (Desk Government)। এটি মূলতঃ এমন একটি শাসন ব্যবস্থা বা প্রশাসনিক কাঠামো, যা নিয়ন্ত্রিত হয় অফিসিয়াল কর্মকর্তাদের দ্বারা ।
আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে জ্যাক ক্লদ মেরী ভিনসেন্ট ডি গৌনে আমলাতন্ত্র শব্দটি প্রথম ব্যবহার করলেও আমলাতন্ত্রের সূচনা হয়েছে মূলত ঃ ফ্রান্সের লুইরাজ বংশের অামল থেকে। ফ্রান্সের বিখ্যাত লুই রাজবংশের অত্যাধিক বিলাশীতা ও জনবিছিন্নতায় তাদের অধিনস্থ্য সরকারী উচ্চ পদস্থ্য কর্মারীরা সুযোগ বুঝে রাজকিয় ক্ষমতা সুকৌশলে হস্তগত করেন। বলা যায় লুই রাজবংশের হাত ধরেই পৃথিবীতে আমলাতন্ত্র অন-অনুষ্ঠানিক বিকাশ ঘটে।
ফরাসী রাজবংশের বংশানুক্রমিক বিলাসীতা ও জনসংযোগ বিছিন্নতায় ক্রমে ক্রমেই গুপ্ত আমলাতন্ত্র তাদের বলয় ও প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। এই গোপন আমলাতন্ত্র প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীতে বিশ্বরাজনীতিতে ‘কূটনৈতিক বিপ্লব নামে প্রসারতা পায়। বলা যায়, বিশ্বরাজনীতিতে কূটনৈতিক তৎপরতা আমলাতন্ত্রেরই প্রত্যক্ষ ফল।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে, আমলাতন্ত্রের বিস্তারের অন্যতম কারণ রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব। বিশেষ করে এই অঞ্চলটিতে সুশাসনের অভাব ও শাসকদের অতিমাত্রায় জনবিছিন্নতা এবং রাজনৈতিক অজ্ঞতার কারণে এখানে আমলাতন্ত্র রীতিমত ভয়ন্কর রুপ ধারন করেছে।
এই অঞ্চলটির অন্যতম দেশে হিসাবে বাংলাদেশ ভৌগলিক অবস্থানগত কারণেই (জন্মলগ্ন থেকে) আমলাতন্ত্রে নির্মজ্জিত। এখানে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরা রাজনীতিতে অবস্থান করছেন। তথাকথিত গণতন্ত্রের কারণে এই দেশে আমলাতন্ত্রের গতি-প্রকৃতি দিন দিন লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েই চলছে।
দিকদর্শন, স্বাধীনতাওর পর্ব থেকেই দেশটিকে অদূরদর্শী রাজনীতিকরা পেয়ে বসেছে। গণতন্ত্রের নামে অসৎ, লুটেরা এবং অশিক্ষিতরা অধিকাংশ হারে জনগনকে প্রলোভন দেখিয়ে নেতৃত্ব আসছেন। অজ্ঞ নেতৃত্বের কারণে এখানে গবেষণাধর্মী ও ত্ত্বাতিক উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না।
অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী এই সকল রাজনীতিবিদরা দেশ প্রেম বা দেশের উন্নয়নের চেয়ে ব্যক্তিক উন্নয়নের দিকে বেশী ঝুকে পড়ছে। জাতীয় সম্পদ লুটপাট করে গড়ে তুলছে বিপুল বিত্ত-ভৈরব। আর তাদের এই সকল অবৈধ কাজকে কাগজ কলমে বৈধতা দিচ্ছে তাদের অধিনস্ত আমলারা।
মূলতঃ চাকুরীতে অধিক প্রমোশন, নিদিষ্ট নিয়মের বাহিরে অধিক সুযোগ সুবিধা আদায় এবং অকঠ্য প্রশাসনিক দূরব্যাধতা তৈরী করে তারা পরোক্ষ ভাবে রাজনীতি নিয়ন্ত্রন করছেন। ক্ষমতার পালা বদলে তারা দল বা ব্যক্তি বিশেষের উপর নির্ভর না করে ক্ষমতাকে টার্গেট করছেন।
তথাকথিত গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও তারা “বহাল তবিয়তে” অবস্থান করছেন প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী দেশে একটি অবকাঠামোগত পরিবর্তনের সুযোগ আসলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তা আর সম্ভব হচ্ছে না। বলা যায় গণতান্ত্রিক সচলতা এখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় র্নিমজ্জিত। যার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ যত্রতত্র প্রশাসনিক কর্মকতা নিয়োগ প্রক্রিয়া।
এই অবস্থা নিরসনে, তথাকথিত গণতান্ত্রিক ধারার পরির্বতন আবশ্যক। দেশ ও জাতির সর্বাঙ্গিন মঙ্গলের স্বার্থে পুরাতন নিয়ম নীতির উর্ধেব উঠে এখন একটি যুগোপযোগী সংবিধানই পারে অনেকাংশে আমলাতন্ত্রের লাগাম টানতে। অন্যথায় সরকারের ভিতরে আরো একটি সরকারের ‘দ্বৈত শাসন সৃষ্টি’ সময়ের অপেক্ষা মাত্র।